সাক্ষাত্কার : রফিক আজাদ

‘কবিরা সমাজের মূল্যবোধকে পাহারা দেয়’

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৪, ১৭:৫৪
বোধের অংশীদার হওয়ার দাবি নিয়ে যিনি প্রেমিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান, যিনি প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দেন মন থেকে মনে—তিনি কবি রফিক আজাদ। তিনি আলস্যে বুঁদ হয়ে থাকলেও, প্রতিবাদের ভাষা কখনো হারিয়ে ফেলেন না। এক পৌরুষ তাঁর কবিতার মাঝে সারাক্ষণ যেন বিচরণ করে। তারপরও বিরহ তাঁর চিরকালের সঙ্গী। কী এক সখ্য যেন তিনি গড়ে তুলেছেন প্রেম-বিরহের সাথে। তিনি স্যাড জেনারেশনের একজন প্রণিধানযোগ্য কবি। তিনি ‘বহিরঙ্গে নাগরিক, আর অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’। তিনি সত্যের কাছে দায়বদ্ধ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কখনো প্রেয়সীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হন বিনীত, আবার রুদ্ররোষে পুড়ে শোষকের সিংহাসনকে করেন স্তম্ভিত। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কবির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় মুখোমুখি হয়েছিলেন শামস আরেফিন আমার কবিতার মাঝে চিরকালই একটা থিম বা মেসেজ থাকে। এ কারণে তা কবিতা না হয়ে প্রবন্ধের বিষয় হতে পারত। সেই অর্থে—মানুষ যাতে কোনো কিছু জানতে পারে, তা নিয়েই আমি কবিতা লিখেছি। যেমন আমার কবিতায় আমি ‘সুতোর এপারে মানুষ আর ওপারের মানুষ’-এর মাঝে তফাত বুঝিয়েছি। কারণ, মানুষ এপারের সুতার নির্দিষ্ট পরিমাণ সীমা অতিক্রম করলে মৃত্যুবরণ করে। প্রশ্ন :আপনার রচিত ‘দ্য স্যাড জেনারেশন’-এ বলেছেন, ‘We are dynamite in our blood. We know it but we are helpless, simply undone... এভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার কারণ কী? রফিক আজাদ : সেই সময়ে আমরা যারা ষাটের দশকের, তারা এই আলাদা পরিপ্রেক্ষিতে প্রভাবিত। কারণ, ওই সময় সামরিক শাসন চলছিল। এর মাধ্যমে মূলত এক ধরনের বিদ্রোহ করা। আর রাজনৈতিক সচেতনতা থেকেই এ পঙিক্ত লেখা। সামরিক শাসন আমাদের বুকের উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। এর মাধ্যমে আসলে সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিদ্রোহ করি। যার লক্ষ্য ছিল সামরিক শাসনকে প্রতিরোধ করা বা উড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু পদ্ধতিটা তুমি বলতে পারো ‘Self Destructive’। কারণ, কবিরাই সমাজের সবচেয়ে সচেতন অংশ। আর তাকে তো এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই হবে। প্রশ্ন :আপনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ মানুষ বলে আমরা জানি। তাঁর সময়কার কনফেশনাল পয়েট্রির ব্যাপারে কিছু বলুন? রফিক আজাদ : আসলে এর মাধ্যমে তিনি ত্রিশের মূল স্রোত থেকে নিজেকে আলাদা করতে চেয়েছেন। কারণ ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডপ ও জীবনান্দ দাশ আধুনিক বাংলা কবিতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি সচেতনভাবে তা এড়িয়ে যান। তাঁর কাব্যভাষার প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়. শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও শঙ্খ ঘোষ ৫০-এর দশকে কবিতায় এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুধু পঞ্চাশের নয়, সারা বাংলার কবিতায় এক গুরুত্বপূর্ণ কবি। