বদরু মিয়া যখন একটা পায়জামা-শার্ট আর সাদা কাপড়ের জুতা পরে ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটছে, তখনও চরাচর কিছুটা অন্ধকার। কয়েক কদম যেতেই তার জুতো জোড়া ভিজে জবজবা হয়। একটা মসুর ডালের বিস্তৃত জমির ওপর জমাটবাঁধা শিশির দেখে তার চোখে রীতিমতো বিস্ময় জাগে। শিশির আর পাতার রঙ মিলে এমনও হতে পারে! খাল পাড়ে এসে বাঁশের সাঁকোতে পা রাখতেই দেখে, একটা খুঁটিতে শিকারের আশায় নীল মাছরাঙ্গা ওত পেতে আছে। তার মনে পড়ল ইস্কুলে প্রতিদিন গাওয়া সংগীত : পূরব বাংলা শ্যামলীময়, পঞ্চনদীর তীরে অরণীময়...। এই তা হলে শ্যামলীময় বাংলা? সাঁকো পেরোতে অদূরের জমিতে কর্মরত কেউ জোরে হাঁক ছাড়ে, ও বদরু— কই যাও? ঘাস-লতাপাতার গভীরে ডুবে থাকা লোকটাকে দেখা যায় না, কেবল মাথাটি জেগে আছে। না চিনলেও বদরু জবাব দেয়, খালার বাড়ি। লোকটা বদরুর জবাব নেয়ও, ও আইচ্ছা। বদরু নিজের মাথায় হাত রাখে। বুঝতে পারে মাথায় সেঁটে দেওয়া মাফলারের সমনে-পিছনের খালি অংশের চুল শিশিরে ভিজে আছে। অতঃপর স্টেশন পর্যন্ত আড়াই মাইল যেতে শিশির শুকায় রোদে কিংবা বাতাসে।
বদরুজ্জামান ওরফে বদরু মিয়া ওরফে বদরুকে খালার গ্রামের বাড়ি এসে বেশিদিন আপেক্ষা করতে হয় না। কেউ একজন হপ্তাখানেক পরই ওকে নিয়ে আসে শহরের বাড়ি। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে নেমে বদরুরা একটা রিকশায় চড়ে শান্তিবাগে ঢোকে। শান্তিনগর থেকে শান্তিবাগ, কত যে শান্তি! বদরুর ধারণা এমনই ছিল। হয়তো এই শহরে কখনো শান্তির চাষ হতো, আর এখানেই গ্রথিত হয়েছিল এর শিকড়। কিন্তু মাস না যেতেই বদরুর ধারণা পাল্টে যায়। শান্তিবাগের লাগোয়া বাসাগুলোর টিনের চালের একটিতে তখন বরই শুকাচ্ছে, রোদ মিইয়ে যেতেই এর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চৌদিক। গন্ধটি বদরুর নাকে আঘাত করতেই তার গ্রামের কথা মনে পড়ে। চোখে ভাসে মায়ের মুখ। তার মা-বোনেরাও এইভাবে রোদে বরই শুকায়। উঠানে বা বারান্দায় শুকাতে শুকাতে বরইগুলো বিকেলের দিকে চুপসে যায়। ওইদিন শান্তিবাগের এক ঘিঞ্জি বাড়ির লাগোয়া নিচু ছাদ থেকে শুকনো বরইয়ের ঘ্রাণ এইভাবে তাকে স্মৃতিকাতর করে। একথা ভাবতেই গলির ভেতর একদল ছেলে-ছোকরা দৌড়ে প্রবেশ করল। মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে তারা অন্য গলিতে হারিয়ে যায়। এই স্থানটিতে তখন পুলিশ দেখে দু-পাশের সবাই যার যার দরজার ভেতর সেঁধিয়ে পড়ে।
গলিটার অন্যপাশে বদরুর খালার বাড়ির ঠিক সামনের বাড়িতে দরজায় দাঁড়িয়ে পুলিশ উর্দু ভাষায় খিস্তিখেউড় করে : বাইনচোত!
বের হয়ে আসেন বাড়ির মালিক, কেয়া হোয়া?
