টেলিভিশন নাটকে নারী

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৪, ২০:২১
বাংলাদেশে একটি সরকারি চ্যানেল এবং ২৪টি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ বর্তমানে মোট ২৫টি টেলিভিশন চ্যানেল চলছে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় টেলিভিশনে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত নগণ্য। প্রশাসনিক পর্যায় থেকে কারিগরি পর্যায় হয়ে অভিনয় কলায় এসেও দেখা যায় নারীরা এখনও অবহেলিত। আশপাশ থেকে শুনতে পাই নারীরা প্রশাসনিক কাজে দক্ষ নয়। আর মেয়েদের অভিনয়ের ক্ষেত্রে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখনও ঘটেনি। যেটুকু ঘটেছে তা সামান্যই। এই সামান্য পরিবর্তনের ফলেই এখন টিভি মাধ্যমের প্রশাসনিক এবং কারিগরি ক্ষেত্রে সামান্য সংখ্যক নারীকে দেখা যায়, আর অভিনয় মাধ্যমে মেয়েদের এখন আগের চেয়ে কিছুটা বেশি দেখা যায়। কিন্তু, আমি আবারও বলব, এখনও টিভি মাধ্যমে কর্মরত নারীদের প্রতি আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি। আমার ইচ্ছে সামগ্রিক বাংলা সংস্কৃতির আলোকে বাংলাদেশের টিভি নাটকে বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে কথা বলা। এখানকার সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও রয়েছে একটি পুরুষ শাসিত সমাজের অবয়ব। বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও চরিত্রের বিচারে মেয়েরা সেকেন্ডারি এলিমেন্ট। পুরুষরাই একমাত্র প্রাইমারি এলিমেন্ট। যেখানে নারীকে তুলে ধরা হয়েছে সুন্দরী, সেবিকা এবং সতী হিসেবে। বলা বাহুল্য এর সবই পুরুষের জন্য, কিন্তু শরত্ সাহিত্য যে বিস্তর লিঙ্গ বৈষম্যে জর্জরিত তা আমরা কেউ উপলব্ধি করতে পারি না। সত্যি কথা বলতে কি আমরা কেউ তা উপলব্ধি করতেও চাই না। আমরা সামন্ত যুগের অবস্থা থেকে খুব একটা বেরিয়ে আসতে পারিনি। শুরুতেই আমি বলব বাংলাদেশ টেলিভিশন সংস্কৃতির শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত ক’টা নাটক আমরা দেখেছি, যার নাম ভূমিকা বা মূল ভূমিকাটা একজন নারীর? আমি তো ‘করি মন বেওয়া’ বা অন্য দু-একটি নাটক ছাড়া খুব বেশি সংখ্যক নাটক খুঁজে পাচ্ছি না। এই অবস্থা কখনই বদলাবে না, যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টি হয়। কারণ টেলিভিশন আমাদের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মাধ্যম নয়। আমরা যদি বাংলাদেশের উত্পাদন কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাই, দেখা যাবে ষাট শতাংশেরও বেশি ভূমিকা রাখছে নারী। জমিতে লাঙ্গল দেওয়া থেকে শুরু করে ধান শুকানো সব কাজই করে নারী। একই সাথে তারা কিন্তু গৃহকর্ম থেকেও বিচ্যুত নয়। তিন বেলা রান্না করতে হচ্ছে, স্বামী সন্তানকে সময় মতো খাবার দিতে হচ্ছে। এমনকি বাচ্চার টিকা দেওয়ার তারিখটাও মাকে অর্থাত্ নারীকে মনে রাখতে হচ্ছে। এই যে ঘটনা, এটার প্রতিচ্ছবি কিন্তু আমরা বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখতে পাই না। যারা টিভি নাটক লেখেন, তাদের নাটকেও মেয়েদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ। আলী যাকের অভিনীত প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত একটা নাটকের কথা বলি, নাটকটির নাম ‘বহুব্রীহি’। সেখানে মামা (আলী যাকের) এবং দুলাভাই (আবুল হায়াত) এবং তাদের ছেলে ভৃত্যটি—এই তিনজন পুরুষ ছিল মূল চরিত্রে। বাকি সব নারীরা সহশিল্পী। নাটকে মেয়েদেরকে তার সনাতন চিন্তা-চেতনার গণ্ডি পার হয়ে নিজ শক্তি, মেধা ও মননে প্রত্যয়ী হয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টাকে তেমন প্রতিফলিত করা হয়নি। পুঁজিবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় (এক্ষেত্রে অনেক মহিলা নাট্যকার) নারীকে একই ভূমিকায় বারবার তুলে এনেছেন। যেমন, কম বয়সী হলে গ্রামের পটভূমিতে কোনো চঞ্চলা তরুণী অথবা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে প্রেমিকের তুষ্ট করা কথায় আপ্লুত কিংবা কোনো মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত ঘরের মুখে দু’চারটি আদর্শ ও তার পরিবারের প্রতি দায়িত্বের কথা তুলে দিয়ে নাট্যকার যেন দায় সারেন। মা চরিত্রে যিনি থাকেন তার মুখে প্রতিনিয়তই থাকে একই গত্-বাঁধা বুলি। যাবতীয় দায়-দায়িত্ব হলো—সংসার