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও বিশেষ করে তাঁর ভাষাভঙ্গি ও কাব্যের বিষয় কনফেশনাল-এর ভিত্তি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। ৫০-এর দশকে এ কনফেশাল কবিতা আমেরিকায় প্রথম লেখা হয় শুরু হয়। তবে এ আন্দোলনের মধ্যে নেতৃত্ব প্রদান করেন অ্যালেন্স গিন্সবার্গ। এটা একটি প্রতিকী কবিতার আন্দোলন বলা যায়। প্রশ্ন :আপনি কবিতায় অনেক আধুনিকভাবে গ্রামকে উপস্থাপন করেছেন। তাই অনেকে আপনাকে নাগরিক কবি বলেন। সরাসরি নাগরিক জীবনের প্রভাবে প্রভাবিত হলেও আপনি গ্রাম-বাংলাকে ভুলে যাননি। যেমন—‘শৈশবের পরিত্যক্ত মাঠের ডাকে...’ আপনি সাড়া দিতে কার্পণ্য করেননি? রফিক আজাদ : আমার কবিতার লাইন ধার করে তুমি বলতে পারো আমাকে ‘বহিরঙ্গে নাগরিক, অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’। প্রশ্ন :আপনাদের সময়ে অতিরিক্ত আরবি-ফারসি শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহারে ‘মুসলমানি বাংলা’ প্রচলনের বিরুদ্ধে আপনার শৈল্পিক প্রতিবাদ—কবিতায় তত্সম শব্দের স্বছন্দ ব্যবহার। রাজনৈতিক স্বেচ্ছারিতার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদের ব্যাপারে তরুণ কবিদের ভূমিকা কেমন হতে পারে? রফিক আজাদ : আমি একেবারেই তখন আরবি-ফারসি বর্জন করে তত্সম শব্দ বেশি ব্যবহার করে কবিতা লেখা শুরু করি। মানে তখন ভাষা এতটা বিশ্রী হয়ে পড়ে যে তা করতে বাধ্য হই। আমার সমসাময়িক বন্ধুদের মধ্যে কেবল আবদুল মান্নান সৈয়দের মধ্যে এ তত্সম শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এখনকার তরুণরাও পিছিয়ে নেই। তারাও তো অনেক আন্দোলনে ভূমিকা রাখছে। প্রশ্ন :আপনি যখন বলেন, ‘তুমি চাও/ মাটির উনুন শানকিতে শাদাভাত,/ পরিমিত নুন, স্বাদু তামাকের তাঁবু/ শাড়ির ভেতর এক আলুথালু নরম শরীর...’ এখানে ‘তুমি’ কী নিজে? রফিক আজাদ : আরে এই ‘তুমি’ই হচ্ছে কবি রফিক আজাদ। আর নারীটি তো আমার সহধর্মিণী। আর এ কারণেই তোমরা আমাকে কখনো শুধু মাত্র নাগরিক কবি বলতে পারো না। কারণ, ও আমাকে দায়দায়িত্ব থেকে রেহাই দিয়েছে। তা না হলে নিশ্চয়ই আমাকে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। সেক্ষেত্রে হয়তো লেখালেখির সময় হয়তো কমে যেত। তাই ও স্বেচ্ছায় সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। প্রশ্ন :অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন। যেমন—‘এ কেমন কাল এলো’, ‘হাতুড়ির নিচে জীবন’, ‘পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ’, ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ’সহ অনেক কবিতা। বর্তমান তরুণ কবিরা রাজনৈতিকভাবে কতটা সচেতন বলে মনে করেন? রফিক আজাদ : এ বৈশিষ্ট্য আমার কবিতায় সবসময়ই ছিল। বর্তমানে তরুণদের হয়তো