আপকা লাড়কা কো ঘরসে বাহার নিকালো।
দিখিয়ে সাহাব, মেরা তো কই লাড়কা নেহি হ্যায়।
হাম তো দেখা ও ইধার আয়া।
হাম তো নেহি জানতা, আপ তালাশ করো ভাই।
বদরু ও তার খালাত ভাই-বোনেরা জানলার পর্দার আড়াল থেকে সব দেখছে। দূর থেকে বুঝতে পারে খালাও। সবাই ভয়ে জড়োসড়ো। পাঞ্জাবি পুলিশ ঘরে ঢুকে বেশি এগোয় না, তখন পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে দুজনের পা। তারা তখনই বের হয়ে আসে এবং যে তথ্য দিয়ে যায় তাতে অধিকাংশ ভয়ে আড়ষ্ট হয়, কেউ কেউ খুশি। একজন সিপাই অনবরত হাত দিয়ে তার পেটের দু-পাশ চুলকাচ্ছে আর করছে ছোকরাদের বেয়াদবি-কাণ্ডের বয়ান।
যুবকরা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ছবিতে পিচ লেপটে মুখ ঢেকে দেয়। দূর থেকে পুলিশ দেখেই দাবড়ানি লাগায়। একটু আগে যে ছেলেগুলো গলির ভেতর দিয়ে পালিয়ে গেল...। কিন্তু অপসৃয়মাণ সেপাইটির গা চুলকানো দেখে একজন বাঙালি মন্তব্য করে, ছয় দফার চুলকানি। শেখ মুজিবের ছয় দফা পুরো পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়লে তা পশ্চিম পাকিস্তানিদের অ্যালার্জির কারণ হয়। এই কি তার বহিঃপ্রকাশ? কেউ কোনো মন্তব্য করে না, কেবল একজন বলে ঠিক ঠিক...।
স্কুলপড়ুয়া বদরু, কোথায় শান্তি বিঘ্নিত হলো, অতটা না বুঝলেও তার মুখ গোমড়া হয়ে যায়। তার গাঁয়ের কথা মনে পড়ে, গাঁয়ের আত্মীয়-বন্ধুদের মুখ চোখে ভাসে। তার এ অবস্থা বাসার কারো বুঝতে বাকি থাকে না। ভাই-বোনেরা মিলে বাইরে গিয়ে গিয়ে ওকে চাঙ্গা রাখতে চায়। নিমতলীর জাদুঘর আর চিড়িয়াখানার দূরত্ব কাছাকাছি। এ দুটো একদিনেই দেখা হয়। হরিণকে বাদাম খাওয়াতে কেউ একজন কনুইয়ে কামড় খায়। রেসকোর্সটা কাছে থাকলেও এদিন ঘোড়দৌড়ের সময় শেষ। অন্যদিন গেলে ক্ষিপ্রগতির ঘোড়দৌড় দেখে অনেকেরই চোখে আচানক ঠেকে। বদরু দেখে, কীভাবে পেছনের ঘোড়াটি সব ক’টিকে পেছনে ফেলে অবশেষে নিজে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করল। দুজন সওয়ারির অর্ধেক পথ না যেতেই ছিটকে পড়া দেখেও অনেকে হেসে কুটি কুটি। ওরা ফিরে আসে।
কিন্তু পরদিন অন্য এক বিস্ময় আচম্বিতে ধাক্কা মারে। বন্ধু মঞ্জুরুল এসে সংবাদ দেয়, বেরিয়ে আয় বদরু, শোন, মাইকে কী সব বলছে, হয়তো মিটিং, পল্টনে। ওরা শুনছে : ভাইসব আগামীকাল ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হইয়াছে, ইহাতে বক্তৃতা করিবেন আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় নেতা অমুক ভাই, বক্তৃতা করিবেন গরিবের বন্ধু ও জনদরদি তমুক ভাই এবং আরো বক্তৃতা করিবেন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত ছাত্রনেতা অনলবর্ষী তো-ফা-য়ে-ল আ-হ-ম-দ। সভায় দলে দলে যোগ দিয়া ইহাকে সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তুলুন, ভাইসব...। এরই মধ্যে একটি খণ্ডিত মিছিল বলে বলে যায় : পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা, পিন্ডি না ঢাকা—ঢাকা, ঢাকা! কোথা থেকে কারা কলার ডাউগা, নারিকেলের ডগার তুলিতে লেখা পোস্টার, দেয়াল-লিখন দিয়ে সারা শহর ছেয়ে ফেলে।
