জানাজার নামাজ

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৪, ১৯:১৬
মহান আল্লাহ্ মানুষকে তিন অবস্থায় রাখেন— মাটির ওপরে, মাটির নিচে ও মায়ের পেটে ! কথাগুলো আমার শ্রদ্ধেয়া আম্মাজানের— ২২ মার্চ তার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী, ০১ মার্চ’০৭ শ্রদ্ধেয় আব্বাজানও আমাকে এতিম করে চলে গেলেন। আসলে জীবন নদীর খেয়ায় আমরা প্রতি নিয়ত মৃত্যুর আবাহণ করছি— আশ্চর্যজনক বিষয়, আমরা সবাই বেহেশতে যেতে চাই কিন্তু মরতে চাই না। আবার মহান আল্লাহ্র নির্দেশ “ওয়া লা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আন্তুম মুসলিমুন” অর্থাত্ ‘প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মরো না’। অথচ, মরণ আমাদের হাতে নয়; জীবন-মৃত্যুর মালিক মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন। মানুষের মৃত্যুর পর জীবিত মানুষদের সবশেষ করণীয় থাকে দ্রুত মৃতের জানাজা ও দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা এবং করাও হয় তা-ই। বহু বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বিল্ডিং মসজিদে ‘মেহরাবে’র কাছে একটি লেখা টানানো দেখে খানিকটা থমকে গিয়ে ছিলাম ! লেখাটি হুবহু স্মরণে নেই, আজো শুধু ভাবখানা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে— ‘আপনার লাশ সামনে রেখে অন্যের নামায পড়ার আগে আপনার নামায পড়ে নিন’। সেখানে বহুবার গিয়েছি, নামায শেষে তাকিয়ে থেকেছি; কখন যে চোখ ভিজে উঠেতা... এখন কি ঐ লেখাটি আছে ? জানি না, শুধু জানি আমার লাশ সামনে নিয়ে অন্যের নামায আদায়ের হয়তো বেশি সময় বাকী নেই! কবির ভাষায়— “ শত কাফনের শত কবরের অঙ্ক হূদয়ে আঁকি, গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারাদিন রাত জাগি। এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে, গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে... ...মসজিদ হইতে আযান হাকিছে বড় সকরুণ সুর, মোর জীবনের রোজ কেয়ামত ভাবিতেছি কত দূর...” (কবর: জসীম উদ্দীন)। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনের জলবতী ধারা নিরব অভিমানে হারিয়ে যায় মৃত্যুর অতলান্ত গভীর অন্ধকারে। আমাদের জন্মের আবাহণ ধ্বনিত হয়-ক্ষুধা, তৃষ্ণার বন্দনায় এবং যাপিত জীবনের যবনিকাপাত ঘটে সাদমাটা এক অজ্ঞাত ক্ষণে, না পাওয়ার শেষ দীর্ঘশ্বাসের মাধ্যমে। জীবন কতই না ক্ষণিকের, জানাজার নামায তা স্মরণ করিয়ে দেয় মাত্র। সব ফরজ নামাযের সূচনায় আযান-ইকামত হয়, জানাজার নামায ‘ফরজ’ আর আমাদের জানাজার নামাযের আযান-ইকামত হয়ে গেছে জন্মের সূচনায় কানে কানে— তাই তো ঐদিন চিত্কার করে কেঁদে উঠেছিলাম আমরা। হায়রে! এখন শুধু চার তাকবিরে জানাজা শেষের অপেক্ষায় ইমাম-মুসল্লিবৃন্দ। নেই কোন রুকু সিজদা তবুও ‘নামায’! আর দুনিয়ায় আমার নামায ঠিক ছিল কি না তার পরীক্ষা নেওয়া হবে পরকালে, কুরআনের ভাষায় “যখন তাদের বলা হবে রুকু করবার জন্য তখন তারা রুকু করতে পারবে না”! এটাই হবে পাপীদের অবস্থা.... কী হবে আমাদের অবস্থা? জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অথবা কন্যা, জায়া, জননী, ভগ্নি আর তার বিপরীতে একেকজনের যে দায়িত্ব তা কি যথাযথ ভাবে পালিত হয়েছে? জানাজার চার তাকবিরে চার বার বলা হয় ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থাত্ আল্লাহ্ মহান। এখন ভাববার বিষয় আমরা কি যাপিত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে মহান আল্লাহ্র হুকুম সমুন্নত রাখতে পেরেছি— জানাজার নামায কি একথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না? শেষ বিদায়ে কেউ কি কোনো দিন তিন বা পাঁচখন্ড সেলাই বিহীন সাদা কাপড়ের বেশি দুনিয়া থেকে নিয়ে যেতে পেরেছে? কথিত আছে আল কুরাআনে বর্ণিত জুল্কার্নাইন, ইতিহাস খ্যাত আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও বাদশাহ্ সিকান্দর না কি প্রকৃত অর্থে একই ব্যক্তি ছিলেন। যাঁর সম্পর্কে বলা হয়— ‘বাদশাহ্ ছিল সিকান্দর / চাঁদ সুরুজে দিত কর...’! ঐ সিকান্দর বাদশাহ্ও তো কাফনের কাপড়ের বাইরে তাঁর হাত বের করে রাখবার অন্তিম ইচ্ছার মধ্য দিয়ে জানিয়ে গেলেন ‘বিশ্বজোড়া রাজত্বের’ মালিক হয়েও আজ শেষ বিদায়ের কালে তিনি খালি হাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করছেন।