সেই অর্থে তাদের সমস্যাগুলো অনুভূত হয়নি। হয়তো তারা কেবল লেখালেখি শুরু করেছে। কিন্তু যখন পরিণতির দিকে যাবে, তখন নিশ্চই তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবে। কারণ, কবিতা লেখার শুরু তো তুমি-আমি দিয়েই হয়। কী বলো? প্রশ্ন :সমালোচকরা বলেছেন, ‘পঞ্চাশের কবি যদি হন পরিশীলিত পরিপাটি ভদ্রলোক, ষাটের কবিকে বলা যাবে এক শানিত যুবক’ আপনি এবার ৭২ বছরে পদার্পণ করেছেন। এ অবস্থায় কবিতায় কি শানিত যুবকের মতো তারুণ্যের উপস্থিতি খুঁজে পান? রফিক আজাদ : শারীরিক দুর্বলতা কিছুটা জেঁকে বসেছে। তবে আমার কবিতায় যে পৌরুষ নেই, তা কিন্তু তুমি কখনো বলতে পারবে না। প্রশ্ন :আপনার সমসাময়িক কবিদের সর্ম্পকে কিছু বলুন? রফিক আজাদ : আমাদের সময়ে কাব্যভাষায় অতুলনীয় ছিল কবি আবুল হাসান। পরাবাস্তব ধারণা নিয়ে পুরোই আলাদা পথ তৈরি করেছে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। নির্মলেন্দু গুণ নিজেই নিজের পথ রচনা করেছে। আসাদ চৌধুরী আমার সহপাঠী, হয়েছে লোকজ সংস্কৃতির প্রতিনিধি। আর সিকদার আমিনুল হক তৈরি করেছে দর্শনের আরেক জগত্। সেই সাথে হেলাল হাফিজ হতে পেরেছে গণমানুষের কবি। সম্প্রতি সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছে। ওর পুরস্কারটা আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল। যা হোক দেরিতে হলেও পেয়েছে। প্রশ্ন :আপনি কবিতায় এক সময় বললেন, ‘ভাত দে হারামজাদা...’ সেই আপনি ১৯৮২ সালে ‘সশস্ত্র সুন্দর’ লেখেন, ‘হে কলম উদ্ধত হয়ো না নত হও, নত হতে শেখো...’। আবার সেই আপনি মেকি রোমান্টিসিজম ভাঙতে বলেন, ‘মানুষ শব্দটি লিখে তাতে আমি মুতে দেই’ বিষয়টা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? রফিক আজাদ : আসলে আমার এ দ্বিতীয় কবিতাটি একটা স্যাটায়ার কবিতা। এর অর্থ এই নয় যে, আমার প্রতিবাদের স্বর কোমল হয়ে গেছে। এখানে আমি নেতিবাচক সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছি। কারণ, এ সমাজ সততা ও প্রতিবাদ সহ্য করতে পারে না।। অবশ্য সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমিও সমাজ পরিবর্তনের দ্বারা প্রভাবিত। আর তাই বলতে পারো এইভাবে লিখেছি। প্রশ্ন :বাংলা কবিতায় সাবলীলভাবে ‘হারামজাদা, পাদ দে, মুতে দেই ও ভাত দে’র মতো প্রাত্যহিক বাংলা ভাষা আপনার হাত ধরে কবিতায় প্রবেশ করেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন? রফিক আজাদ : এই শব্দগুলো হলো বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। নির্দিষ্ট করে কবিতার কোনো ভাষা নেই। যেকোনো শব্দই কবিতায় ব্যবহারযোগ্য। কারণ হলো, সমাজের সুশীল ভাষা পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করলেই যে কবিতা হবে, তা নয়। বরং অচ্ছুত শব্দ—যা উচ্চবিত্ত এড়িয়ে যাচ্ছে, তা ব্যবহার করেও নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা যেতে পারে। সুশীলের রুচিতে আঘাত দেওয়ার প্রচেষ্টা। এর আগে যেমন কবিতার ভাষা বলে নজরুল-রবীন্দ্রযুগে মম, তব ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। এটাকে ভেঙে