আগলে রাখা। এ প্রসঙ্গে এনটিভিতে প্রচারিত ‘স্পর্শের বাইরে’ নাটকটিতে মা চরিত্রে আফরোজা বানুর কথাটি উদাহরণ হিসেবে না বললেই নয়। সেখানে তিনি প্রতিটি মুহূর্তে সংসারকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সময় ব্যয় করছেন। কিন্তু তিনি বারবারই ব্যর্থ হচ্ছেন। মা-জাতি কি এতটাই দুর্বল? ধৈর্য ধর, সম্মান ক্ষুণ্ন কর না, চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সংসার কর ইত্যাদি সংলাপ ব্যবহার করে নারীকে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তার অহংকার এবং মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। নারী সমাজের নিজ যোগ্যতা, ক্ষমতা এবং স্বাধীন মতামত প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে প্রকান্তরে করা হচ্ছে বিঘ্নিত। এই সমাজে নারী শিশুকাল থেকেই হয় পিতা, না হয় ভাই, স্বামী বা পুত্রের মুখাপেক্ষী। নারী সমাজের এই অসহায় অবস্থাটিকেই প্রচ্ছন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরা হচ্ছে গণমাধ্যমের বিশেষ হাতিয়ার হিসেবে আমাদের ‘টিভি নাটকে’। এমন কোনো ‘মা’ চরিত্র আমরা দেখতে পাই না, যেখানে মা তার মেয়েকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কিংবা নিজ বিশ্বাসে অটল থেকে পরিস্থিতির মোকাবেলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বরং আমরা মা-মেয়ের সংঘাতকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি আমাদের নাটকের চরিত্রে। আজকাল মেয়েরা চাকরি করছে। কর্মক্ষেত্রে তারা সাফল্য পাচ্ছে। অনেক নারী পারিবারিক বাধা ডিঙিয়ে চাকরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় এ ধরনের নাটক প্রত্যক্ষ করার পর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করছে যে মেয়েটি, সে কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। সে ভাববে এটাই তাহলে সত্যি। আমাকে তাহলে এভাবে ঘরের ভেতর কাজ করে সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে। নতুবা সংসার ত্যাগ করতে হবে। তবে আমাদের দেশের টেলিভিশন অন্যান্য দেশের মতো নারীর সহায়ক অনুষ্ঠান বা নাটক সম্প্রচার না করলেও নারীর ব্যক্তিত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কিছু প্রতিভাবান নারীকে তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে একথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। তবে এর সংখ্যা খুবই কম। কী হতে পারে ১. একজন মেয়ে তখনই পুরোপুরি অভিনয়কে শুধু শখ হিসেবে নয়, তার জীবিকা এবং ভালোবাসার ফসল হিসেবে নিতে পারবেন, যদি নারী চরিত্রগুলো বলিষ্ঠভাবে, ভিন্নতর অবয়বে নাটকে তুলে ধরতে পারা যায়। নাট্যকার, উপস্থাপক, বিজ্ঞাপন নির্মাতা, পত্রিকার প্রতিবেদক যদি তাদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীর মেধার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার প্রকাশ ঘটিয়ে নারীর কর্মদক্ষতাকে উপস্থাপন ও কাজে লাগাতে পারেন তাহলেই শিল্পের এই দিকটি সমৃদ্ধ হওয়ার পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে। ২. নারীকে শুধু পণ্য, বিশেষ বিশেষ শব্দ বা বিশেষণে ভূষিত করা এবং লুফে নেওয়া কোনো বিশেষ সামগ্রী হিসেবে যেন উপস্থাপন না করা হয়। নারী ও পুরুষকে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাখতে হবে এবং সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। ৩. সমাজে নারীর প্রকৃত অবস্থা ও অবস্থান টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে। নাটকের চরিত্রায়ন হতে হবে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীকে টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি তার অধিকার ও অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। এই লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে বহু বছর ধরে তর্ক-বিতর্ক চলছে। একজন দর্শক হিসেবে অলীক কিংবা বাস্তবতা বিবর্জিত কোনো বিষয়বস্তু বা চরিত্র নয়, চাই জীবনবোধে উজ্জীবিত চরিত্র, যা দেখে অনুপ্রাণিত হবে আরও সহস্র কোটি মানুষ। আমিও তেমন কোনো চরিত্র কিংবা সংলাপ বলতে বলতে জীবনের আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারব—‘একটিতো আলো আমার হাতে আছে এটি দিয়েই জ্বালিয়ে যাবো অসংখ্য প্রদীপ।’ e-mail: [email protected]