আগামী ১৫ মার্চ কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মরমী বাউল সাধক লালন সাঁই-এর বার্ষিক দোলপূর্ণিমা উত্সব। এ উপলক্ষে লালনকে স্মরণ করে
লেখাটি পত্রস্থ করা হলো।
হাওয়ার সাধনায় নারীর অবদান অপরিহার্য। সাধিকা ছাড়া সাধকের সাধনা পূর্ণ হয় না—ঘরে বাইরে একই মন/ তবে হবে গুরুর দরশন। সেবাবাদীরা সর্বদা চেতন থাকেন বলেই সাধু সাধনপথে নির্বিঘ্নে চলতে পারেন। তাঁরা তাই চেতনগুরু।
‘কোথা আছেরে সেই দিন দরদি সাঁই
চেতনগুরুর সঙ্গ লয়ে খবর কর ভাই \’
যুগল সাধনায় মনোদৈহিক কলাকৌশল এবং রতির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীক্ষাকালে গুরু শিষ্যকে গুরুমন্ত্রের সাথে সাথে কিভাবে রতিযোগসাধন করে রতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বা দেহের ভিতরে পুনঃ শোধন করা যায় তা শিখিয়ে দেন। রতিসাধনের গুপ্ত কলাকৌশলাদি পরবর্তীতে গুরুশিষ্য পরম্পরায় প্রবাহিত হতে থাকে। বিশেষ গোপনীয়তা এবং গুরুশিষ্য পরম্পরা বিষয়টি থাকার ফলে লালনসূরি ছাড়া অন্যরা কেউ এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানতে পারেন না। নানা অঞ্চলের বাউল ফকিরদের সাথে দীর্ঘদিনের ফকিরি অভিজ্ঞতায় এবং লালনের জীবনাচার ও দর্শনের বিষয়ে গবেষণাপত্র পুস্তক পর্যালোচনায় রতির ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বহুমাত্রিক তথ্য পাওয়া যায়। যেহেতু রতিযোগসাধনা বাউলদের অমূল্য গোপনীয় সম্পদ, তাই এ বিষয়ে বর্ণনার সময় প্রত্যেকেই সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন। ফলশ্রুতিতে বর্ণনার বিস্তারে না গিয়ে আকার ইঙ্গিতেই বেশিরভাগ কথাবার্তা বলা হয়ে থাকে। এতদসত্ত্বেও দেহকেন্দ্রিক সাধনমার্গের বিষয়বস্তু কিংবা নিয়মকানুন এবং শারীরবৃত্তীয় ব্যবহারিক কলাকৌশলের বর্ণনা করতে গিয়ে যার বক্তব্য অনেকখানি স্বস্তি জোগায়, তিনি হলেন প্রখ্যাত বাউল গবেষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন। ড. আনোয়ারুল করিম রচিত ‘বাউল সাহিত্য ও বাউল গান’ নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে আশীর্বাণীর ভনিতায় তিনি ভূমিকা লিখেছিলেন—‘গবেষণার ক্ষেত্রে ভাবাবেগের কোনো দাম নেই। গবেষকের কাজ হলো সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা। কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে জৈন, কে শিয়া, কে সুন্নী—এসব বিষয় নিয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। বাউল সাধনা বেদবিরোধী সাধনা। হিন্দু সাধনায় এ সাধনা প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে। পরে মুসলমান সাধনাও এর সাথে যোগ দিয়েছে। বাউলসাধনা তান্ত্রিকসাধনা উদ্ধুত। কাজেই এর মধ্যে যৌন প্রাধান্য থাকা আশ্চর্য নয়। এবং কিছু কিছু ন্যাক্করজনক উক্তি ও ইঙ্গিত এখানে সম্ভব’।