হলো আমার-তোমার। আর ষাটের দশকে এ শব্দগুলো এক ধরনের নিরীক্ষা বলা যায়। প্রশ্ন :ষাটের কবিরা ত্রিশের কবিদের কাব্যাদর্শ কিংবা ত্রিশোত্তর কাব্যভাবনাকে গ্রহণ করেনি। অনেক তরুণ জীবনানন্দকে না বুঝেই অতিরিক্ত পশ্চিমাঘেঁষা কবিতা লিখে যাচ্ছে, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করলে মনে হবে পুরোপুরি ইংরেজি কবিতা; এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা কী? রফিক আজাদ : হ্যাঁ, অবশ্য বর্তমান তরুণদের আধুনিক কবিতা বোঝাটা জটিল। তবে কবিতা বুঝতে পাঠককেও একটু প্রস্তুতি নিতে হবে। পাঠককে সচেতন ও পরিশীলত হতে হয়। অর্থাত্ কবিতার পাঠককে সহূদয়-হূদয়-সংবেদী হতে হয়। কিন্তু, ইচ্ছে করে দুর্বোধ্যতা আরোপ করার মানে নেই। যদি অবশ্যম্ভাবী আসে তবে, তা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে বাক্যের পারম্পর্য তো অবশ্যই রাখতে হবে। কারণ, কবিতায় পারম্পর্য না থাকার তো কোনো কারণ নেই। কবিতায় উল্লম্ফন থাকতে পারে, কিন্তু একেবারে পূর্বের সাথে পরের অর্থের মিল থাকবে না—এটা ঠিক নয়। তবে তা কেমন করে কবিতা হয়? প্রশ্ন :আপনি আপনার কবিতাকে একসময় ‘পদ্যপ্রবন্ধ’ বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। এ সুযোগে সমালোচকরা আপনার কবিতা নিয়ে সমালোচনা শুরু করে আপনাকে ‘পয়ারবন্ধ, রচয়িতা বলেন। বিষয়টিকে কাব্যহিংসা বলে কি ব্যাখা করা যায়? রফিক আজাদ : আমি বলেছি—কারণ আমার কবিতার মাঝে চিরকালই একটা থিম বা মেসেজ থাকে। এ কারণে তা কবিতা না হয়ে প্রবন্ধের বিষয় হতে পারত। সেই অর্থে—মানুষ যাতে কোনো কিছু জানতে পারে, তা নিয়েই আমি কবিতা লিখেছি। যেমন আমার কবিতায় আমি ‘সুতোর এপারে মানুষ আর ওপারের মানুষ’-এর মাঝে তফাত বুঝিয়েছি। কারণ, মানুষ এপারের সুতার নির্দিষ্ট পরিমাণ সীমা অতিক্রম করলে মৃত্যুবরণ করে। অর্থাত্ ইহকাল ত্যাগ করে পরকালে চলে যায়। বা বলতে পারো স্বাভাবিক মানুষ এক সুতো বেশি অতিক্রম করলেই অস্বাভাবিক বা পাগল হয়ে যায়। এটা একটা বিশাল থিম বলা যায়। আর কাব্যহিংসা তো চিরকালই আছে কবিতায়, আর আজীবন তা থাকবেও। প্রশ্ন :চিত্রকল্পপ্রধান না বক্তব্যপ্রধান কবিতার ক্ষেত্রে আপনার আকর্ষণ? রফিক আজাদ : আমার কবিতায় অনেক চিত্রকল্প রয়েছে। বর্তমানে লেখা আমার কবিতাকে চিত্রকল্পপ্রধান বলা যায়। আবার আমি একটা বড় সময়ব্যাপী বক্তব্যপ্রধান কবিতা লিখেছি। সেটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। কারণ, অনেক কবিতা পড়তাম সমসাময়িককালে, যেগুলোতে কোনো বক্তব্য নাই। কবিদের বলার কিছু নেই। কেবল নেশার ঘোরে শব্দ সাজিয়ে যাচ্ছে। কিছু উদ্দেশ্য তো থাকতেই হবে। একটা স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে। যার ওপর ভর করে কবিতাটি দাঁড়িয়ে থাকে। হাওয়ার ওপর কবিতাটা ছেড়ে দেওয়া যায় না—এটা আমার বিশ্বাস। প্রশ্ন :একবার একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের অভাবে আপনি নিজের জন্য চুমুর বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, বিষয়টি কি সত্য? রফিক আজাদ : হ্যাঁ, আমি যখন বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতাম, তখন বিচিত্রা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি শাহাদাত্ চৌধুরী। