শ্রদ্ধাঞ্জলি

ফজল শাহাবুদ্দীন : অন্ধকারময় জ্যোতির দিকে

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৪, ১৭:২৯
‘আমরা ম’রে গিয়ে কি বাতাসের সঙ্গে মিশে যাই মৃত্যু মানে কি এক জ্যোতির্ময় অন্ধকার থেকে অন্য এক অন্ধকারময় জ্যোতির দিকে নিঃসঙ্গ একান্ত যাত্রা’ (মরণোত্তর রক্ত কণিকায়) মরে গিয়ে তিনি বাতাসের সঙ্গে মিশে গেছেন কিনা জানি না। এক অন্ধকারময় জ্যোতির দিকে নিঃসঙ্গ একাকী একান্ত যাত্রা তাঁর হয়েছে কিনা তাও জানিনা—শুধু এটুকু জানি, তিনি নেই, পৃথিবীর সকল বন্ধন ছিন্ন করে তিনি শেষ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন মৃত্তিকায়। মানুষ মরে গেলে কী হয়? মৃত্যু কি শুধুই সমাপ্তি—এ প্রশ্ন ছিল তাঁর। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর যাত্রা কি শুধুই অনন্ত যাত্রা নাকি এটি জীবনের নতুন উদ্বোধন? তিনি তাঁর কবিতায় এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন একান্তভাবে। কিন্তু রহস্য থেকেই গেছে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অন্যলোকে যাত্রার মাধ্যমে তিনি তাঁর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন কিনা আমরা জানি না। শুধু জানি তিনি এখন আমাদের কাছে শুধুই স্মৃতি, শুধুই কান্না। আমরা তাঁকে আর কখনো ফিরে পাব না—না কবিতায়, না আড্ডায়। কেউ আমাদের নিয়ে যাবে না বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে সেই কেরানীগঞ্জে অথবা আফতাব নগরের ভেতরে ফুটে থাকা থরে থরে সাদা কাশবনের সেই নিবিড় অরণ্যে। আমরা আর কখনো চা খাব না ফুটপাতে বসে অথবা প্রেসক্লাবের ক্যাফেটরিয়ায়। ভেঙে ফেলা সেই হারুন এন্টারপ্রাইজের অফিসে কোনো দুপুর আর মৌ মৌ হয়ে উঠবে না তাঁর বাসা থেকে নিয়ে আসা সেই ভাত ও সালুনের ঘ্রাণে। বলছিলাম ফজল শাহাবুদ্দীনের কথা। আমাদের প্রিয় ফজল ভাই। ৭৭-এ এসেও যিনি ছিলেন তরুণ তুর্কী। আসর মাতিয়ে রাখতে যাঁর জুড়ি ছিল না। আড্ডা কিংবা আলাপে একাই বলে যেতেন অনর্গল। যুক্তির বিপরীতে যুক্তি কিংবা কথার বিপরীতে কথা ছুড়ে দেওয়াতেই যেন তাঁর আনন্দ। আর সেই আনন্দে মশগুল হতে কী যে নিবিড় একাগ্রতা। আড্ডাবাজ ফজল ভাইয়ের আড্ডাতেও ছিল ভিন্ন রং ভিন্ন আমেজ। তাঁর ছুটে চলা কথা বলা সবকিছুতেই যেন এক স্বপ্নের ছায়া, এক আকাঙ্ক্ষিত সুন্দরের আর্তনাদ। তিনি যখন বলতেন তখন তাঁর মধ্য থেকে এক অসম্ভব অসাধারণ জ্যোতির বিচ্ছুরণ ঘটত—যা সৃষ্টি করত এক অমোঘ সম্মোহনের। ফজল ভাইয়ের আড্ডা মানেই অনিবার্যভাবে কবিতা। কী নেই তাতে। বোদলেয়ার, কিটস থেকে শুরু করে জীবনানন্দ এমনকি সতীর্থ শামসুর রাহমান অথবা আল মাহমুদও উঠে আসতেন অবলীলায়। উঠে আসতেন কবিতার তরুণতম ব্যক্তিটিও। ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দকে ছাপিয়ে শুধু কবিতার জন্য কাউকে স্বীকৃতি বা ধন্যবাদ জানানোর উদাহরণ যেন ফজল শাহাবুদ্দীনেই সম্ভব। যারা তাঁকে চিনতেন তারা নির্দ্বিধায় এ সত্যটিকে স্পর্শ করবেন। ফজল শাহাবুদ্দীন কেমন কবি ছিলেন—কী ছিল তাঁর কবিতার প্রতিবাদ্য বিষয়—এসব এ লেখার প্রসঙ্গ নয়। এ লেখাটি প্রয়াত কবির প্রতি একজন অনুজ কবি, যাকে তিনি অকাতরে সতীর্থ নামক এক ‘মায়া-শৃঙ্খলে’ আবদ্ধ করেছিলেন—এটি শুধু তার শ্রদ্ধাচারণ মাত্র। ফজল শাহাবুদ্দীন খেতে ভালোবাসতেন—খাওয়াতেও। তাঁর এই খাওয়ানোর বাতিকে আজমিরী ভাবিরও সমর্থন ছিল। তা নাহলে সময় নেই অসময় নেই বাউণ্ডুলে অভুক্ত কবিদের পেট শান্ত করার দুরূহ কর্ম ফজল ভাইয়ের একার পক্ষে কি সম্ভব হতো? দুপুর হয়েছে অথচ ফজল ভাইয়ের বাসা থেকে কেউ না খেয়ে চলে এসেছে—এমন কোনো উদাহরণ আমাদের জানা নেই। বন্ধু—প্রিয় ফজল ভাইয়ের সতীর্থ তালিকা দীর্ঘ নয়। সে তালিকায় আমার নামের পাশাপাশি এক পর্যায়ে তিনি যুক্ত করেছিলেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজের নাম। আর আমাদেরকে ঘিরে যে বলয় তাতে অবধারিতভাবে সংযুক্ত হয়েছিল তরুণ কবি জাকির আবু জাফর। শেষের দিকে ফজল ভাইয়ের কাছাকাছি যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নূরুল হক। চট্টগ্রামের এই কবি অল্পদিনেই জয় করে নিয়েছিলেন ফজল ভাইয়ের মন। আমি, জাকির আর ফজল ভাই—একান্তে আমাদের কত স্মৃতি কত কথা। ফজল ভাইয়ের মৃত্যুর পরপরই অনেকে আমাকে লিখতে বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাকে এতটাই স্তব্ধ করে দিয়েছিল যে, আমার কলম কিছুতেই কোনো কিছুর জন্ম দিতে পারেনি। ফজল ভাই, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। ভালোবাসা যে এতটা কষ্টের, শ্রদ্ধা যে এতটা বেদনার—এই প্রথম আমি বুঝলাম; আপনার মৃত্যুর পর। ফজল শাহাবুদ্দীন একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমরা কেউ মরিনা’। সত্যিই তো দেহের বিনাশ আছে—কিন্তু কর্মের? কর্মের মধ্যদিয়েই একজন মানুষের বেঁচে থাকা। একজন মানুষ কর্ম দিয়েই স্থান গাড়েন অন্যের হূদয়ে। তারপর স্মৃতি হন। ইতিহাস হন। ফজল ভাই এখন আমাদের কাছে শুধুই স্মৃতি—শুধু এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস। যে ইতিহাস আমাদের নিয়ত সঙ্গী। আনন্দ ও বেদনায়, শীতে ও বর্ষায় যা আমাদের কখনো ভারাক্রান্ত করবে আবার কখনো উষ্ম। আর এরই মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাবে সময় এবং একসময় আমরাও পরিণত হব ইতিহাসে। বেইলী রোডের ‘বৈচিত্র’ অফিস ফজল ভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল। সময় অসময় নেই তিনি এখানে ছুটে আসতেন। নিচে এসেই খবর পাঠাতেন। আমি নেমে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতাম। এখানে অসংখ্যবার বিভিন্ন কবিতায়োজন হয়েছে আর তাঁর সবকটিতেই অনিবার্যভাবে ছিল তাঁর উপস্থিতি। ফজল ভাইকে ঘিরে অনুজ কবিদের আড্ডাকে তিনি খুব উপভোগ করতেন। এই ‘বৈচিত্র’ অফিসেই পালিত হয়েছিল তাঁর ৭৬তম জন্মদিন। এতে সামিল হয়েছিলেন অনেক নবীন-প্রবীণ কবি। কবিতা আলোচনা আর গানে কেটে গিয়েছিল অনেকগুলো ঘণ্টা। ফজল ভাই নেই, এই ‘বৈচিত্র’ অফিসে আর তাঁর পায়ের ছাপ পড়বে না—ভাবতেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দুচোখ ভরে আসে নিবিড় অশ্রুকণায়। ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘বন্ধু তালিকা’ও খুব একটি দীর্ঘ ছিল না। তাঁর প্রিয়বন্ধু হিসেবে যে তিন জনকে শনাক্ত করা যায় তাদের মধ্যমনি হারুন। এককালের সাড়াজাগানো নায়ক হারুনের সাথে দীর্ঘ ৪ দশক বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন তিনি। এক সঙ্গে ব্যবসা আর বন্ধুত্বের এই দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খান মোহাম্মদ আমীরের সাথেও ছিল তাঁর গভীর সখ্য। ফজল শাহাবুদ্দীনকে আর একজন মানুষ খুব প্রগাঢ়ভাবে ভালোবাসতেন, তিনি সজল আরেফিন। ফজল ভাইয়ের মৃত্যু তাঁকে শিশুর মতো কাঁদিয়েছে। অনুজ কবিদের মধ্যে ফজল শাহাবুদ্দীনের প্রিয় দুজন কবির নাম—আমিনুর রহমান টুটুল এবং শাকিল রিয়াজ। শাকিল এখন সুইডেন প্রবাসী। ফজল শাহাবুদ্দীন সাম্প্রতিক সময়ে যে দুটি গাড়ি ব্যবহার করেছেন তা খুব একটা বড় ছিল না। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, বড় মানুষের ছোট গাড়ি। তাঁর সেই গাড়িও ছিল আমাদের আড্ডাস্থল। তিনি তাতে আমাদের উঠিয়ে নিতেন আর চলে যেতেন দূরে কোথাও। কখনো কখনো আবার একটি চক্করেই শেষ হতো আমাদের যাত্রা। এই গাড়িতে অনুজদের সাথে কখনো কখনো প্রবীণরাও যুক্ত হতেন। উঠতেন কবি আল মুজাহিদী, কবি মাহবুব তালুকদার প্রমুখ। তখন আড্ডাটা বেশ জমত। আমরা এ আড্ডাকে বলতাম ‘গাড়ি আড্ডা’। বাংলা কবিতায় এই গাড়ি আড্ডার জনক আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। তিনি অবশ্য এদেশে আরও দুটি জিনিসের জনক। তার একটি ‘বসন্তকালীন কবিতা উত্সব’ আর অন্যটি ‘পিরিওডিক্যাল পত্রিকা’। এদেশে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘বিচিত্রা’র জনক এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। এরপর একে একে বিনোদন, চিত্রিতা, নান্দনিক প্রভৃতি অসাধারণ সব পত্রিকা বের হয়েছে তাঁরই হাতে। কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের আর একটি অনন্য কৃতি ‘কবিকণ্ঠ’। কবিতা বিষয়ক এ পত্রিকাটি অনিয়মিত হলেও এর প্রভাব আমাদের কবিতাঙ্গনে নিতান্ত কম ছিল না। ফজল শাহাবুদ্দীন নেই। এই ‘নেই’ হয়ে যাওয়া—এটাই সত্য, চিরসত্য, যেমন সত্য বৃক্ষকুল কীটপতঙ্গ পক্ষীকুল পৃথিবী এবং গ্রহতারা। এই সত্যের ওপরে দাঁড়িয়েও যে কথাটি উচ্চারণ করতে হচ্ছে আমাকে একান্তভাবে, যা শুধু আমার কথা নয়—সকলেরও। এ উচ্চারণ আমাদের যূথবদ্ধ উচ্চারণ—আর এ কোরাসের জনক আমাদের প্রিয় কবি প্রিয় মানুষ ফজল শাহাবুদ্দীন— ‘মানুষেরা ম’রে যায় কিন্তু এই প্রকৃতি প্রাচীন বেঁচে থাকে নিরবধি। যেন এক জীবনের ধারা চলে ক্রমাগত। যেন যাবে সেই চির মৃত্যুহীন পরপারে। ম’রে যায় বৃক্ষ পাখি ম’রে গ্রহ তারা সব কিছু ম’রে যায় কিন্তু তবু মরে না জীবন। অদ্ভুত আঁধার এক নিয়ে আসে মৃত্যুহীন জ্যোতি। বার বার বেঁচে ওঠে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আত্মার স্পন্দন— বেঁচে থাকে মহাজীবনের ক্রম প্রাচীন প্রকৃতি। ’ (জীবন, প্রকৃতি)