লোকধর্ম মানবিক কামনাকে অস্বীকার করে না; বরং নারী পুরুষের মিলনের মাঝেই আছে সাধুদের সাধনভজনের বড় একটা অংশ। অনেকের মতে, শুক্র আত্মার অংশ যার মধ্যে জ্ঞান বিদ্যমান থাকে। সেকারণেই সাধকেরা শুক্রসাধন করে থাকেন। শুক্রযোগে জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার ওপর লালন গবেষক ম. মনিরুজ্জামানের ‘লালন সাধনতত্ত্বের একটি ধারা : জন্ম নিয়ন্ত্রণ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল কোলকাতায় অনুষ্ঠিত লালনমেলার স্মারকগ্রন্থ ‘সোনার মানুষ’-এ। নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘লালনপন্থীদের সন্তান না হওয়ার কারণ হিসেবে একজন লালন গবেষকের অনুমাণ—তাঁদের মধ্যে প্রচলিত আছে আজল প্রথা। লালনগানে এমন তথ্য দুস্প্রাপ্য বটে। সে যা-ই হোক, একান্ত লালন অনুসারীদের কেউ কেউ অন্যকথা বলেন। তাদের মতামতে আজল প্রক্রিয়াটি সার্বিক রতিযোগ পদ্ধতির অংশবিশেষ মাত্র; বরং এটি সাধু এবং সেবাদাসীর পারস্পরিক মনোদৈহিক সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। আজল বিষয়ে কুষ্টিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান মন্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। রতি নিয়ন্ত্রণ এবং রসরতি ব্যবহারের সূক্ষ কলাকৌশল নিয়ে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আজলের সত্যতা স্বীকার করেন। আজলের ব্যাখ্যার সাথে অটোমেটিকেলি যোগ-মহাযোগের বিষয় চলে আসে। তাঁর বর্ণনায় নারীর ঋতুকালের মধ্যেই যোগ-মহাযোগ নিহিত থাকে। রজঃস্রাবের রংয়ের তারতম্য আছে। সাধু কালারের ভেরিয়েশন বুঝে ত্রিবেনীতে অপেক্ষা করেন। বাউলের ভাষায় এই জোয়ারের চার কালার—লাল, জরদ, সিয়া, সফেদ। একেক দিনে একেক কালার। প্রেমজোয়ারে দেহ পূর্ণ হলে সফেদ জোয়ার আসে। ওই প্রবাহটাই আসল—ফাঁদ পেতে ধরতে হয়। আব্দুর রহমানের কথায়—সাধু জোয়ারের ধারা বুঝে বাঁধাল দেন। আশ্চর্যবোধক মুখে তিনি একনাগারে বলে যান—‘শুকনা মোহনায় তো বাধাল দিলে হবে না! খোলাসা করে বোঝাবার জন্য তিনি মানানসই লালনপদের অবতারণা করেন’—
‘অমাবস্যা পূর্ণিমা হয়/ মহাযোগ সেই দিনে উদয়/ লালন বলে তাহার সময়/ দন্ডও রয়না।’
পদ পড়া শেষ করে আব্দুর রহমান আগের মতো ব্যাখ্যায় নেমে আসেন—সাগরে মৈথুন করলে যেমন জোয়ার আসে তেমনি দেহকে
মৈথুন করে জোয়ার আনতে হবে। সেই জোয়ারে সাধু অবতরণ করে পরমবস্তুর সন্ধান করবেন।
বাউল-ফকিররা মনে করেন নারীর ঋতুকালে যেমন আছে মহাযোগের সম্ভাবনা তেমন ঋতুপরবর্তী বিশেষ সময়েই আগমন ঘটে ‘মনের মানুষের’। রসিকজন মাত্রেই দিন গুণে অপেক্ষা করতে হয় মনের মানুষের জন্য—‘রসিক যারা চতুর তারা/ আছে হাওয়ার ফাঁদ পাতিয়ে।’
ঋতুকাল গণনার ক্ষেত্রে মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে বটে। তবে লালনপদাবলীতে কিভাবে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার যোগে মহাযোগ হয় সে বিষয়ে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়—
