বিশ্বে এখন মূল সমস্যা ইউক্রেন নিয়ে। দেশটি নিয়ে দ্বন্দ্বে মুখর বিশ্বের দুই পরাশক্তি। চলছে পাল্টাপাল্টি হুমকি। কিন্তু তাদের হুমকিতে ভাগ্য বিড়ম্বনায় পড়েছে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত উপদ্বীপ ক্রিমিয়া। উপদ্বীপটি কী ইউক্রেন থেকে বের হয়ে রাশিয়া ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হবে না কী রাশিয়ার কাছে ইজারা দেয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ অনেকের মনে। কারো কাছেই স্পষ্ট নয় কী আছে ক্রিমিয়ার ভাগ্যে। তবে ক্রিমিয়া যে অনেকাংশে যে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে সেটা বলাই যায়। ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টে এমপিরা একাট্টা যে তারা রাশিয়ায় যোগ দেবেন। আর রাশিয়ারও এতে সমর্থন আছে। এজন্য দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে। চলছে অবরোধের হুমকি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের নির্ভরশীলতার এই যুগে অবরোধে কেবল কোনো দেশ এককভাবে লাভবান কিংবা ক্ষতির সম্মুখীন হবে না। এর আঁচ লাগবে উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত এবং অনুন্নত সব দেশের ক্ষেত্রেই। সহজ কথায়, অবরোধ আরোপ করলে বৈশ্বিক অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাদানুবাদ এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রস্তুতি: ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ পর্যন্ত দুই বার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসময় তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়েছে। প্রথমবার ৯০ মিনিট এবং দ্বিতীয়বার প্রায় এক ঘন্টা কথা বলেছেন দুই পরাশক্তির দুই ক্ষমতাধর। সমপ্রতি ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যরা ক্রিমিয়াকে রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান। তারা রাশিয়া সরকারকে এ নিয়ে কার্যক্রম চালানোরও দাবি জানান। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শুক্রবার এই প্রথম রাশিয়া ক্রিমিয়ায় আক্রমণের প্রস্তুতির ব্যাপারে আভাস দিয়েছে। ইউক্রেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে। রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষ উভয় পরিষদের সদস্যরা জানিয়েছেন, রাশিয়া ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে ক্রিমিয়ার পার্লামেন্ট সদস্যদের আবেদনে সাড়া দিবেন তারা। শুক্রবার রাশিয়ার সংসদীয় দলের নেতারা ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানান এবং তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। আগামী ১৬ মার্চ এ বিষয়ে জনগণের রায়ের জন্য ক্রিমিয়ায় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ইউক্রেন সরকার এই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা পুতিনকে টেলিফোনে বলেছেন, আপনি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছেন। আর পুতিন বলেছেন, ক্রিমিয়ার রুশভাষীদের আহ্বান তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। আর দুই নেতার এই ফোনালাপ যে ক্রিমিয়া পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেনি সেটা সহজেই বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া এবং ইউক্রেনের কিছু নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। বিশেষ করে যারা ইউক্রেন সংকটের জন্য দায়ী। ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিয়ে রাশিয়ার ওপর মার্কিন অবরোধ আরোপের বিষয়ে সতর্ক করেছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ টেলিফোনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তির অবরোধ আরোপের হুমকিকে তোয়াক্কা না করেই রাশিয়া ক্রিমিয়ার ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুক্রবার রাশিয়ায় একটি বিশাল র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৬০ হাজার নাগরিক উপস্থিত হন। র্যালিতে ‘রাশিয়া, মস্কো এবং ক্রিমিয়া’ স্লোগান দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। এ সময় র্যালিতে ক্রিমিয়ার পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলকেও স্বাগত জানানো হয়। ক্রিমিয়ায় রুশ সেনার অনুপ্রবেশ অনেকের কাছে ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণ বলে মনে করছেন। এরপর হয়তো ক্রমান্বয়ে ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলও দখল করার দিকে মনোযোগ দিবে রাশিয়া। এমনকি ক্রিমিয়ায় কোনো পর্যবেক্ষকও প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ক্রিমিয়ায় অবস্থানরত সেনারা।
