আর কী করতে পারতাম আমরা? এমন ম্যাচের পর আর কোনো জবাব থাকে না।
২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রান তাড়া করে দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ জিতে যাওয়ার পর হতাশ, বিধ্বস্ত রিকি পন্টিং বলেছিলেন কথাটা। তখন আসলে সারা বিশ্বই এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করছিলো— আর কী করা যেত!
মুশফিকুর রহিমও নিশ্চয়ই এখন রিকি পন্টিংয়ের মতো করে ভাবছেন! তার ক্ষেত্রে হতাশাটা অবশ্য আন্তর্জাতিক বিচারে অতো বড় নয়। ৩২৬ রানের চেয়ে বড় স্কোর করে অনেকেই হেরেছে; কিন্তু বাংলাদেশের কাছে তো ব্যাপারটা সেই অস্ট্রেলিয়ার মতোই। নিজেদের ইতিহাসের সেরা ব্যাটিং পারফরম্যান্সটা করেও কেন বাংলাদেশ হেরে গেল? চায়ের দোকানের সাধারণ দর্শক, ড্রইং রুমের আয়েসী দর্শক থেকে শুরু করে কমেন্ট্রি বক্সের বিশেষজ্ঞ— গতকাল বাংলাদেশজুড়ে বেশিরভাগ মানুষই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।
সেই উত্তর খোঁজার পালায় প্রথমেই সবাই এক শব্দে উত্তর দিয়ে ফেলছেন—ভাগ্য।
গতকাল সাবেক ক্রিকেটার হাবিবুল বাশার, জাভেদ ওমর বেলিম, সানোয়ার হোসেন থেকে শুরু করে গাজী আশরাফ হোসেন লিপুসহ যতো সিনিয়র ক্রিকেটারের সঙ্গে আলাপ হলো- প্রায় সবাই বললেন, এমন পরাজয় আসলে ভাগ্যেরই খেলা। বাংলাদেশ যে ব্যাটিং করেছে, তাতে এমন পরাজয় তারাও কেউ কল্পনা করেননি। আলাপচারিতার বড় অংশ জুড়েই রইলো তাই ব্যাটসম্যানদের প্রশংসা।
লিপু যেমন বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত ফল যাই হোক, এই দারুণ ব্যাটিংয়ের জন্য খেলোয়াড়দের অভিনন্দন। যেমন শুরু হয়েছে, তেমন মাঝের ওভারগুলোতে রানের চাকা ঘোরানো গেছে এবং শেষে পুরো সুযোগটা নিয়েছে ব্যাটসম্যানরা। ফলে অভিনন্দন তাদের প্রাপ্যই।’
হাবিবুল বাশার যেমন বলছিলেন, টানা বেশ কিছুদিন অপ্রাপ্তির পর অন্তত প্রথম ইনিংস পর্যন্ত এটা ছিল বাংলাদেশের প্রাপ্তির ম্যাচ। সেই প্রাপ্তিগুলো বর্ণনাও করলেন সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক, ‘যদি পাওয়ার কথা বলেন, অবশ্যই ওয়ানডে ক্রিকেটে আমরা সবচেয়ে বেশি রান করেছি। মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে সবচেয়ে বেশি রান! আমি মনে করি সেটা অনেক ভালো আমাদের জন্য। আমাদের ব্যাটিংটা ভালো ছিলো না এ টুর্নামেন্টে। এ ম্যাচে ব্যাটসম্যানরা ভালো ব্যাটিং করেছে। ভারতের সাথে যদিও ভালো ফাইন করেছিলাম। আমাদের ওপেনিং জুটিও ভালো খেলেছে। পরের ব্যাটসম্যানরা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পেরেছে। এবং আমার মনে হয় কালকে আমরা পরিকল্পনা মতো ব্যাটিং করতে পেরেছি। আমার কাছে এ জিনিসটা খুব ভালো লেগেছে।’