‘মাসে মাসে চন্দ্রের উদয়/ অমাবস্যা মাস অন্তে হয়/ সূর্যের অমাবস্যা নির্ণয়/ জানতে হয় নেহাজ করে।’
এরকম ইশারাপূর্ণ বেশকিছু লালনগান আছে যেসব গানের মর্মকথা এবং করণকর্ম সাধুুরাই কেবল পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। যেমন—‘মাস অন্তে ফোটে সে ফুল/ কোথা গাছ কোথারে মূল/ জানিলে তাহার ‘উল’/ ঘোর যায় ছুটি।’
বাউলরা মনে করেন, লালনের ত্রিবেনীতত্ত্বের গানগুলো ক্রমাগত জানতে বুঝতে গেলে সাধনাকে অনেকটাই কামলোভি মার্গ বলে ভুল ধারণা হতে পারে বটে। কিন্তু দেহকেন্দ্রিকসাধনা আসলে রতির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কলাকৌশল মাত্র। এর অর্থ এই নয় যে, বাউলরা ভোগী কিংবা নারীকামি; বরং মূল সাধনার দৃষ্টিভঙ্গি এর ভিন্নরূপ। মূল সাধনা হলো রতির যথেচ্ছা ব্যবহার নয়; বরং রতিকে কন্ট্রোল করা। সাধু হতে গেলে কামভাবের লাগাম টেনে ধরে কামযোগে নিষ্কাম ভজনা করতে হয়—
‘জ্যান্তে মরার প্রেম সাধন কি পারবি তোরা/ যে প্রেমেতে কিশোর কিশোরি হয়েছে হারা।
আদত বাউলরা সেকারণে স্ত্রীরাচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। স্ত্রী সম্ভোগের সংখ্যাবার নিয়ে আমি যেকথা বহু বাউলের কাছে বার বার শুনেছি তা হলো—মাসে এক, বছরে বারো, তারও চেয়ে যত কমে পারো। বাউলসাধনায় রতি অতি মূল্যবান সম্পদ। যথেচ্ছা রতিমিলনকে তাই নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। আসলে বাউল ফকিরদের দ্বারা সর্বাধিক সমর্থিত এবং নির্ভরযোগ্য রতিনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াটি হলো—দেহজ কামপ্রবৃত্তি দমন করে শুদ্ধপথে দেহকেন্দ্রিক সাধনার মাধ্যমে দয়াময়ের প্রেমে মগ্ন হওয়া। ফকিরি ভাষায় যাকে বলে ‘হাওয়ার সাধনা’। শ্বাস-প্রশ্বাস তথা দমের সাথে কামনা বাসনার যোগ আছে এবং এই হাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেই কামশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অধিকন্তু সংজ্ঞার দিক থেকে তাঁরাই বাউল যারা শ্বাস-প্রশ্বাস তথা বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘজীবন লাভের চেষ্টা করেন। আখড়ার বয়সী বাউল চিরকুমার মন্টুশাহ্ মনে করেন—আগে কামের ঘরে কপাট মারতে হবে। জীবনীশক্তিকে দেহের মধ্যে শোধন করা সম্ভব এবং সেটা শীতল হয়ে যাবে। বিশ্বাসের মাধ্যমে গুরুই তাঁর শিষ্যকে এটা দান করেন—
‘আগে কপাট মারো কামের ঘরে/ মানুষ ঝলক দেবে রূপ নিহারে।’