অতঃপর সত্তরের নির্বাচনী ফলাফল বাঙালিকে স্বপ্নের ঘোরে নিয়ে আসে। বদরু ধারণা করে দেশের ভাগ্যে ইতিবাচক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
ঢাকা স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তান খেলার উত্সব। বদরু দলবেঁধে টিফিনক্যারিয়ার নিয়ে রোজ খেলা দেখতে গমন করে।
ইন্তিখাব আলমের বিধ্বংসী স্পিনে পুরো স্টেডিয়াম উত্তাল। খেলার শেষ দিন হঠাত্ করেই স্টেডিয়ামের কোনায় কোনায়, প্যান্ডেলে জ্বলে ওঠে আগুন। বিক্ষুব্ধ দর্শক প্যান্ডেল-চেয়ার ভাংচুর করতে থাকে। খেলোয়াড়রা দৌড়ে মাঠ ত্যাগ করে পেছনে চলে যায়। মাঠে নেমে আসে পুলিশ। বদরু বিমূঢ়। বেতারে কিছুক্ষণ পূর্বে ঘোষিত হয়েছে—ঢাকায় অনুষ্ঠেয় গণপরিষদের অধিবেশন বাতিল। স্বপ্নভঙ্গ বাঙালির, স্বপ্নভঙ্গ বদরুদের।
বন্ধুরা ভাবে, আমরা এখন বড়, মিছিলে যোগদান করা, সভায় উপস্থিত থাকা উচিত।
হ্যাঁ, এখন হাই ইস্কুলের শেষ সীমানায়। আর কত ঘরে থাকা? ফারুক ইকবালের সাথে বদরুর কথা চলে হরহামেশা। একই এলাকায় বাস, সংগ্রামী চেতানায়ও ওরা এক। ওদিকে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতেও মিটিং করলেন। এরই মধ্যে ঘোষণা দিলেন ৭ই মার্চ হবে বড় সভা, রেসকোর্স ময়দানে, ‘বদ খান’ ইয়াহিয়া আর ভুট্টো যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গড়িমসি শুরু করেছে, বাঙালিদের অবিলম্বে জানানো দরকার।
৩ মার্চ ফারুক ইকবালের সাথে বদরুরা মিছিলে যোগ দেয়। ছাত্র-জনতা সিদ্ধেশ্বরী কলেজের কাছে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। অতঃপর পূর্ববাংলার মানচিত্র শোভিত পতাকার মিছিলটি রামপুরার দিকে অগ্রসর হয়। হাজীপাড়া পার হতেই পাকিস্তানি আর্মি-ভ্যান দ্বারা এদের গতি রোধ করা হলো। এরা ফারুককে কাছে ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিদায় করে। গমনোদ্যত ফারুক ইকবাল পেছন ফিরতেই কাপুরুষের মতো ওকে গুলি করে এক জোয়ান। ফারুক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সারা শহরে তত্ক্ষণাত্ আগুন জ্বলে ওঠে, সে আগুন ছড়িয়ে যায় সবখানে। জনতা পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে ফেলে। ফারুককে ওরা কবর দেয় মৌচাকের সামনে। শামসুর রাহমান লেখেন ‘রক্তাপ্লুত শার্ট’ কবিতা। কয়দিনে ঢাকার আশপাশে সংঘর্ষে নিহত হয় প্রায় ৩০০ জন। তবে ৭ই মার্চের প্রস্তুতি অব্যাহত থাকে। বদরুর বন্ধুরা কেবল সভায় যোগদানের জন্য নিজেদের পছন্দসই শার্টগুলো ধুয়ে দেয়। কত যে আগ্রহ!
ওরা দেখে, শহরের অলিগলিতে মানুষ জটলা পাকিয়ে আড্ডা দেয় রাতের দীর্ঘ সময়। দোকানগুলো খোলা থাকে রাত ১০টা অবধি। রমনা সিগারেট বিক্রি হচ্ছে দেদার। এক রাতে রাজনীতির এক বড় ভাইকে দেখল তারা। কেউ একজন বলছে, আসলে শেখ মুজিব চায় কী? ‘বাঙালির মুক্তি।’
মিয়া, খোলাসা কইরা কও।
আসলে তিনি সকল মানুষেরই মুক্তি চান।
যেমন?
