মুম্বাইয়ের হয়ে টেনিস খেলছেন রাফায়েল নাদাল। দুবাই দলের হয়ে নোভাক জকোভিচ। সিঙ্গাপুর টিমে আবার প্রধান শক্তির নাম সেরেনা উইলিয়ামস। ব্যাংককই বা কোথায় পিছিয়ে? তাদের দলের প্রধান আকর্ষণের নাম অ্যান্ডি মারে।
মুম্বাই আর সিঙ্গাপুর আবার একজন খেলোয়াড়ে সন্তুষ্ট না থেকে ‘আইকন’ খেলোয়াড়দের তালিকা থেকে দ্বিতীয় মহাতারকাও নিজেদের দলে নিয়েছে। মুম্বাইয়ে নাদালের পাশে যখন পিট সাম্প্রাসকে দেখা যাবে, সিঙ্গাপুর তখন সেরেনার সঙ্গে সঙ্গে আন্দ্রে আগাসির মতো কিংবদন্তীকে নিয়ে ফেলেছে। বিদ্রোহী ক্রিকেট লিগ, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ কিংবা বর্তমানে চলমান ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) আদলে ভারত আয়োজন করতে যাচ্ছে টেনিসের আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার লীগের (আইপিটিএল)। গতকাল দুবাইয়ে এই টুর্নামেন্টের নিলামেই ঘটে নাদাল-জকোভিচদের কেনাবেচার এই ঘটনা।
গত রবিবার দুবাইয়ের ওবেরয় হোটেলে টেনিস বিশ্ব এক নতুন বলয়ে গিয়ে পড়ল। যেখানে ক্রিকেটের আইপিএল-এর ঢংয়ে আইকন থেকে বড়-মেজো-সেজো, বিশ্বের নানা মাপের ৭০ জন টেনিস প্লেয়ারের নিলাম হল। এই বছরের ২৮ নভেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর হতে চলা অভূতপূর্ব টুর্নামেন্টের জন্য চারটি শহরভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের দল গড়ে ফেলল এই নিলাম থেকে। চারটি দল মুম্বাই, দুবাই, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এবং গোটা ভাবনাটার পিছনে মহেশ ভূপতি। যে কারণে আইপিটিএল-কে বলা হচ্ছে মহেশে ভূপতির ‘ব্রেনচাইল্ড’।
এত দিন টেনিস বিশ্ব বলতে বোঝাত গ্র্যান্ডস্ল্যাম, এটিপি ও ডব্লিউটিএ ট্যুর, ডেভিস কাপ ও ফেড কাপ। নতুন ভাবধারার আইপিটিএল সেখানে একটা দমকা হাওয়া তো বটেই। যে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী বছরেই কিনা চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন বিশ্বের এক আর দু’নম্বর টেনিস তারকা। মেয়েদের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম চার জনের মধ্যে তিন জনই। বর্তমান উইম্বলডন এবং অস্ট্রেলীয় ওপেন চ্যাম্পিয়ন। সাম্প্রাস-আগাসির মতো টেনিসের প্রবাদ প্রতীম। তবে এ ধরনের টুর্নামেন্ট টেনিস-গ্রহে একেবারে নতুন নয়। ঊনচল্লিশ বছর আগে বিলি জিন কিং এ রকমই শহরভিত্তিক দলগত এক সেটের ম্যাচের টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন আমেরিকা জুড়ে এবং সেই ওয়ার্ল্ড টিম টেনিসে (ডব্লিউটিটি) এখনও খেলেন লিয়েন্ডার পেজ।
যদিও ধারে ও ভারে বিলি জিনের ওয়ার্ল্ড টিম টেনিসের চেয়ে মহেশের আইপিটিএল অনেক এগিয়ে থাকছে। অন্তত এই মুহূর্তে ছবিটা তেমনই। নাদাল জকোভিচ-মারে-আজারেঙ্কা-সেরেনারা ছাড়াও কোনও দলে রয়েছেন সঙ্গা, কোনও দলে আনা ইভানোভিচ, কোনও দলে টমাস বার্ডিচ, লেটন হিউইট। নাদাল এক সেটের ম্যাচ প্রতি পাবেন এগারো লাখ ডলার। জকোভিচ, মারে, সেরেনা, আজারেঙ্কা তার চেয়ে সামান্য কম। দশ লাখ ডলার। টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটা দল ছয় থেকে সর্বাধিক দশ জন প্লেয়ার কিনতে পারে। খরচ করতে পারবে সর্বোচ্চ এক কোটি ডলার।
