সত্যবাদি ব্যবসায়িগণ আল্লাহর বন্ধু
ইসলামী
অর্থনীতিতে অন্যান্য কার্যকারণ অপরিবর্তিত থাকলে বাজার চালিকাশক্তির তত্পরতার মাধ্যমে পণ্যমূল্য নির্ধারিত হয়। মহানবী (স.) মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের নিয়ন্ত্রণমূলক হস্তক্ষেপকে নিষিদ্ধ করেছেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি মজুদদারী, ফটকাবাজারি, গোষ্ঠীবিশেষ কর্তৃক বাজার নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের দোষত্রুটি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা এবং মিথ্যা শপথপূর্বক পণ্য বিক্রয় (বর্তমান যুগের বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচারকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা যায়) ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছেন। মহানবী (স.) এভাবেই মূল্য ব্যবস্থাপনার ওপর অর্থনৈতিক প্রভাবকে অকেজো করে দিয়েছিলেন। যুগপত্ভাবে তিনি ওয়াকেফহাল বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের দ্বারা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের শোষণের মূলোত্পাটন করেছেন। সমকালীন সমাজে এসব নির্দেশকে ব্যবসায়ী সংঘের জন্য স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আচারণবিধির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব নির্দেশের পাশাপাশি কতগুলো নৈতিক মূল্যবোধও কার্যকর রয়েছে। ব্যবসায়ীদেরকে সত্ ও সত্যবাদী হতে এবং পারস্পরিক লেনদেনে উদারতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একে অপরের ক্ষতি সাধনের মনোভাব পরিহার করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একটি সম্পূর্ণ মুক্তবাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি মহানবী (স.) ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি নির্ভরযোগ্য ও সুষম কাঠামোও প্রদান করেছেন। তামীম গোত্রের একজন প্রবীণ ব্যক্তি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি তাতে বলেন, অচিরেই মানবজাতি এমন একটি যুগে পৌঁছবে যখন মানুষ পরস্পরকে কামড়াবে। সম্পদশালীরা তাদের সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখবে, যদিও তাদেরকে সেই নির্দেশ দেয়া হয়নি। আল্লাহতায়ালা বলেন, “তোমরা নিজেদের মধ্যে অনুগ্রহ প্রদর্শনের কথা ভুলে যেও না” (সূরা আল-বাকারা ঃ ২৩৭)। লোকজন মারাত্মক অসুবিধায় পড়ে (তার সম্পদ) বিক্রয় করতে বাধ্য হবে। অথচ নবী (স.) অনন্যোপায় ব্যক্তির ক্রয়-বিক্রয়, প্রতারণাপূর্ণ ক্রয়-বিক্রয় এবং ফল পরিপুষ্ট হওয়ার পূর্বে ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন (আবু দাউদ, কিতাবুল বুয়ূ, বাব ২৫, নং ৩৩৮২)। আবু কাতাদা আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছেনঃ সাবধান! তোমরা বেচা-কেনায় অধিক শপথ করা থেকে বিরত থাকো। কেননা তা পণ্য বিক্রয়ে সহায়ক বটে কিন্তু পরে তার বরকত নষ্ট করে দেয় (মুসলিম, বুয়ূ, বাব ৪৮, নং ৪১২৬/১৩২)। কায়েস ইবনে আবু গারাযা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মদীনার বাজারসমূহে ক্রয়-বিক্রয় করতাম এবং নিজেদের নামকরণ করেছিলাম আস-সামাসির (দালাল)। লোকজনও আমাদেরকে ঐ নামেই অভিহিত করতো। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (স.) আমাদের নিকট এলেন এবং আমাদের এমন একটি নামে অভিহিত করলেন যা ছিল আমাদের নিজেদের দেয়া নামের চেয়ে উত্তম। তিনি বললেন, হে তুজ্জার (ব্যবসায়ী) সম্প্রদায়! তোমাদের ক্রয়-বিক্রয়কালে মিথ্যা শপথ ও অবাঞ্ছিত কথাবার্তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অতএব তোমরা দান-খয়রাতের মাধ্যমে তার পরিশুদ্ধি করো (নাসাঈ, কিতাবুল বুয়ূ, বাব ৭, নং-৪৪৬৮)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন কেয়ামাতের দিন আল্লাহ তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, এদের দিকে নযরও দেবেন না এবং এদেরকে পবিত্রও করবেন না, বরং এদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (১) যে ব্যক্তির নিকট মাঠে অতিরিক্ত পানি থাকা সত্ত্বেও তা পথিককে দেয় না। (২) যে ব্যবসায়ী আসরের পর তার পণ্যসামগ্রী ক্রেতার নিকট আল্লাহ্র শপথ করে বিক্রি করে আর বলে, আমি এ পণ্য এতো মূল্যে ক্রয় করেছি, আর ক্রেতা তাকে সত্যবাদী মনে করে, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তার উল্টো। (৩) যে ব্যক্তি ইমামের হাতে কেবল পার্থিব স্বার্থে আনুগত্যের শপথ করে, যদি ইমাম তাকে কিছু পার্থিব সুযোগ দেন, তাহলে সে তার আনুগত্যের শপথ পূর্ণ করে, আর যদি তা থেকে কিছু না দেন তাহলে তার শপথ পূরণ করে না (মুসলিম, ঈমান, বাব ৪৬, নং-২৯৭/১৭৩)। ২৫৬ (২৭)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (স.) বলেন, কোন শহরবাসী গ্রামবাসীর পক্ষ হয়ে বিক্রি করবে না। আর যুহাইর (রা.)-এর বর্ণনায় আছে নবী (স.) কোন শহরবাসীকে পল্লীবাসীর পক্ষে বিক্রি করতে নিষেধ করছেন (মুসলিম, বুয়ূ, বাব ৬, নং ৩৮২৪/১৮)। ২৫৮ (২৯)। ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেনঃ তোমাদের কেউ যেন অপরের ক্রয়-বিক্রয়ের কথাবার্তা চলাকালে নিজের ক্রয়-বিক্রয়ের কথাবার্তা না বলে (মুসলিম, বুয়ূ, বাব ৪, ৩৮১১/৭)। ২৫৪ (২৫)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন (আগেভাগে সস্তায় খরিদ করার উদ্দেশ্যে) অগ্রবর্তী হয়ে পথিমধ্যে পণ্যবাহী কাফেলার সাথে সাক্ষাত্ করা যাবে না। তোমাদের কেউ যেন অপরের ক্রয়-বিক্রয়ের দর কষাকষি করার সময় দর না করে। তোমরা দালালী করবে না। শহরবাসী যেন পল্লীর অধিবাসীর পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে দেয়ার জন্য চাপ না দেয়। উট ও বকরীর ওলানে দুধ জমিয়ে রাখা যাবে না (ক্রেতাকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে)। কেউ এমন ধরনের পশু খরিদ করলে তার জন্য (ক্রয়চুক্তি বাতিল করার) এখতিয়ার রয়েছে। দোহনের পর পছন্দ হলে ক্রয়চুক্তি বহাল রাখবে, আর অপছন্দ হলে এক সা’ খেজুরসহ তা ফেরত দেবে (মুসলিম, বুয়ূ, বাব ৫, নং ৩৮১৫/১১)। ২৫৫(২৬)।
লেখক :সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
