আগামী শনিবার তৃতীয় ধাপের ৮১টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনী দায়িত্বে মাঠে নেমেছে সেনা বাহিনী। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় পৌঁছেছেন সেনা সদস্যরা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন তারা। ভোটগ্রহণের আগে-পরে মোট ৫দিন সেনা সদস্যরা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন।
এই ধাপে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ১১৯জন প্রার্থী। সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ শেষ করতে ওই দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। তাই ভোটগ্রহণের পর ৩২ ঘণ্টা পর্যন্ত সব ধরনের শোভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও এসময় কিছুটা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, যে কোন মূল্যে নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধ করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হবে।
এদিকে, রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় প্রার্থী বিজয়ী করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর বিভক্তি দেখা দিয়েছে এবং সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। দিন যতই যাচ্ছে সংঘাতের ঘটনা ততই বাড়ছে। নির্দলীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে তৃতীয় ধাপে নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচনী সহিংসতাও বেড়েছে। সহিংসতার কারণে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, ধাপে ধাপে নির্বাচন করার কারণে দ্বিতীয় ধাপে কিছু সহিংসতা হয়েছে। প্রথম ধাপের ফলাফল আগে জেনে যাওয়ার কারণে রাজনৈতিক দলগুলো পরের ধাপে প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে আরো তত্পর হয়ে উঠে। এজন্য সহিংসতা হয়। এজন্য ধাপে ধাপে নির্বাচন করাটা ভুল ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে নির্বাচনে সহিংসতা হয়ে থাকে। তবে আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি। তাই সহিংসতা তুলনামূলক কম হচ্ছে।
স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে সেনা
অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা করতে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন। ১২ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করবেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। প্রতিটি উপজেলায় ১ প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩৪ সদস্য) করে এ ফোর্স কাজ করবে। নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের কারণে কোন অপরাধীকে আটকের ক্ষমতা নেই সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তারা সব কিছু করবেন। ভোটগ্রহণে সেনা বাহিনীর সহযোগিতার বিষয়ে আবু হাফিজ বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী নির্বাচন কর্মকর্তাদের ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এর মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় ১জন বিচারিক ও ৪জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রার্থী কিংবা তার সমর্থক বিধি ভঙ্গ করলে তাত্ক্ষণিক সাজা দেন। আর বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযোগ আমলে নিয়ে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি দেন।
নির্বাচনে কেন্দ্র পাহারায় থাকবে ৭৬ হাজার জন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে পুলিশ সাধারণ কেন্দ্রে অস্ত্রসহ ১জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দে ২জন। এছাড়াও আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, ব্যাটালিয়ান আনসার ও চৌকিদার-দফাদার পাহারায় থাকেন।
আজ মধ্যরাতে বন্ধ প্রচারণা
আজ বৃহস্পতিবার রাত ১২ টায় বন্ধ হচ্ছে সব ধরনের ভোট প্রার্থনা। এ বিষয়ে ইসির একজন সহকারী সচিব বলেন, নির্বাচনের ৩২ ঘণ্টা পূর্বে সকল প্রচার-প্রচারণা বন্ধ থাকবে। তা অব্যাহত থাকবে নির্বাচনের পর ৬৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন থাকায় এ সময়ে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে কেউ আইন ভঙ্গ করলে কারাদণ্ড ও আর্থিক দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এমনকি প্রার্থিতাও বাতিল হবে।
সংখ্যালঘু এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত ২১৫ উপজেলার নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচনেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে ইসি। যেসব এলাকায় ওই সম্প্রদায়ের বসতি রয়েছে সেসব এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে থাকবে বিশেষ ফোর্স। চলবে গোপন নজরদারিও।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এলাকায় নজরদারি
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং নিজ পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী দেখতে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এসব বিষয় নিয়ে। তাদেরকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে দলগুলোর কাছে চিঠি দেয়ার উদ্যোগ নেয় ইসি। নির্বাচন কমিশনার মো শাহ নেওয়াজ বলেন, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও তাত্ক্ষণিক ওই কেন্দ স্থগিত করা হবে। এমনকি নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে প্রভাবশালী যেই হোক না কেন, নির্বাচনী প্রচারের উদ্দেশ্যে অন্য এলাকায় গেলে তাত্ক্ষণিক গ্রেফতারের জন্য রিটার্নিং অফিসার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৮৩ উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। কিন্তু ক্ষমতাসীন দুই গ্রুপের মধ্যে সহিংসতা ও সংঘর্ষের কারণে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন স্থগিত হয়। সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা এবং আদালতের নির্দেশে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের নির্বাচনটি বন্ধ রয়েছে। এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে এবং দ্বিতীয় ধাপের ভোট হয় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। বাকি চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপের নির্বাচন হবে যথাক্রমে ২৩ ও ৩১ মার্চ।
