নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কঠোরতায় অবশিষ্ট তিন ধাপে অনুষ্ঠিতব্য উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তত্পর হয়ে উঠেছে স্থানীয় প্রশাসন। সদ্য অনুষ্ঠিত দুই ধাপের উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনের শিথিলতায় সহিংসতা ও আচরণবিধি লংঘন হয়েছে বলে মনে করছে ইসি। তাই এবার কমিশনের কঠোর অবস্থানে সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত ও আচরণবিধি ভঙ্গকারীদের শাস্তি প্রদান শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন নির্বাচনী অপরাধে এ পর্যন্ত ২১৯ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার ৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রমে কারাদণ্ড দেয়া হয়। জরিমানা করা হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকেও। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীদের নজরদারিতে রাখার জন্য রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, আগামী ধাপগুলোয় অধিক সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আগামী বৃহস্পতিবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে।
ইসির সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপের ৯৭ উপজেলার তুলনায় দ্বিতীয় ধাপের ১১৫ উপজেলার নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কমিশন। কমিশন থেকে মাঠ পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে। আগামী ধাপের নির্বাচন সহিংসমুক্ত করতে কমিশনাররা নিজেরাই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের সঙ্গে প্রতিদিনই টেলিফোন যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িতদের তাত্ক্ষণিক আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্বাচনী সংঘাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের আইজিপি বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে ইসি সচিবালয়। এরপরই গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে ১০ জনকে গ্রেফতার করেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এছাড়া যেসব উপজেলায় আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সংঘর্ষের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে সেখানকার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনের উপর তদারকির জন্য ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ১৮ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা ইত্তেফাককে বলেছেন, কমিশনের কঠোর অবস্থানের কারণে স্থানীয় প্রশাসক অনেকটা তত্পর হয়েছে।
কমিশনের নির্দেশনার পর গতকাল সোমবার সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগে চাম্পাফুল গ্রামের সৈয়দ আহমেদ আলতাফ হোসেনকে দুই বছর, বরেয়া গ্রামের মো:নজিরকে এক বছরের এবং অবৈধ গাঁজা রাখার অপরাধে মহত্পুর গ্রামের শেখ সালাউদ্দিনকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে। কমিশনের হিসাব মতে, এ পর্যন্ত ২১৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর আগে দুই ধাপের নির্বাচনে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ২শ জনের উপরে শাস্তি দেয়া হয়। ৫ লাখ ৭০ হাজারের উপরে টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দুই ধাপের নির্বাচনে ১৬২টি কেন্দ্র ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়।
কয়েক প্রার্থীকে জরিমানা
নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে গতকালই বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে ফেনীর দাগনভুঁইয়ায় চেয়ারম্যান প্রার্থী এএসএম নুরুন নবী দুলালকে পঁচিশ হাজার টাকা এবং একই উপজেলার আরেকজন চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আলমগীর হোসেনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৌধুরী আশরাফুল করিম। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাবেয়া বসরী চেয়ারম্যান প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেনকে ১৫ হাজার, এটিএম মিজানুর রহমানকে তিন হাজার, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইল আলমকে পাঁচ হাজার, জামাল উদ্দিনকে চার হাজার, জসিম উদ্দিনকে এক হাজার ৫০০, মতিউর রহমান খানকে চার হাজার, শাহ আলমকে আট হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে সাচনাবাজার গ্রামের সুভাষ পালকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শফি কামাল।
নজরদারিতে প্রভাবশালীরা
স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালীদের গোপন নজদারিতে রাখার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। আচরণবিধি অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ এবং সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তার সমমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোন ব্যক্তি নির্বাচন পূর্ব সময়ে নির্বাচনী প্রচারণা বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উপর নজরদারি করার জন্য কমিশন থেকে বলা হয়েছে। এমনিভাবে পটুয়াখালীতেও এক ব্যক্তির কার্যক্রমের উপর নজর রাখা হচ্ছে। এখনো প্রতিনিয়ত কমিশন সচিবালয়ে অসংখ্য অভিযোগ আসছে। তবে রিটার্নিং অফিসার বরাবর যেসব অফিযোগ আসছে তা দৃষ্টিগোচরে না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না কমিশন।
ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কমিশন বরাবর অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সেনা-র্যাব-বিজিবির টহল জোরদার করা হবে।
৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে ৯৭টি এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে ১১৪টি উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এছাড়া আগামী ১৫ মার্চ ৮৩টি, ২৩ মার্চ ৯৩টি এবং ৩১ মার্চ ৭৪টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোর নির্বাচন পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে।