জয়দীপ মুখোপাধ্যায় পঁচাত্তরে প্রথম ওয়ার্ল্ড টিম টেনিসে খেলেছিলেন। তিনি এদিন বলছিলেন, ওই টুর্নামেন্টে এখন আর বিশ্বের নামি তারকারা খেলেন না। আইপিটিএলে প্রথম বছরেই মেগা তারকাদের ছড়াছড়ি। ভারতের যে দুই টেনিস তারকাকে এ দিন নিলামে কেনা হল, সেই সানিয়া মির্জা ও রোহন বোপান্না, দু’জনকেই কিনেছে মুম্বাই।
তবে দেশের এক নম্বর সিঙ্গলস প্লেয়ার সোমদেব দেববর্মণের অবিক্রীত থাকাটা কিংবা লিয়েন্ডার পেজের নাম নিলামেই না থাকাটা অবাকের। লিয়েন্ডারের বাবা ভেস পেজ এ দিন দাবি করলেন, “লিয়েন্ডারকে সংগঠকদের তরফ থেকে যোগাযোগ করাই হয়নি।” আবার আইপিটিএলের এক সূত্র এদিন বললেন, “চুক্তির খসরায় সই করার যে নির্দিষ্ট সময় ছিল সেটা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও লিয়েন্ডারের দিক থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।” তবে ভারতের সবচেয়ে বেশি গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ী (ডাবলস ও মিক্স ডাবলস মিলিয়ে ১৪টি) লিয়েন্ডার এদিন ঘনিষ্ঠমহলে বলেছেন, টেনিস থেকে তিনি যা পেয়েছেন তাতে আইপিটিএল না খেললে তাঁর এতোটুকু আক্ষেপ নেই। বোপান্না আবার স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত। নিলাম শেষ হওয়ামাত্র টুইটারে তিনি লেখেন, “দুর্দান্ত খবর। প্রথম আইপিটিএলেই আমি আছি। সেটাও আবার নিজের দেশের শহরের টিমে!”
যদিও নরেশ কুমারের মতো দেশের প্রাক্তন তারকা কিংবা বর্তমান জাতীয় চ্যাম্পিয়ন বিষ্ণু বর্ধনের মতো তরুণ টেনিস খেলোয়াড়ের গলায় আক্ষেপ। নরেশ কুমার বললেন, “এসব টুর্নামেন্ট করে ভারতীয় টেনিসের স্ট্যান্ডার্ড বাড়ানো যাবে কি? তার চেয়ে আমাদের প্লেয়ারদের বিশ্বের নানা চ্যালেঞ্জার, এটিপি ট্যুরে খেলিয়ে পয়েন্ট বাড়ানোর চেষ্টা বেশি করে হলে ভারতীয় টেনিসের উপকার হবে।” বিষ্ণু বললেন, “আইপিটিএলে মুম্বাইয়ের খেলা নিশ্চয়ই দেখব ওখানে গিয়ে। কিন্তু নিজে খেলতে পারলে আরও ভাল লাগত।” বিশ্ব টেনিসেরও কি মান বাড়বে আইপিটিএল থেকে? টুর্নামেন্টে এক-একটি ম্যাচে মোট পাঁচটি খেলা হবে। পুরুষ-মেয়ে সিঙ্গলস, ডাবলস, মিক্সড ডাবলস, লেজেন্ড সিঙ্গলস মিলিয়ে। কিন্তু প্রত্যেক ম্যাচ মাত্র এক সেটের। ৫-৫ গেম হলেই টাইব্রেক। তাতেও ‘অ্যাডভান্টেজ রুল’ নেই। প্রথম পয়েন্ট যে পাবে সে-ই জিতবে। ফলে কতটা উঁচু মানের লড়াই দেখা যাবে, কিংবা আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে কি না সেই প্রশ্ন কিন্তু টেনিস মহলে কোথাও কোথাও উঠছে। জানা গেল নাদাল, জকোভিচ, মারে, সেরেনার মতো ‘মার্কি’ প্লেয়াররা শুধু ‘হোম’ ম্যাচেই খেলবেন। তাও নিজের ইচ্ছে মতো। এরা অন্য শহরে ট্র্যাভেল করবেন না। দলের বাকি প্লেয়াররা করবেন। অর্থাত্ নাদাল মুম্বইয়ে, জকোভিচ দুবাইয়েই থাকবেন টুর্নামেন্টের এক মাস। যে সময়টা পেশাদার টেনিস খেলোয়াড়রা মূলত পরবর্তী মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে নাদাল-জকোভিচদের মতো মহাতারকাদের কাছে আইপিটিএলের মঞ্চ একই সঙ্গে রথ দেখা আর কলা বেচা বললে বোধহয় ভুল হবে না।
আখতার আলির মতো প্রবীণ টেনিস ব্যক্তিত্ব অবশ্য বললেন, ‘যখন এত টাকার ব্যাপার। এক একটা ম্যাচ খেলতে যখন নাদালরা এত টাকা পাচ্ছে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাপও থাকবে ম্যাচে। তাছাড়া নাদাল জকোভিচ, মারে-বার্ডিচ কিংবা সেরেনা-আজারেঙ্কা যখন মুখোমুখি হবে, তখন এই টপ প্লেয়াররা নিজেদের নামের জন্য হলেও গুরুত্বের সাথেই খেলবেন। তবে সব মিলিয়ে এটা একটা টেনিস উত্সব। তার বেশি নয়।’—বাসস/ এএফপি।
