বসে থাকার রোগ: সিটিং ডিজিজ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৪, ১৯:৫৫
আপনি অধূমপায়ী। মদ, গাজা, চিনি আপনার দু’চোখের বিষ। মাংস, চর্বি কোন দিনও খাননা, কোক-পেপসি খাননা, যারা খায় তাদের আপনি অপছন্দ করেন। সকালে এক ঘন্টা জিমে কাটান, তুমুল ব্যায়াম করেন। তারপরও প্রিমিও গাড়ীতে অফিসে যান। দৌঁড়ে লোকাল বাস ধরার যন্ত্রণা বা যাত্রীদের সঙ্গে ঠেলাঠেলি আপনার জন্য কষ্ট কল্পনা। নয়টা-পাঁচটা ডেস্কে বসে কাজ করেন অফিসে। তারপর গাড়ীতে ঘুমিয়েই বাড়ি ফেরেন। সুখের সংসার আপনার। দাম্পত্য আপনাকে অশান্তি নয়, দিয়েছে মানসিক প্রশান্তি। রাতে পরিবারের সাথে ঘন্টা কয়েক টিভি দেখেন বা কম্পিউটার নিয়ে বসেন। অথবা ধরেন আপনি ছাত্র। সারাদিন লাইব্রেরীতে মুখ গুজে পড়ে থাকেন। মনোযোগ বিঘ্নিত হবে তাই এদিক সেদিক যাননা। ক্যান্টিনে আপনার ভয়, যদি আড্ডা জমে যায়। সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার করছেন। সো, নট নড়ন-চড়ন। যে কেউ বলবে, আপনার লাইফ স্টাইল ঈর্ষণীয়ভাবে স্বাস্থ্যহিতকর। কিন্তু বিশ্বাস কি করবেন, আপনি হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা সাড়েন ডেথ এর মারাত্মক ঝুঁকিতে আছেন? একজন ভিক্ষুক যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ায় তার তুলনায় আপনার হঠাত্ মরে যাবার ঝুঁকি ৪০ ভাগ বেশি। কিন্তু কেন? কোন সে কারণ লুকিয়ে আছে আপনার জীবনাচরণে? আর কুরে কুরে খেয়ে ফেলছে আপনার আয়ু। হ্যাঁ, সিটিং ডিজিজ নামের নতুন এক মহামারী রোগের গোড়াপত্তন হয়েছে চিকিত্সা বিজ্ঞানে। বিরতিহীন লম্বা সময় বসে থাকা (তা অফিস জব, লাইব্রেরী ওয়ার্ক, ধর্মকর্ম, টিভি দেখা, কম্পিউটার ফেসবুকিং যাই হোক) হূদরোগ ও হঠাত্ মৃত্যুর কারণ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। গবেষণায় এটি সুপ্রমাণিত। এমনকি আপনি এক ঘন্টা উসাইন বোল্টের গতিতে দৌঁড়ানোর পর যদি ছয় ঘন্টা অফিস-লাইব্রেরী-টিভি-কম্পিউটারে বসে থাকেন তবে আপনার (দৌঁড়ানোর) লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি বসে থাকার কারণে। বিরতিহীন বসে থাকার কারণে আপনার শরীরবৃত্তে যে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে তা থেকেই সিটিং ডিজিজ এর উত্পত্তি। এ সিটিং ডিজিজ একটা পেশাগত বিপত্তিও বটে। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয় যখন হার্ট এ্যাটাকে আক্রান্ত রোগী তার অফিসের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিবে তাকে কেন বসে বসে কাজ করতে হলো। তবে যে চিকিত্সক মধ্যদুপুর থেকে মধ্যরাত অবধি চেম্বারে বসে বছরের পর বছর রোগী দেখে যান-সে হয়তো তার অকাল মরণকালে নিজের অর্থলিপ্সা ছাড়া আর কিছুকে দায়ী করার সুযোগ পাবেনা কখনও। এ থেকে বাঁচতে হলে কাজের বা বিনোদনের ফাকে ফাকেই আপনাকে নড়াচড়া করতে হবে। উঠে দাঁড়াতে হবে। অদূরে দুয়েক মিনিট হেঁটে আসতে হবে। মূল উদ্দেশ্য হলো বসে থাকাটা যেন এক নাগাড়ে না হয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে হয়। এজন্য পাশের টেবিলে গিয়ে সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করতে পারেন তার পারিবারিক কৌশলাদি। যতবার ফোন আসবে কথা বলতে পারেন উঠে দাঁড়িয়ে, হেটে হেটে। অর্থ্যাত্ যে কোন ছল ছুতোয় বিরতিহীন বসে থাকাটায় ব্রেক দিতে হবে। ঘন্টায় পাঁচ-দশ মিনিট সময় ক্ষয় করতে হবে এভাবে ঘুরাঘুরি করে। মাঝে মাঝে হাত পা ঝাড়া দিন। পা দুটো সটান করুন, সম্মুখে, আড়মোড়া ভেঙ্গে শরীরটাকে মোচড় দিন একটু হাটাহাটি করুন। অফিসের বস যদি এ হাটাহাটিকে কাজের ক্ষতি মনে করেন তবে তাকেও মনে করিয়ে দিন রোগটার কথা। এতো গেলো অফিস টাইমের কথা। বিকাল ও রাতের সময়টার জন্য একটা সুপরামর্শ দিব আপনাকে। ঘরের টেলিভিশনটা ভেঙ্গে ফেলুন। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না এই টিভি আপনার দেহ-মন-মস্তিষ্ককে ঘুনে পোকার মত ধ্বংস করে দিচ্ছে। টিভি-ফেসবুক আপনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখছে। টিভি-ফেসবুক বাদ দিয়ে এই সময়টা আপনি বাচ্চাদের সাথে খেলা-দোলা করুন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এদিক-সেদিন ঘুরে আসুন। আপনি সিঙ্গেল হলে একা একা নিজের মনে ঘুড়ে বেড়ান। তবু কম্পিউটারের সামনে নিশ্চল বসে থাকবেন না।