কিন্তু এই ভালো লাগায় যে শেষ হলো না সব। বাংলাদেশের এই অনেক প্রাপ্তির ইনিংসটাকেও টপকে গেলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের শেষ ১০ ওভারে বিস্ময়কর ব্যাটিং, ফাওয়াদ আলমের চমক এবং আরো একটা আফ্রিদি ঝড়; চাইলে নিজেদের ওপর থেকে ফোকাসটা সরিয়ে অনেক কারণই খুঁজে বের করা সম্ভব।
কিন্তু নিজেদের কি কিছুই করার ছিল না? এই জায়গাটায় অনেক প্রশ্ন দেশ জুড়ে। অনেকেরই ধারণা- অধিনায়ক খুব কেতাবী অধিনায়কত্ব না করে ভিন্ন কিছু একটু চেষ্টা করতে পারতেন অন্তত। তারপরও পরাজয় এলে কিছু করার তো ছিল না। লিপু যেমন বলছিলেন, ‘আফ্রিদিকে নিয়ে প্লানিংটা কতোটা হয়েছে, সেটা ঠিক বোঝা গেল না। ওর শক্তিশালী জায়গায়, মানে উইকেটেই স্পিন করে গেলাম আমরা! এটা একটু বিস্ময়কর। জিয়াকে দিয়ে অন্তত একটু চেষ্টা করা যেত। আফ্রিদি যে কারোর বিপক্ষেই হয়তো এরকম খেলতো; কিন্তু এই ম্যাচেই দেখবেন, সে স্পিনারদের মতো পেসারদের ওপর চড়াও হয়নি। সেখানে আমরা ওকে শুরুতে স্পিনারই দিয়ে গেছি।’
এই প্রশ্নটা গতকাল সানোয়ার, হাবিবুল ও জাভেদকেও করা হয়েছিল। সানোয়ার ও হাবিবুল একই সুরে বললেন, আসলে মাঠে কী পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটা অধিনায়কই ভালো বলতে পারেন। শুধু জাভেদ বললেন, জিয়াকে একদমই বল না দেয়ায় তিনি বিস্মিত।
জিয়াকে বল না দেয়া নিয়ে সেই ম্যাচের পর থেকেই অনেক কথা হচ্ছে। কথাটা উঠেছিল সংবাদ সম্মেলনেই। সেখানে মুশফিক পরস্পরবিরোধী যুক্তি দিলেন। প্রথমে মাহমুদউল্লাহকে দলে রাখার যুক্তি দিতে গিয়ে বললেন, ‘ব্যাটিং অর্ডার লম্বা করার জন্য রিয়াদ ভাইকে নেয়া হয়েছে। কারণ জিয়া তো বেশি ওভার বাকি থাকতে লম্বা সময় ধরে ব্যাট করার মতো ব্যাটসম্যান না।’
তার মানে মুশফিক বলছেন যে, জিয়া বোলিং অলরাউন্ডার; কিন্তু একটু পরই জিয়াকে বলই না দেয়ার কারণ বলতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দিলেন, ‘উনি তো অকেশনাল বোলার’।
ঠিক কতোভাবে বিস্মিত করবেন, মুশফিক!
প্রথমত জিয়া ঘরোয়া ক্রিকেটের খুবই নিয়মিত বোলার; ইদানিং তাকে বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবেই দেখা হয়। জিয়া বল করেই বাংলাদেশকে টেস্টও জিতিয়েছেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। সেসব বিবেচনায় না নিলেও মুশফিক নিজেই তো দুই রকম বলে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিলেন যে, জিয়ার ভূমিকাটা আসলে দলে কী?
দল নিয়ে, একাদশ নিয়ে এরকম প্রশ্ন সাবেকদের অনেকেরই আছে। সেসব প্রশ্ন বড় করে আলোচনায়ও আনা যেতে পারে; কিন্তু সেসব প্রশ্ন দলের মধ্যেও আছে কি না, সেই হলো প্রশ্ন।