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আসলে আমাদের কিছু সৃষ্টিশীল বিজ্ঞাপন তৈরি করার দরকার। আমি বললাম, তাহলে আমি চুমুর বিজ্ঞাপন দেই। ‘একটি চুমুর বিনিময়ে একটি কবিতা উত্সর্গ হবে’। আসলে এর মাধ্যমে আমি দেখতে চাইছিলাম সমাজে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আসলে চুমু মানে যে ঠোঁটে চুমু, আমি কিন্তু তা বুঝাইনি। কিন্তু অধিকাংশ তা-ই বুঝল। মিরপুর থেকে এক মেয়ে লিখে পাঠাল—ইচ্ছে তো হয়, তবে লোকলজ্জার ভয়ে পারি না। আবার কেউ কেউ ইনভেলাপে করে কিছু অবাঞ্ছিত জিনিস পাঠায়। এর মাধ্যমে নাদিরা মজুমদার নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী আসে। তিনি বাংলা একাডেমিতে আমার অফিসে প্রবেশ করে বুঝতে পারেন—রফিক আজাদ কে? তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি রাজি’। আমি তখন বললাম, ‘দয়া করে আপনার হাত বাড়িয়ে দেন, আমি আপনার হাতে চুমু খাই’। তারপর আমি নাদিরার হাতে চুমু খেলাম। আর কয়েকদিনের মধ্যে নাদিরা আমার ভালো বন্ধুতে পরিণত হলো। বর্তমানে ও ইউরোপে থাকে। এখনও ফোনে আমার খোঁজখবর নেয়। প্রশ্ন :বোদ্ধারা বলেন, একজন কবির জীবনে প্রেমের ভূমিকা অনস্বীকার্য—আপনি কী বলেন? রফিক আজাদ : ভেতরে ভেতরে প্রেম অনেক কাজ করে। প্রেম না থাকলে মানুষ কবিতা লিখতে যাবে কেন? মানব-মানবীর সম্পর্ক কবিতায় অনেকটা অনুপ্রেরণার কাজও করে। প্রেমটা কবিতাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। কবি এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারে। প্রশ্ন :ভাই, একটু যোগ করতে চাই—তবে বিরহের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে কী হতে পারে? রফিক আজাদ : প্রেমের সাথে সাথে বিরহেরও ভূমিকা আছে কবিতায়। কারণ, মিলন আর বিরহ—এ দুটো মিলেই সম্পূর্ণ প্রেম হয়। মিলনের সুখ ও বিরহের দুঃখগুলো প্রেম বা এই দুইয়ের যোগফলই প্রেম। প্রশ্ন :আপনার জীবনে কখন-কীভাবে প্রেম এসেছে? রফিক আজাদ : এক তো আমার সহধর্মিণী প্রেমেরই ফলশ্রুতি। এক সময় তো ও আমার কবিতার অনুপ্রেরণা ছিল দীর্ঘদিন। এখনও কোনো প্রেমের অনুষঙ্গ আসলে, তার মুখটাই ভেসে আসে স্বাভাবিকভাবে। লেখালেখির ক্ষেত্রে বা সব ক্ষেত্রেই সবসময় আমার সহধর্মিণীর এই প্রেম কাজে দেয়। মানে তোমাদের ক্ষেত্রে না—আমার ক্ষেত্রে। হা হা হা...। প্রশ্ন :একজন কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা কতটুকু? রফিক আজাদ : কবির তো অবশ্যই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। দায়বদ্ধতা থেকেই সামাজিক প্রতিবাদগুলো উঠে আসে। অন্যায় অবিচার নানারকমের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কবিরাই প্রথম দাঁড়ায়। যেমন সংখ্যলঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা ‘আমাদের সময়’ আয়োজিত কবিতা পাঠ করেছি কদিন আগেই। আর এছাড়াও প্রেসক্লাবে ‘ঘাসফুল’ আয়োজিত কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করি। তাই