এক বক্তৃতায় শেখ সাহেব বললেন, শোষিত হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলিত মানুষের একই অবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত প্রভুরা রাজকীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী। সেখানকার জমিদারি, জায়গিরদারি, সর্দারি প্রথার অবশ্যই বিলোপ করতে হবে।
শেষ কথাগুলো অনেকেই বুঝতে পারেনি। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রশ্ন করলেন, মিয়া আলম, পশ্চিম পাকিস্তানের কথা বাদ দেও। আমাদের নিজের অবস্থা বলো।
কী বলব চাচা, পূর্ব পাকিস্তান তো পিছাইতে পিছাইতে রসাতলে যাচ্ছে। সারা পাকিস্তানে চাকরিতে বাঙালির সংখ্যা মাত্র শতকরা পনের। ডিফেন্স সার্ভিসে আরও কম, দশ ভাগেরও নিচে।
পাটের কথা জানি, শেখ মুজিব কী কইলো বাবা?
বললেন যে, পরগাছা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা পাটচাষিদের ন্যায্যামূল্য থেকে বঞ্চিত করেছে। পাটের মান, উত্পাদনের হার দুটোই বৃদ্ধি করা দরকার।
কইরাই লাভ কী? ব্যবসাতে তো বাঙালি এমনিই পিছাইয়া।
ঠিক চাচা, আর এ জন্যই বঙ্গবন্ধু...। কী, আপনি ভুলে গেলেন নির্বাচনের আগে রেডিও ভাষণে তিনি কী বলেছিলেন?
আলম আবার বলে, বলেছিলেন যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কথা। তাতে উত্তরবঙ্গের সাথে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপিত হলে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটবে।
হ, সে আসলেই বাংলার বন্ধু।
চাচা যাই, দেখেন ৭ই মার্চ তিনি আর কী বলেন।
হ বাবা আলম, আমরাও সবাই যামু। তাইলে যাই, এই মিয়া দোকান বন্ধ করো।
সেদিন ভোরে উঠতেই বদরুরা একটা কিছু আঁচ করতে পারে। শুনল যে তেজগাঁওয়ের দিক থেকে রেললাইন ধরে পিঁপড়ের দঙ্গলের মতো মানুষ আসছে গাঁও-গেরাম থেকে। এরকম আসছে চারদিক থেকেই। সবার হাতে একটি করে লাঠি, বাঁশ। কারো পোটলায় চিড়ামুড়ি।
বদরু দেখল, গতকাল ধুয়ে দেওয়া শার্টটি অনেক পরিষ্কার দেখাচ্ছে। কিন্তু ইস্ত্রি করে কেমনে, লন্ড্রি যে বন্ধ। লন্ড্রিওয়ালাও কি আজ রেসকোর্স যাবে? পরক্ষণেই বদরু অন্যের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের কথা ভাবে। নিজেই বা যাবে কেমনে? রাতে আলম ভাইকে বলে রাখলেই পারত। ঘর থেকে ডাক দিয়ে নিয়ে যেতেন। যা-ই হোক, সবাই মিলে হয়তো যাওয়া যাবে, খালা বাধা না দিলেই হয়। কিন্তু পূর্বকথামতো মালিবাগ মোড়ে এসে কাউকেই পায় না। হয়তো কেউ মানুষের উত্তাল স্রোতে দাঁড়াতে পারেনি। মঞ্জুরুলের মতো কোনো একজনকে দেখল, ডাকও দিল পেছন থেকে, কিন্তু সে দাঁড়ায়নি কিংবা দাঁড়াতে পারেনি। অথবা আদৌ কি ডাক শুনেছিল? পতঙ্গের দঙ্গলের মতো, পক্ষীর পালের মতো, মাছের ঝাঁকের মতো মানুষ ছুটছে রেসকোর্স অভিমুখে। বদরু আর কী করে? অদৃশ্য তরঙ্গ তাকে টেনে নিয়ে যায়। সাইবেরিয়ার পাখিরা এদেশে আসলে বাতাসে যে শক্তি-তরঙ্গ তৈরি হয়, ধাবমান মানুষের গতি-তরঙ্গ সেভাবে ওকে টেনে নিয়ে আসে। এখানে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য থাকে না। কারণ, এই মিছিলে সবাই এক, সকলে এক পরিবারভুক্ত।