ক্রিমিয়া নিয়ে রাশিয়ার দাবি: রাশিয়া ইউক্রেনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে সেই আঠার শতাব্দীর ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের ইতিহাসে। ওই সময় রাশিয়া অটোমান সাম্রাজ্য থেকে দক্ষিণ ইউক্রেন এবং ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৫৪ সালে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে হস্তান্তর করে রাশিয়া। এটা ছিল সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের পুরস্কার। কারণ তিনি নিজেই অর্ধেক ইউক্রেনিয়ান ছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেিসন ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সঙ্গে রাখতে সম্মত হন। ওই সময় রাশিয়ার ব্লাক সি ফ্লিটও ক্রিমিয়ার সিভাস্তোপোলে রাখার সিদ্ধান্ত হয় এবং পরবর্তীতে এটা ২০৪২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আদি ইউক্রেনের সংখ্যা ২৪ শতাংশ। সেখানে রাশিয়ার ৫৮ শতাংশ। তাতারস আছে ১২ শতাংশ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর তাতারসরা আবার ফিরে আসতে শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যাতে ক্রিমিয়াকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স স্বাক্ষর করে। এর নিজস্ব একটি পার্লামেন্ট আছে। চুক্তির পর রাশিয়াপন্থি একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৫ সালে এটি বিলুপ্ত করা হয়। এখন ক্রিমিয়ায় প্রেসিডেন্টের একজন প্রতিনিধি থাকেন এবং একজন প্রধানমন্ত্রী থাকেন। তবে উভয়কেই নিয়োগ দেয় কিয়েভের কেন্দ্রীয় সরকার। চুক্তি অনুযায়ী ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ২৫ হাজার সৈন্য রাখার অনুমতি পায় রাশিয়া। বর্তমানে আছে ১৬ হাজার। এই সব সৈন্যরা থাকবে ঘাঁটিতে। কিন্তু এখন ক্রিমিয়া জুড়েই নিয়োজিত রয়েছে সৈন্য। মস্কো বলছে, তারা স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী। কিন্তু খবর পাওয়া যায় তারা রাশিয়া থেকে এসেছে।
অবরোধে কার লাভ কার ক্ষতি: ব্রিটেন এবং পরবর্তী ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার ব্যবসায়িক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। অবরোধ আরোপ হলে দুইপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইইউ র্যাংকিংয়ে রাশিয়া তাদের এক নম্বর ব্যবসায়ীক অংশীদার। এই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ছে এবং ২০১২ সালে এটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। ইইউ রাশিয়ায় মেশিনারি এবং পরিবহন সংক্রান্ত যন্ত্রাদি, কেমিক্যাল, ঔষধ এবং কৃষি পণ্য রপ্তানি করে। রাশিয়া থেকে অশোধিত তেল এবং গ্যাস আমদানি করে। জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বিভাগ (ইআইএ) জানায়, ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার তেল রপ্তানির ৮৪ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৭৬ শতাংশ আমদানি করে। জার্মানি এককভাবে সবচেয়ে বেশি তেল এবং গ্যাস রাশিয়া থেকে আমদানি করে। ব্রিটেন রাশিয়া থেকে ৬ শতাংশ গ্যাস ক্রয় করে। যুক্তরাষ্ট্রও রাশিয়ার ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০১৩ সালে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে যা রাশিয়ার রপ্তানির চেয়ে দ্বিগুন। যুক্তরাষ্ট্র ৫ শতাংশ গ্যাস রাশিয়া থেকে আমদানি করে।
২০১৩ সালের এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমস সূচক অনুযায়ী ব্রিটেনের রপ্তানির দিক থেকে ব্যবসায়িক অংশীদারের তালিকায় রাশিয়া ১৪ তম নম্বরে এবং আমদানির দিক থেকে ১৬ তম নম্বরে। ব্রিটেন রাশিয়ায় রপ্তানির চেয়ে দেশটি থেকে আমদানিই করে বেশি। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত রাশিয়া থেকে আমদানি করে ২৭০% এবং রাশিয়ায় রপ্তানি করে ৪৩০%। ২০১৩ সালে রাশিয়া ছিল ইইউ’র বাইরে সবচেয়ে বেশি রপ্তানির দেশ। ব্রিটেন রাশিয়ায় সব পরিবহনের ৯দশমিক ৫ শতাংশ পরিবহন রপ্তানি করে। ২০১১ সালে ব্রিটেন রাশিয়ায় ব্যবসায়িক এবং অর্থনীতি সংক্রান্ত সেবা প্রদান করে যার আর্থিক মূল্য ছিল ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো।
ব্রিটেন রাশিয়ার বিনিয়োগ থেকে লাভবান হয়। ২০১১ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়ার বিনিয়োগ থেকে লাভবান হওয়া দেশগুলোর মধ্যে ৬ষ্ঠতম। সাইপ্রাস সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় যা ১২২ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে দেশটিতে আর্থিকখাত এবং কর খাতে সুবিধা হচ্ছে। আঙ্কটাডের সূত্রমতে, ২০১২ সালে অর্থনীতিতে রাশিয়া ছিল আট নম্বরে এবং যুক্তরাষ্ট্র এক ও ব্রিটেন ৫ম নম্বরে। রাশিয়ায় ব্রিটেনেরও বিনিয়োগ আছে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান রোজনেফটের সঙ্গে প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার আছে। ব্রিটিশ ফার্মগুলো রাশিয়ার সঙ্গে নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে।