হাওয়ার ঘরে দম পাকড়াও করার বিষয়ে বৃদ্ধফকির দুর্লভশাহের মন্তব্যটা অন্যরকম। তাঁর ভাষায়—‘এই যে দুইটা নাকে দুইটা হাওয়া বইছে; একটায় আল্লাহ অন্যটায় ইল্লাল লাহ্-এর ওপর কেউ নজর দেয়নি। এই নিঃশ্বাস ধরে রাখতে হবে। আগুন থামাতে হবে। কাম জাগালেই জাগে, না জাগালে জাগে না। মনের সাথে লড়াই করতে হবে। সামান্য একটা চাতক পাখি এত দাবি করতাছে, দিদার করছে। মেঘের জল ছাড়া কিচ্ছু খায় না। আমি কী মানুষ হলাম বাপ, দিদার করতে পারলাম না। দুর্লভ শেষের দিকে নিজের কথা ভেবে হাহাকার করতে থাকেন। তারপর দমাসাধনের ব্যাখ্যা শুরু করেন—নিঃশ্বাস টেনে তুলে রাখতে হবে। রতিকে কন্ট্রোল করতে হবে—এইটাই শক্তি। শক্তিকে বের করে দিলে জ্ঞান বাড়াইয়া যায়। আল্লায় যখন কবে তুমি ভার নিয়া কী করছ, কী নিয়া আইছ? আল্লার কাছে তো বলতে পারব যে, নিয়ামত খিয়ানত করিনি’। দুর্লভের কাছে আপাতত এই হলো—আত্মসান্ত্বনা।
দমসাধন অত্যন্ত মনোযোগী ধরণের মনোদৈহিক জটিল প্রক্রিয়া। ফকিরি মতে মানবদেহে ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্না—ইত্যাদি নামে ছয়টি চক্র আছে। সর্বনিম্ন চক্রটি হলো মূলাধার বা ত্রিবেনীর মিলনস্থল। মূলাধারের কুণ্ডলিনীশক্তিকে বায়ুর ক্রিয়া এবং কৌশল দ্বারা জাগিয়ে সুষুম্না দিয়ে প্রবাহিত করতে হবে। তারপর দ্বিতলপদ্মে উঠিয়ে বিন্দুরূপে সাধনতত্ত্বের সাথে মেলাতে পারলেই পাওয়া যাবে সহজানন্দ।
হাওয়ার সাধনার পাশাপাশি বাউলদের মধ্যে চারিচন্দ্র বা পঞ্চরসের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বেশকিছু বাউলগানে চন্দ্র কিংবা চারিচন্দ্রের উল্লেখ যেমন পাওয়া যায় তেমনি চারিচন্দ্রের ব্যাখ্যাও আছে কোনো কোনো গানে। ‘প্রথমে চাঁদ উদয় দক্ষিণে/ শুক্লপক্ষে আসে নেমে বামে/ আবার দেখ কৃষ্ণপক্ষে কিরূপে যায় দক্ষিণে \’
মুসলিম বাউলেরা চারিচন্দ্রকে চার পেয়ালা মনে করেন। স্বল্প সমর্থিতভাবে আরও এক পেয়ালার কথাও জানা যায় বটে। (আনোয়ারুল করিম, বাংলাদেশের বাউল, সমাজ, সাহিত্য ও সঙ্গীত, বর্ণায়ন জানুয়ারি ২০০০, পৃষ্ঠা নং-২৯২-২৯৩)। অধ্যাপক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য চারিচন্দ্রকে মল, মূত্র, রজঃ এবং বীর্য বলে চিহ্নিত করেছেন। (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বাংলার বাউল ও বাউলগান পৃষ্ঠা. ৫৭, ৪২৪)
তাঁর মতামতে চারিচন্দ্রের ভেদ মানে দেহনিঃসৃত চারি বস্তুকে পুনরায় দেহে গ্রহণ করা। সাধারণ মানুষ এই চারচন্দ্রের ভেদমর্ম বুঝতে পারেন না। লালনের গানে অন্তত এ রকমই তথ্য মেলে—
‘সবাই কি তার মর্ম জানতে পায়/ জানে ভজন সাধন করে/ যে সাধন অটল হয়।’
চারচন্দ্রের ভেদাভেদ জেনে ব্যবহার করতে পারলে সাধন সহজ হয় এবং বীর্যকে ধারণ করে অটলপথ পেতে সুবিধা হয়। অটলত্ব হলে সে সাঁই হবে। এই চার প্রকার ধাতুর সমষ্টি অনেক অর্থের মূল। এর সমন্বিত ব্যবহার একদিকে যেমন শরীরকে নিরোগ রাখে, অন্যদিকে তেমনি সাধকের দৃষ্টিশক্তি প্রখর এবং প্রচ্ছন্ন রাখে। ফলে সাধক জ্ঞানলাভে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠেন।
(Anwarul karim, Folk Mediicine, Baul practice and their system of birth control. Folklore. Journal of Folklore research institute. Vol-4-5, 1979-80. page26-38(ed) Anwarul karim.)