বদরু দেখল মঞ্চের কাছে যাওয়া অসম্ভব। তাছাড়া যেভাবে হেলিকপ্টার বারবার মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে তাতে অনেকেই ভয়তাড়িত হয়ে কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে আছে। কোনোমতে এক কোনায় একটু স্থান করে নিল সে। চারপাশ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হলো।
অবশেষে তিনি এলেন। বললেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।’ অতঃপর বঙ্গবন্ধুর কথার তরঙ্গ একটার পর একটা প্রতিধ্বনিত হয়, ‘আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বত্সরের ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বত্সরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস... আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই... আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়—তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তা ঘাট যা যা আছে সবকিছু—আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো।’ বদরু লক্ষ্য করে, ‘শত্রুর মোকাবিলা’ কথাটি বলতেই মানুষের হাতের লাঠি আর বাঁশগুলো নড়েচড়ে ওঠে। কেউ কেউ সেসব আকাশের দিকে উত্তোলন করে। বঙ্গবন্ধু থামলেন না, বলেই চললেন, হেলিকপ্টারের পট্পট্ পাখা ঝাপটানোর ফাঁকে শোনা গেল, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ অতঃপর বঙ্গবন্ধুর তর্জনী নেমে এল। জনতা সমস্বরে বলল ‘জয় বাংলা’। নেতা নেমে গেলেন মঞ্চ থেকে। লোকজন উঠে পড়ল। বদরু বের হয়ে বেজান ছুটছে শান্তিবাগের দিকে। তার পায়ে ক-মাস আগে এখানেই দেখা অশ্বপদের গতি। যেন তার কানে বাজছে ঘোড়ার ক্ষুরের ঠকঠক আওয়াজ। গিয়ে বলতে হবে খালাকে বঙ্গবন্ধুর কথা—সরাসরি দেখলাম। খালাত বোন পারুলকেও বুঝিয়ে বলবে সব। কিন্তু কোন কথাটি আগে, কোনটি পরে বলবে, তা নির্ধারণ করতে পারছে না। বঙ্গবন্ধু ‘অ্যাসেমব্লি...অ্যাসেমব্লি’ কী যেন বলছিলেন। এ সময় আলম ভাইকে পেলে হতো, ব্যাখ্যাটা বুঝে নেয়া যেত। বাকি সবই সে ভালো করে বুঝেছে।
ওইদিন জাদুঘর-চিড়িয়াখানা থেকে ফিরবার পথে কাজী হাউজের সামনে গলির মুখে কলের গানওয়ালা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খালাত ভাই-বোনেরা চা-পুরি খায়। ওদের মাথার কাছে দেয়ালে লেখা ছিল, ‘এইখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষেধ’। তখনই পারুল জিজ্ঞেস করে, বদরু ভাই, তুমি নাকি রাজনীতি কর, রাজনীতি কী? সেদিন পারুলের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি বদরু। আজ সেই উত্তর মিলেছে। একথা ভাবতেই সে আরো বেজান ছুটছে। কিন্তু জনস্রোত ঠেলে বদরু তেমন আগাতে পারেনি। তাই অবশেষে সন্ধ্যা হয়েই এল। পথে দেখল একটা চায়ের দোকান—চারপাশে ব্যানার, ভাঙা সাইনবোর্ড দিয়ে ঘেরাও দেওয়া। হয়তো এটিই শেষ উর্দু সাইনবোর্ড। একটা লোক চা খেয়ে মাথা নিচু করে বের হয়ে আসে, কে-টু সিগারেটের প্যাকেট থেকে শেষ সিগারেটটা বের করে প্যাকেট রাস্তায় ছুড়ে ফেলে বলে : শালার খানের বাচ্চা, এইবার বুঝবি!
বদরু দেখল, একজন পথচারী প্রায় কানের কাছে রেডিও নিয়ে শুনছে সান্ধ্যকালীন খবর : ইয়ে রেডিও পাকিস্তান হ্যায়... আভ আপ শামীম বেহ্জাদ সে খবরে সুনিয়ে। মাশরেকি পাকিস্তান মে সামকে ছে বাজে...। রাজপথ ধরে মগবাজারের কাছে আসতে ভিড় কমে আসে। আবার তার শরীরে তরঙ্গ ওঠে। সে হাঁটছে, না দৌড়াচ্ছে সেটা বুঝবার আগেই দেখল পূর্ব দিক আরো কিছুটা অন্ধকার হয়ে আসছে।