কবিরাই প্রথম ক্রাইসিসের সময় এগিয়ে আসে। আর তাই দায়বদ্ধতা থেকেই লেখালেখিটা শুরু হয়। সমাজের প্রহরী হলো কবিরা। আসলে কবিরা সমাজের মূল্যবোধকে পাহারা দেয়। প্রশ্ন :কবিতাকেন্দ্রিক স্মরণীয় মুহূর্তের স্মৃতি বলুন? রফিক আজাদ : আমি যখন আমেরিকায় যাই, আমেরিকায় আমার সম্মানে সমসাময়িক কবিরা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেটা আমার জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে কবিতা নিয়ে স্মৃতিমূলক ঘটনা—যখন প্রায়শই দেখি যুবক-যুবতীদের কেউ কেউ বলে, ‘আপনার কবিতা দিয়ে আমরা প্রেম করেছি।’ তারা যখন এসব বলে—সেই মুহূর্তটা যে কত আনন্দের! আমার পুত্রকে যখন আমি তার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে বলি, তখন সে বলে, ‘আমি তো সেই বাবার কবিতার মতো বোধের অংশীদার হওয়ার মতো কোনো মানবী পাচ্ছি না। বলেন—কে আমার দীর্ঘ পথে সাহস জোগাবে? এরকম না মিললে তো বিপদ।’ তখন আনন্দ চেপে রাখতে পারি না। প্রশ্ন :বোধের অংশীদার বলতে সম্পূর্ণ অর্থে কী বুঝিয়েছেন? রফিক আজাদ : আমার যে শিল্পবোধ বা জীবনবোধ, দুঃখ ও বেদনাবোধ—এসবের অংশীদার না হলে, সে কী করে আমার সহধর্মিণী হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা বা অনুভূতি যদি ভাগাভাগি না করা যায়, তবে কীভাবে এক সাথে থাকা যায়? প্রশ্ন :কবিতার জন্য মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কেমন লাগে? রফিক আজাদ : আমার এরকম প্রায়ই হয়। হয়তো ধরো কবিতা মাথার মধ্যে ছিল। হঠাত্ করে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, কারণ কবিতাটা তখনও মাথা থেকে নামাতে পারিনি খাতায়। আর হয়তো এ না-পারার কারণেই ঘুমটা ভাঙে। তখন সাথে সাথে লিখতে বসি। একটা কবিতা পরিপূর্ণ হলে তখন যে আনন্দ হয়, তার কোনো তুলনা নাই। প্রশ্ন :আপনি ও আপনার সহধর্মিণী দুজনেই প্রতিষ্ঠিত কবি। বলা যায়, বাংলাদেশে আপনি দ্বিতীয় সৌভাগ্যবান কবি। রফিক আজাদ : আসলে সত্য বলতে কি, আমি নিজেও ভাবিনি আমার এ অতিরিক্ত সুবিধাটা আছে। তবে বলা যায় বাংলাদেশে আনোয়ারা সৈয়দ হক আপাকেও তুমি বলতে পারো। কারণ, তিনিও লেখেন। আর সৈয়দ হককে পুরোপুরি সহযোগিতা করেন। তবে আমার মতো কবি গিন্নি সৈয়দ হক ভাইয়ের নেই। সে দিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। এখন আসলে আমাদের দুজনের আর এক সাথে কবিতা পড়া হয় না। অবসর কম। সংসারের দায়দায়িত্ব বেড়েছে। আর তাই আমার গিন্নিকে রাতেই লিখতে দেখি। প্রশ্ন :বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা কবি বলা যায় আপনাকে? রফিক আজাদ : অনেকেই করেছেন এ মুক্তিযুদ্ধ। তবে কলম ফেলে রণাঙ্গনে যাওয়া কবি আমি রফিক আজাদ। আসলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া মানে তো জীবন দিতেই যাওয়া। যেখানে ফিরে আসাটা বাড়তি পাওয়া। প্রশ্ন :আপনাকে লিটলম্যাগের প্রবর্তক বলেন অনেকে। কেন, বিষয়টা কি একটু ব্যখ্যা করবেন? রফিক আজাদ : আসলে আমারই প্রথম উদ্যোগে ‘স্বাক্ষর’ নামের একটা লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয়। আমাদের