নতুন কোনো ইনজুরি নয়, কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, দল ছেড়ে স্বেচ্ছায় চলে যাওয়াও নয়। তারপরও মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত দুইটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে আক্ষরিক অর্থেই খোলনলচে বদলে ফেলা একাদশ নিয়ে কাল খেলতে নামলো বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে যে একাদশ খেলেছিল; তার পাঁচ জনেরই গতকাল মঙ্গলবার মাঠে নামা একাদশে ঠাঁই হলো না।
এই একাদশ নিয়ে হয়তো সমালোচনার ঝড় বইয়ে যেতে পারতো, নিন্দা হতে পারতো দল পরিচালনা কর্তৃপক্ষের; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক এই পাঁচ বদলেই না হোক, বাংলাদেশ যে ব্যাটিং তাণ্ডব দেখালো এদিন, তাতে এই বদলগুলোর প্রতিটিরই প্রশংসা না করে উপায় নেই। বাকিরা সুযোগ পেলে কী করতেন, বলা কঠিন। তবে যে পাঁচ জন ব্যাটসম্যান গতকাল উইকেটে যাওয়ার সুযোগ পেলেন, তারা প্রত্যেকে বুঝিয়ে দিলেন, বদলে যাওয়া এক মানসিকতা নিয়েই মাঠে নেমেছেন তারা।
বাংলাদেশ যে গত কিছুদিনের হতাশা ভোলার জন্য এই ম্যাচে বেশ কিছু পরিবর্তন আনবে, সেটা আগেই বোঝা যাচ্ছিল। তবে পরিবর্তন যে পাঁচ পাঁচ জন খেলোয়াড়ের হবে, এটা অনুমান করাই আসলে কঠিন ছিল।
আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে, বাংলাদেশ যখন দুই-চার বছর বাদে বাদে ওয়ানডে খেলতো, তখন এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু ১৯৯৭ সালে নিয়মিত ক্রিকেট খেলতে শুরু করার পর এক সঙ্গে দলে পাঁচ বদলটা কল্পনাতীত ব্যাপার হয়ে গেছে; তাও আবার একটা টুর্নামেন্টের মাঝপথে।
অবশ্য সর্বশেষ একাদশে পাঁচ বদলটা খুব বেশি আগের কথা নয়। গত এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলা একাদশের থেকেই পাঁচজন পরিবর্তিত হয়ে খেলতে নেমেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে। সে ম্যাচে অবশ্য সাকিব-তামিমসহ একাধিক ক্রিকেটারের ইনজুরি এইসব পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছিল। সেই এক ম্যাচে এনামুল, মুমিনুল, সোহাগ ও আবুল হোসেন রাজুর অভিষেক হয়েছিল এবং দলে ফিরেছিলেন নাঈম ইসলাম।
এ ছাড়া ২০০৮ সালের আইসিএল কাণ্ডের পর একাদশে চার পরিবর্তন এসেছিল। চার পরিবর্তন এমন আরো অনেক খুঁজে পাওয়া গেলেও পাঁচ পরিবর্তনটা আলোচনার ব্যাপার বই কী!
এবার পরিবর্তনের মধ্যে সাকিবের ফেরাটা ছিল অবধারিত। সোহাগ গাজী যেহেতু ইনজুরিতে পড়ে এশিয়া কাপ থেকেই ছিটকে গেছেন, তাই সোহাগের জায়গায় সাকিবের ফেরাটা ধরে নেয়া যায়। বাকি চারটি পরিবর্তনকে পারফরম্যান্সগত বা কৌশলগত বলা যেতে পারে। ওপেনার সামসুর রহমান শুভর বদলে ইমরুল কায়েস, নাঈম ইসলামের বদলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, রুবেল হোসেনের বদলে সফিউল ইসলাম এবং আরো একজন স্পিনার আরাফাত সানিকে বসিয়ে বাড়তি পেসার আল আমিনকে নামানো হলো কাল।
