মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। তৈরি হচ্ছে নয় লক্ষ ৩০ হাজার ভোটকেন্দ্র। প্রস্তুত হচ্ছেন ভারতের প্রায় সাড়ে ৮১ কোটি ভোটারও। ৭ এপ্রিল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে ১২ মে শেষ। নির্বাচনের ভোট গণনা হবে ১৬ মে। তাই অপেক্ষা শুধু লড়াই শুরুর। দুটি বাদে ৫৪৩ আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। ছত্তিশগড়, ওড়িশা, ঝাড়খন্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যের মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকাতে একদিনে ভোট হবে। ভারতীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য হলো ভারতের নির্বাচন ‘গণতন্ত্রের উত্সব’। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক দেশটি সেই উত্সবে মাততে যাচ্ছে। তবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা আর আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী হওয়ায় নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ সরলরেখায় এগোচ্ছে না। নিত্য-নতুন জোট আর দলের নানামুখী প্রচারণা প্রতিনিয়ত পাল্টে দিচ্ছে জয় হিসাব-নিকাশ।
তবে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস জোট এবার বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ভোটে জিতে সরকার গঠনের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হতে পারছে না দলটি। অন্যদিকে যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বিরোধীদল বিজেপি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের নির্বাচনের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে বড় ছয়টি রাজ্য। উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও তামিলনাড়ুই দলগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে।
উত্তর প্রদেশ : ৮০ আসন
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য হওয়ায় উত্তর প্রদেশের (ইউপি) দিকেই নজর সকল রাজনৈতিক দলের। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, বিজেপির নরেন্দ্র মোদি, আম আদমি পার্টির (এএপি) অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিশানায় রয়েছে এই রাজ্য। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আশ্চর্যজনকভাবে কংগ্রেস ইউপিতে ২১টি আসন পেয়েছিলো। এবার বিজেপি আশা করছে, তারা এখানে সফলতা পাবে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টির অবস্থা এখন বেশি ভালো নয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নির্ভর মুলায়ম সিং যাদব এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টির কাছে ধরাশায়ী হতে পারেন। অন্যদিকে, মোদির নেতৃত্বে এবার ইউপিতে পুনরুত্থান হতে পারে বিজেপির। এমনটা ঘটলে খাদের কিনারে গিয়ে পড়তে হবে কংগ্রেসকে।
মহারাষ্ট্র : ৪৮ আসন
মহারাষ্ট্রের শহুরে ভোটাররা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস এনসিপির সঙ্গে এবং বিজেপি শিব সেনার সঙ্গে জোট করছে। তবে সেনা ভেঙে যাওয়া মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার প্রধান রাজ ঠাকরে এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন। আর শহর এলাকায় এএপিও প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও শিব সেনার ভালো করার সম্ভাবনা বেশি থাকলেও কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। কারণ গ্রামীণ এলাকায় কংগ্রেসের অবস্থান ভালো। গত নির্বাচনে কংগ্রেস ও এনসিপি জোট এ রাজ্যে ২৫টি আসন পেয়েছিলো। আর বিজেপি শিবসেনা পেয়েছিলো ২০টি।
বিহার : ৪০ আসন
বিহারের নিতীশ কুমার প্রধানমন্ত্রী হতে চান এমন প্রত্যাশার কথা আগেই প্রকাশ করেছেন। ইউপি’র মতো বিহারও বিজেপি ও মোদীর জন্য সঙ্কটাপূর্ণ। যে কারণে রামবিলাস পাসওয়ানের সঙ্গে বিজেপি জোট করার চিন্তা করছে। উচ্চবর্ণের মধ্যে মোদীর ও বিজেপির প্রতি সমর্থন থাকলেও দলিত ও নিম্নবর্ণের মধ্যে সমর্থন কম। দলিতদের দলে টানতেই বিজেপি ভেবে-চিন্তে জোট করছে। অন্যদিকে, মোদীকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করার পর সরে গিয়েছে নিতীশ কুমার। মুসলিম ভোটের চিন্তা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আবার লালু প্রসাদ যাদবের সঙ্গে জোট করছে কংগ্রেস। তাই নির্বাচনে এবার কিছু বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে বিহার।
পশ্চিমবঙ্গ : ৪২ আসন
পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জোটে যাওয়ার কৌশল। তিনি কীভাবে তার নির্বাচনী জোট করবেন সেদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সকলের চোখ। মমতা এখন নিজেকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করছেন। এই নির্বাচনে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস ৩০টি আসন পেলে তার দলকে ক্ষমতা থেকে দূরে ঠেলার সাহস পাবে না কেউ। তবে এবারের নির্বাচনে সিপিএম আগের চেয়ে ভালো করতে পারে। কারণ তারা অতীতের রাজনৈতিক ধরনে পরিবর্তন আনতে চায়। তবে বামদের উত্থানের চেয়ে নারী নির্যাতন ও অপরাধের কিছু ঘটনা তৃণমূলের অবস্থানকে বেশি দুর্বল করছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে বড় দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থা সুবিধাজনক নয়। গত নির্বাচনে কংগ্রেস ৬টি আসন পেয়েছিলো এবারো এর কাছাকাছি আসন পেতে পারে। বিজেপি পেয়েছিলো ১টি আসন। তবে তারা এবার সেটিও পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
তামিলনাড়ু : ৩৯ আসন
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জয়াললিতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশাবাদ নিয়ে এগোচ্ছেন। নির্বাচনে তার দল এআইএডিএমকে একচেটিয়া জিততে পারবে না। এখানে এম করুণানিধির ডিএমকে ভাগ বসাবে। তবে জয়াললিতার দলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা ডিএমকের জন্য কষ্টসাধ্য হবে বলে অনেকের ধারণা। এদিকে, বিজেপি জোট করেছে দুটি প্রভাবশালী দল পিএমকে ও এমডিএমকে’র সঙ্গে। তবে নির্বাচনে চমক দেখিয়ে বামদের নিয়ে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের ভাবনা রয়েছে জয়াললিতার।
অন্ধ্র প্রদেশ : ৪২ আসন
বিভক্ত রাজ্য বিভক্ত দল। তেলেঙ্গানা ইস্যু এখানকার নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অনেকের নজর রয়েছে এই রাজ্যে। সীমান্ধ্রে ওয়াইএসআর কংগ্রেসের নেতা জগনমোহন রেড্ডি এবং টিডিপি’র এন চন্দ্রবাবু নাইড়ুর মধ্যে হবে মূল লড়াই। যদিও মোদীর কারণে নাইড়ু জোট করছেন বিজেপির সঙ্গে। আর একাই বিপদসঙ্কুল অবস্থায় রয়েছেন জগনমোহন। অন্যদিকে, তেলেঙ্গানায় টিআরএস নেতাকে চন্দ্রশেখর রাওয়ের জয়ের সম্ভাবনা বলা যায় স্পষ্ট। কংগ্রেস তার সঙ্গেই জোট করার চিন্তা করছে। তবে নির্বাচনের পর রাও নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। গত নির্বাচনে কংগ্রেস অন্ধ্র প্রদেশে ৩১টি আসন পেয়েছিলো। কিন্তু এবার তেলেঙ্গানা ইস্যুতে কংগ্রেসের আসন কমছে এটা অনেকেরই ধারণা।