শ্বাস-প্রশ্বাস তথা দমের সাথে কামনা-বাসনার যোগাযোগ আছে এবং হাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে কামশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—‘হাওয়া দমে দেখো তারে আসল বেনা/ কে বানাইলো এমন রং মহল খানা।’
দমসাধনে শারীরিক ক্রিয়া-কৌশল ছাড়াও কিছু কিছু মানুষিক কর্ম আছে। যেমন গুরুমন্ত্র জপ করা এবং গুরুর বর্জক ধারণ করা ইত্যাদি। ড. আহমেদ শরীফের রচিত ‘বাউল তত্ত্বে’ দবিরের বর্ণনার অনেকখানি বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়। মূলাধার থেকে শুক্রকে নাড়ির মাধ্যমে উর্ধ্বে উত্তোলন করে ললাট দেশে সঞ্চিত করে রাখলেই ইচ্ছাশক্তির পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব। অর্থাত্ ইচ্ছাশক্তি দ্বারা দেহ মন নিয়ন্ত্রণ করে সিদ্ধ সাধক ইড়া পিঙ্গলা সুষুুম্না নাড়িপথে শুক্রকে জোয়ারের মতো চালু রেখে সহজানন্দ উপভোগ করতে পারে। (আহমেদ শরীফ, বাউল তত্ত্ব, পড়ুয়া সংস্করণ, সেপ্টেম্বর ২০০৩ পৃ.-৪৬-৪৭)
তত্ত্বের লাইন ধরে এরকম যোগসাধনাকে আরও সহজভাবে বলা যেতে পারে। যেমন বহুবিধ নদনদী দেশজুড়ে থাকলেও নদী মূলত তিনটি—পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। দেহের মধ্যেও জালের মতো অসংখ্য নাড়িবিরাজ করলেও প্রধান নাড়ি তিনটি-ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। নাড়িকে নদী ভাবলে এই তিন নদী দিয়েই শুক্র, রজঃ কিংবা নীর-ক্ষীর-রক্ত প্রবাহমান। বায়ুচালিত দমসাধনের ফলে এসব প্রবাহ কব্জা করতে পারলেই দেহের ওপর সাধকের কর্তৃত্ব জন্মায়। আর এসবের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারলেই সাধুর সাধন পূর্ণ হয়।
হাওয়া-দমের কলাকৌশল সম্পর্কে লালন একাডেমির খাদেম ফকির নিজাম উদ্দিন জানান, সাধনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আগাতে আগাতেই দমের কাজ স্থির হবে—‘অধর চাঁদকে ধরবি যদি/ দম কষে দম সাধন কর।’
দম দিয়েই অধরাকে ধরা যাবে। যে যা-ই বলি না কেন বাউলসাধনায় গুহ্য এইসব বিষয়াদি সকলকেই কমবেশি ব্যাকুল করে তোলে।
সাধুরা গুরুপাক খাবার যেমন মাংস, ডিম ইত্যাদি পরিহার করেন। কেউ কেউ আবার তরকারিতে ঝাল পেঁয়াজ এমনকি রসুন পর্যন্ত খান না। তাঁরা মনে করেন যে, এসব আগ্নেয় খাবার খেলে দেহের ক্রিয়াকরণ বেড়ে যায়। ক্রিয়াকরণ বেড়ে গেলে রতিযোগ সাধনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং নিষ্কাম সাধনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যার কারণে উঁচু পর্যায়ের সাধকেরা নিরামিষভোজী হয়ে থাকেন। ভোগ-সম্ভোগ সবকিছু নয়, কামের লাগাম টেনে ধরে রিপুকে শাসন করলেই অমৃত প্রেম সাধন হয়—‘হাঁটতে মানা,আছে চরণ/ মুখ আছে তার, খাইতে বারণ/ ফকির লালন কয়, এ যে কঠিন করণ/ তা কি পারবি তোরা \’
এভাবে কামনদীতে চর জেগে জেগে প্রেমনদী বয়ে চলে। প্রেমনদীতে শুরু হয় প্রেমখেলা, দেখা মেলে সোনার মানুষের।