শুরুটা করেছিলেন এনামুল হক বিজয় ও ইমরুল কায়েস। যে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের বলার মতো পারফরম্যান্সই ইতিহাস ঘেঁটে বের করা কঠিন, তাদের বিপক্ষেই উড়ন্ত এক সূচনা এনে দিলেন দুই জনে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র অষ্টমবারের মতো উদ্বোধনী জুটিতে শতরান পার করে ফেললেন তারা; বলাই বাহুল্য, পাকিস্তানের বিপক্ষে এই প্রথম হলো কাজটা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে অষ্টমবারের মতো জুটিতে ১৫০ রান স্পর্শ করে তবেই বিচ্ছিন্ন হলেন তারা। ততোক্ষণে প্রথম উইকেট জুটিতে যে কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান উঠে গেছে।
পাকিস্তানের বিপক্ষেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি গড়ে ফেললেন এনামুল ও ইমরুল। ইমরুল গতকাল একাদশে পাওয়া সুযোগটাকে টেস্টের মতো সেঞ্চুরি দিয়ে রাঙাতে না পারলেও বিজয়ের অসামান্য সঙ্গী হিসেবে ফিফটি করে আউট হওয়ার আগে দলকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যান শক্ত ভিতের ওপরে। এরপর বিজয় যখন সেঞ্চুরির জন্য ভাবছেন, তখন এসে রানের চাকাকে দিব্যি সচল রেখে আরেকটা ফিফটি করে ফিরলেন মুমিনুল।
মুশফিক-সাকিবের তাণ্ডব শুরু হলো ফিফটি করে মুমিনুল আর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করে বিজয় আউট হওয়ার পর। ভালো ভিতকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয়, তার ‘টিউটোরিয়াল ক্লাস’ করালেন যেন বর্তমান ও সাবেক অধিনায়ক। চতুর্থ উইকেটে মাত্র ৫.৪ ওভার স্থায়ী জুটিতে এই দুই জন রান তুললেন ৭৭! মানে প্রতি ওভারে গড়ে ১৩.৫৮ করে রান তুললেন মুশফিক ও সাকিব।
দুই জনের মধ্যে সাকিব যা করলেন, তাতে ৩৩ বলে ৫১ রান করা মুশফিককেও ম্লান মনে হলো। কারণ অন্য প্রান্তে মাত্র ১৬ বলে ৪৪ রানের দানবীয় এক ‘ক্যামিও’ ইনিংস খেলে অপরাজিত রইলেন ‘কামব্যাক হিরো’ সাকিব আল হাসান।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি
রান ব্যাটসম্যান উইকেট প্রতিপক্ষ ভেন্যু তারিখ
১৭৫* রাজিন-হাবিবুল চতুর্থ কেনিয়া ফতুল্লা ২০০৬
১৭৪ বিজয়-মুশফিক তৃতীয় উইন্ডিজ খুলনা ২০১২
১৭০ শাহরিয়ার-অপি প্রথম জিম্বাবুয়ে ঢাকা ১৯৯৯
১৬৫* রকিবুল-সাকিব চতুর্থ জিম্বাবুয়ে ঢাকা ২০০৯
১৬০ ইমরুল-জুনায়েদ দ্বিতীয় পাকিস্তান ডাম্বুলা ২০১০
১৫৪ মুশফিক-নাঈম চতুর্থ নিউজিল্যান্ড ঢাকা ২০১৩
১৫০ রফিক-আফতাব দ্বিতীয় জিম্বাবুয়ে ঢাকা ২০০৫
১৫০ বিজয়-ইমরুল প্রথম পাকিস্তান ঢাকা ২০১৪
বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ
রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৩২৬/৩ পাকিস্তান ঢাকা ২০১৪
৩২০/৮ জিম্বাবুয়ে বুলাওয়ে ২০০৯
৩১৩/৬ জিম্বাবুয়ে বুলাওয়ে ২০০৯
৩০৯/৬ নিউজিল্যান্ড ফতুল্লা ২০১৩
৩০১/৭ কেনিয়া বগুড়া ২০০৬
৩০০/৮ আমিরাত লাহোর ২০০৮
পাকিস্তানের বিপক্ষে সেরা জুটি
১৬০ ইমরুল-জুনায়েদ দ্বিতীয় ডাম্বুলা ২০১০
১৫০ বিজয়-ইমরুল প্রথম ঢাকা ২০১৪
১২৮ অলক-রাজিন তৃতীয় করাচি ২০০৩
পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি
ব্যাটসম্যান রান ভেন্যু সাল
সাকিব ১০৮ মুলতান ২০০৮
নাসির ১০০ ঢাকা ২০১১
বিজয় ১০০ ঢাকা ২০১৪
প্রথম উইকেটে সেরা
১৭০ বিদ্যুত্-অপি জিম্বাবুয়ে ঢাকা ১৯৯৯
১৫০ বিজয়-ইমরুল পাকিস্তান ঢাকা ২০১৪
১৩৭ আতাহার-রফিক কেনিয়া হায়দরাবাদ ১৯৯৮