কাগজে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্পাদক নির্বাচন হতো। এক সংখ্যায় আমি ও মান্নান সৈয়দ থাকলে আর এক সংখ্যায় অন্য দুজন কবি থাকত। মূলত কাজ আমিই করতাম। কিন্তু সম্পাদনায় নাম ব্যবহার করতাম দুজন। আমাদের মধ্যে এই বোঝাপড়াটা আমাদের ছিল। প্রশ্ন :জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আপনি। কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠালগ্নের স্মৃতিময় কোনো ঘটনা আছে কি? রফিক আজাদ : ১৯৮৭ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করতে গিয়ে কবিতা পরিষোদের সৃষ্টি। কারণ, এরশাদ কবিদের মাঝে একটা বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর কতিপয় অনুগতদের নিয়ে কবিকণ্ঠ নামের একটা সংগঠন সৃষ্টি করেন। তাঁর বিপরীতে শামসুর রাহমানকে প্রধান করে আমরা জাতীয় কবিতা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করি। যাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ফয়েজ আহমেদ। শিল্পী কামরুল হাসান ভাইও আমাদের সাথে ছিলেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আমরা কবিরা সবাই মিলে ফেব্রুয়ারি ১ ও ২ তারিখ কবিতা পাঠের আয়োজন করি। প্রশ্ন :একটু যোগ করি, তখন তো রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন... রফিক আজাদ : রুদ্রকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। ও আমাদের কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিল। রুদ্র একজন নিরেট কবি। যার বেশকিছু কবিতা আছে ভালো লাগার মতো। আমি তার সাথে কত যে আড্ডা দিয়েছি, তার হিসাব নেই। আমাদের সর্ম্পক ছিল ছোট ভাই বড় ভাইয়ের মতো। প্রশ্ন :আমরা বর্তমানে আপনার মাঝে আড়ালে থাকার প্রবণতা লক্ষ করছি—ব্যাপারটা খুলে বলবেন কি? রফিক আজাদ : হ্যাঁ, বিশেষ করে ইদানীং আমি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, টিভি চ্যানেলগুলোকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি। আমার ভেতর থেকেই কেন জানি প্রচার-প্রচারণা আসে না। আত্মপ্রচারে আমার আগ্রহ কম। আমি কাজ করতে পারলে বাংলা সাহিত্য নিশ্চয়ই আমাকে মনে রাখবে। তখন আমার সাহিত্যকর্মের প্রচার তো হবেই। ঢাকঢোল পিটিয়ে কবিতা হয় না। সবসময় শিল্প-সাহিত্য নিভৃতে থেকে চর্চা দাবি করে। কারণ, কবিতাকে রূপ দিতে গেলে নিভৃতিটা বর্তমানে খুব প্রয়োজন। প্রশ্ন :ষাটের দশকে আবুল হাসান কাব্যভাষার রূপ ও প্রকরণ, সিকদার আমিনুল হক মৃত্যুচিন্তা ও ফরাসি অ্যবস্ট্রাক্টিজম, মহাদেব সাহা—প্রেম, বিরহ ও বেদনা, আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তবতা, আসাদ চৌধুরী লোকজ সংস্কৃতি ও রাখালের বাঁশি হাতে, আর হেলাল হাফিজ সহজ সাবলীল কাব্যভাষায় প্রেমের উপস্থাপন ও বক্তব্যপ্রধান কবিতা লিখেছেন। ষাটের দশক এত সহজে কবিতার সফলতা কেন পেলো বলে মনে করেন? রফিক আজাদ : কেন জানি ষাটের দশকে কবিতার একটা জোয়ার এসেছিল। আমার মনে হয়, এক্সপ্রেশনটা এ কারণে—কবিতা নানা অনুষঙ্গে কথা বলে। আর নানা অনুষঙ্গে আসল ব্যাপারটা আড়ালে রেখে শুধু চিত্রকল্প ও উপমা অলঙ্কার