দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির মাজারে আগামী ১৫ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সব। দোল পূর্ণিমার তিথিতে প্রতিবারের মতো এবারও দেশি-বিদেশি পর্যটক ও সাঁইজির ভক্তানুরাগীদের আখড়া বাড়িতে আগমন ঘটতে শুরু করেছে। লালন আখড়া বাড়ির উন্মুক্ত চত্বরে লালন একাডেমির আয়োজনে এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আলোচনা, লালন মেলা ও লালন সংগীত পরিবেশন। ১৫ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় উত্সব উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশস্থ চীন রাষ্ট্রদূত লিউ জিং। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তার জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার তিথিতে ছেঁউড়িয়ায় উত্সব করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় পালন করা হয় তার বার্ষিক স্মরণোত্সব। বাউল সম্রাট লালন সাঁইজির তিরোধানের পর তার ভক্ত বাউলেরা দোল উত্সবের পাশাপাশি প্রতিবছর পহেলা কার্তিক তার তিরোধান দিবস পালন করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে ছেঁউড়িয়ায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমার তিথিতে দোল উত্সব ও পহেলা কার্তিকে সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী উত্সব হয়।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষ গুরুর দীক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসেবে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির আবির্ভাব ঘটে কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে। লালন সাঁইজির জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় লালন ফকির ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়রা গামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। যৌবনকালে পূণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বেড়িয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রন্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে।
ফকির লালন সাঁই ভক্ত মলম শাহ আখড়া তৈরির জন্য ষোলো বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ওই জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। সেই ঘরেই তার সাধন-ভজন বসতো। মৃত্যুর পর লালনের সমাধি হয় তার বসত ঘরের মাঝখানে। ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়ার তত্কালীন জেলা প্রশাসক কিউ জি আহাদ, দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী (কানু বাবু) ও মোজাম্মেল হক (কেরু মিয়া)’র উদ্যোগে লালনের মাজার উন্নয়ন কাজ শুরু ও মূল গেট নির্মাণ হয়।
প্রথমে লালন আখড়াবাড়ি, দ্বিতীয়ত ১৯৬২ সালে ‘লালন লোক সাহিত্য কেন্দ্র’ পরবর্তীতে ১৯৭৬ সাল থেকে ‘লালন একাডেমি’ নামকরণের মধ্যদিয়ে এখানে প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হয়।
লালন একাডেমিক ভবনের নিচ তলায় রয়েছে লালন মিউজিয়াম, দ্বিতীয় তলায় লাইব্রেরি, তৃতীয় তলায় অফিস এবং চতুর্থ তলায় রয়েছে লালন সংগীত একাডেমি। মিউজিয়ামে রয়েছে লালন শাহের শিষ্যবৃন্দের ব্যবহারকৃত তামার বিশাল ডেগচি, পিতলের তৈরি হুক্কা, পিতলের করঙ্গ, হীরু শাহের ব্যবহারকৃত একতারা, লালন শাহের ঘরে ব্যবহারকৃত দরজা। মাজারে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজিসহ মোট ৩২টি সমাধি আছে। এর মধ্যে ১৪টি সাঁইজির নিজহাতে মুরিদ, ১ জন প্রশিষ্য আর বাকি সব অনুসারীর সমাধি।
