বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

ইতিহাস ও তত্ত্ব

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৪, ১৭:৫৬
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ :ইতিহাস ও তত্ত্ব সম্পাদনা :ড. আবদুল ওয়াহাব প্রচ্ছদ :কাইয়ুম চৌধুরী প্রকাশক :মাওলা ব্রাদাস মূল্য :৭৫০ টাকা। ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : ইতিহাস ও তত্ত্ব’ একটি ব্যতিক্রমী ও অনন্য গ্রন্থ। গ্রন্থটি গবেষণা, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ড. আবদুল ওয়াহাব। মুখবন্ধ ও প্রসঙ্গ কথা বাদ দিলে গ্রন্থটি ভূমিকাসহ দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত। তবে বিবিধ এবং পরিশিষ্টের অংশগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যায়গুলোসহ অন্যান্য অংশের মোট লেখক সংখ্যা ৫৭। পর্যায়ক্রমে রাজনীতি—শেখ হাসিনাসহ ১৫ জন লিখেছেন, ইতিহাস—১৮ জন, যোগাযোগবিজ্ঞান—১ জন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, নৃতত্ত্ব ও জাতীয়তা—১ জন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, তুলনামূলক আলোচনা—১ জন জালাল ফিরোজ, ফোকলোর বা লোকজ উপাদান—১১ জন শামসুজ্জামান খান, সেলিনা হোসেন প্রমুখ, ভাষাবিজ্ঞান—২ জন, সামরিক—১ জন, সমাজতত্ত্ব—১ জন সম্পাদক নিজে আবদুল ওয়াহাব, অর্থনীতি—১ জন। ৭ মার্চের ভাষণ : প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য পর্যালোচনা লিখেছেন মামুন সিদ্দিকী। পরিশিষ্টে রয়েছে তিনটি অংশ। ক. স্বায়ত্তশাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা দাবিনামা জুন, ১৯৬৬। খ. স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, পল্টন ময়দান, ঢাকা, ৩ জুন ১৯৭১। গ. বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা ৭ মার্চ, ১৯৭১। গ্রন্থটি যে পুরোদস্তুর গবেষণাধর্মী তার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রন্থপঞ্জি ও নির্ঘণ্ট দেখে। শেখ হাসিনার ‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ : কিছু স্মৃতি’ রচনায় বিবৃত দালিলিক প্রমাণ থেকে শুরু করে তাঁর আগে-পরের অনেক লেখক-গবেষক-পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ ৭ মার্চের ভাষণকে বহুমাত্রিক অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যায় তুলে ধরেছেন। এভাবে গ্রন্থে ধৃত হয়েছে পরিশ্রমলব্ধ বিশ্লেষণ। ফলে প্রতিটি রচনার ভেতর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তর্গত ইতিহাস চেতনা, হাজার বছরের বাঙালি জাতির জীবন সংগ্রাম ও পার্থিব অভিযাত্রার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণে সামষ্টিক চিন্তা, দেশপ্রেম, সমাজের মঙ্গলচিন্তা এবং শ্রেণিচেতনাজাত দ্বান্দ্বিকতার সম্মিলিত ব্যাখ্যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বাঙালির মুক্তির মহাসনদ এ ভাষণ। এ ভাষণে রাজনৈতিক বিপ্লব আর শৈল্পিক অন্বেষা একীভূত। বাঙালি মাত্রেই এই ভাষণের ধ্বনি নিনাদে উত্তেজিত হয়ে ওঠে এখনো; সেই বাস্তবতা ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে উপস্থাপিত হতে পারে। আর এই আগ্রহ-উদ্দীপনা জাগানো ভাষণটির চিরায়ত হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত রয়েছে আলোচ্য গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে। তবে ৭ মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে শিল্প-সাহিত্য রচনার তথ্য এ গ্রন্থে অনুপস্থিত। সম্ভবত এই সম্পাদক গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে সেসব নিয়ে অধ্যায় সাজাবেন বলে মনে হয়। মূলত সাড়ে পাঁচ’শ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির সংকলনভুক্ত লেখাগুলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ওপর বহুকৌণিক আলোকপাত এবং সেগুলো আমাদের জাতির জনককে সম্যকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত হন। তিনি তাঁর আত্মজীবনী লেখার ডিকটেশন দেওয়ার সময় আবদুল গাফ্ফার চৗধুরীকে বলেছিলেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন থেকে ফজলুল হক, ফজলুল হক থেকে সুভাষচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র থেকে আবুল হাশিম-শরত্চন্দ্র (সুভাষ বসুর ভাই) এবং দেশভাগের পর ভাষা-আন্দোলন ও ছয়দফা পর্যন্ত যদি বাংলার রাজনীতির গতিধারা বিল্লেষণ করো, তাহলে দেখবে অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলার সুপ্ত চেতনার জন্ম সাতচল্লিশের বাংলাভাগের আগেই এবং সেই চেতনারই প্রথম বহিঃপ্রকাশ আটচল্লিশ সালেই অসাম্প্রদায়িক ভাষা-আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। আর ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবে ঐতিহাসিক কালানুক্রমিক ঘটনাধারা মনে রাখলে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। আলোচ্য গ্রন্থটি পাঠ করে আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাসের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ৭ মার্চের ভাষণের তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কারণ, পৃথিবীর কোথাও এরকম ভাষণ শোনা যায়নি। আর ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : ইতিহাস ও তত্ত্ব’ গ্রন্থটিও অভিনব। এজন্য সম্পাদক ড. আবদুল ওয়াহাব ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।