দিয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কবিতা মূলত স্বাধীনভাবে প্রতিবাদ করার মাঠ তৈরি করে দেয়। যে ভাষা শাসকরা কখনো বুঝত না। যাতে করে কবিতা জনসাধরণের ভাবের বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন :১৯৫২, ’৬৯, ’৭১ ও ’৭৫ আপনাদের কবিতার খোরাক জুগিয়েছে বললে কি ভুল হবে? রফিক আজাদ : না, তুমি ঠিক বলেছ। কারণ, পঁচাত্তরের যে ট্রাজেডি, তা স্বল্পসময়ে এ জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে এতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও ছিল বলা যায়। তারা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এই কাজ বাস্তবায়ন করে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তারা এ কাজ করেছে—আমরা তা সফল হতে দিইনি। এটুক আমাদের অবশ্যই অবদান। জনগণ কিন্তু কোনোভাবে এ ধরনের প্রতারণা মেনে নেয়নি। কবিদের কারণে জনগণ সবসময় সচেতন ছিল। প্রশ্ন :বর্তমানে বাংলা কবিতার রাজধানী ঢাকা না কলকাতা? রফিক আজাদ : আমি তো গর্ব করে বলি, বাংলা কবিতার রাজধানী ঢাকা। এটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও বলে গেছেন। এটা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, কলকাতাকেন্দ্রিক যে কাব্যচর্চার প্রাধান্য ছিল, বর্তমানে ঢাকা তা দখল করে নিয়েছে। যে ভাষায় লেখলেখি হয়, সে ভাষার যদি মর্যাদা না থাকে মানে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়; তবে আর সে ভাষার অগ্রগতি হয় না। তার চর্চাও কমে যায়। কলকাতায় যারা বিখ্যাত সাহিত্যিক, দেখা গেছে তাদের বাচ্চা-কাচ্চা কেউ বাংলা ভাষা জানে না। তার পড়াশোনা করেছে ইংরেজিতে, কথা বলে হিন্দিতে। ওই হিন্দি আর ইংরেজি তাদের অবলম্বন। এই হিন্দি আর ইংরেজি বাংলা ভাষাকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেখা যাবে—ওই পশ্চিমবঙ্গের ভাষা একদিন হিন্দি হয়ে গেছে। প্রশ্ন :বর্তমানে হিন্দি বা ইংরেজি কার্টুন দেখে শিশু-কিশোররা হিন্দিতে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব আমাদের বড়দের আচার-আচরণে লক্ষ করার মতো। আপনি কি এ ধরনের আকাশ-সংস্কৃতিকে বাংলা সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন? রফিক আজাদ : একটু তো ক্ষতি করছেই, আর তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। অবশ্য এ ব্যাপারে সচেতন আছে আমাদের কেউ কেউ। তবে এসব দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির মতো সংস্কৃতিকে গ্রাস করা যাবে না। একটা ব্যাপার কি—এসব আইন করে বন্ধ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা তৈরি করা। আমি অবশ্য আশাবাদী এ কারণে যে—আমাদের ফেব্রুয়ারি মাস আছে। আর তখন এসব অপসংস্কৃতির ধারক-বাহকরা গুহায় লুকিয়ে পড়ে। আমাদের ’৫২ আমাদের ভাষার পাহারাদার। প্রশ্ন :আমাকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। রফিক আজাদ :তরুণ বা অনুজরা যদি অগ্রজদের কাছে না আসতে পারে, তবে অগ্রজ হবো কী করে। তুমি আবার এসো। তোমাকেও ধন্যবাদ আমার সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্য।