আসন্ন নির্বাচনের পর ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হবে বিরোধীদল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা বিজেপির কম। যে কারণে একটি জোট সরকারের নেতৃত্ব দিতে হবে তাদের। জোটে থাকার জন্য বিজেপি সরকারকে তখন ধর্মীয় ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে সহিষ্ণু নীতি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বিজেপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সেক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদীর মতো একজন রাজনীতিকের নেতৃত্বে বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে ভারত। শেষ পর্যন্ত সহিষ্ণু রাষ্ট্রের পরিচিতিও হারাতে পারে দেশটি। গতকাল বৃহস্পতিবার দ্য জাপান টাইমসের এক বিশ্লেষণে এমনটাই মন্তব্য করা হয়েছে। গুয়েনি ডায়েরের বিশ্লেষণে মূলত ভারতের রাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রবাদিতা ও তার সম্ভাব্য পরিণতির দিক উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণের শুরুতে বলা হয়, ভারতের নির্বাচন হলো ম্যারাথন, দ্রুতগতির দৌড় নয়। আগামী ৭ এপ্রিল শুরু হয়ে মোট ৯ ধাপে শেষ হবে ১২ মে। প্রায় সাড়ে ৮১ কোটি ভোটারের ঐ ভোট গণনা হবে ১৬ মে। অনেক ভারতীয় মনে করছেন, এ নির্বাচনের ফল তাদের জানা। বিরোধীদল বিজেপি’র প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীই হবেন প্রধানমন্ত্রী, দেশ চলবে ঠিক পথে। বিজেপি হলো সামাজিকভাবে রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একবারই এই দলটি পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলো। ঐ সময় একটি বৃহত্ জোটের সরকার হিসেবে বিজেপির কট্টর সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ছিলো না। মোদীর নেতৃত্বে এবারের বিজেপির ক্ষমতায় আসার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। যে কারণে নতুন কিছু হতে পারে। কারণ নিজ রাজ্যে লক্ষণীয় অর্থনৈতিক উন্নতি আর দুর্নীতিমুক্ত হওয়ায় মোদীর বড় পরিচিতি রয়েছে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অল্প কিছুদিন পর ২০০১ সালে গুজরাটে দাঙ্গায় ১০০০ হাজারের বেশি মুসলিমকে হত্যার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
গুজরাটের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অবশ্যই মোদীর জন্য বিশাল রাজনৈতিক পুঁজি। কিন্তু সমস্যা হলো তার সম্ভাব্য সমর্থকদের বিবেচনায় ধর্মীয় উগ্রবাদিতার অভিযোগও একটি বড় বিষয়। প্রকৃতপক্ষে মোদী দাঙ্গায় তার সংশ্লিষ্টতার জন্য কখনোই দুঃখ বা অনুতাপ প্রকাশ করেননি। এ ঘটনার কারণে অনেকেই তাকে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে তার অযোগ্য বলেও বিবেচনা করে। বিগত ১০ বছর ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। গত জানুয়ারিতে তিনি অবসরে যাওয়ার কথা জানান। ঐ সময় সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মনমোহন বলেন, নরেন্দ মোদীর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়া হবে দেশের জন্য বিপর্যয়কর। মোদী একজন শক্ত প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন বলে বিজেপি প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদের রাস্তায় নিরপরাধ মানুষের গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয়া যদি শক্তিশালী নেতার গুণাবলী হয়, সেই ধরনের শক্তিশালী নেতার প্রয়োজন ভারতের নেই।
তবে কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগ আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীর গতির কারণে অবস্থান নড়বড়ে কংগ্রেসের। দলটির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী রাহুল গান্ধী ছাড়া আর কেউ নন। যার বাবা, দাদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এখনো পূর্ণ মনে হয় না। যার বক্তব্য ক্ষমতায়নের মতো শব্দে বোঝাই আর মারাত্মকভাবে নতুনত্বের অভাব।
অন্যদিকে ‘মোদী ঢেউ’। জনমত জরিপগুলো বলছে, বিজেপির তুলনায় কংগ্রেস এখন অনেক পিছিয়ে। গত জানুয়ারির এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ৩৪ শতাংশ জনগণের সমর্থন রয়েছে বিজেপির প্রতি যা ২০০৯ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রত্যেক রাজ্যেই ভোটাররা প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে গান্ধীর চেয়ে মোদী এগিয়ে রেখেছেন।
এখন বিশেষজ্ঞরা হিসাব করছেন নানামুখী। বিশেষ করে, জোট ছাড়া মোদীর নেতৃত্বে কী ধরনের আচরণ করবে বিজেপি সরকার; এমন ভাবনা বেশি কাজ করছে। কারণ তাদের কাছে কোনো পূর্ব নজির নেই। শেষবার যখন বিজেপি সরকার গঠন করেছিলো তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ি। যিনি একাধারে একজন কবি ও সহিষ্ণু মতাদর্শের রাজনীতিক ছিলেন। যে কারণে তার মেয়াদে কেউ উগ্র জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। হিন্দুত্ববাদী অবস্থান শুধু নীতিতেই ছিলো। কিন্তু এবার ভিন্ন হলে ভারত এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। যে কারণে ভারতীয় সাংবাদিকরা মাঝে মাঝে তাদের সংবাদে একটু ভীতি ও উত্তেজনার ছটা দেয়ার চেষ্টা করেন।
তবে বাস্তবতা, সম্ভবত এর চেয়ে কম উত্তেজনাকরই। ৩৪ শতাংশ ভোট বিজেপির জন্য অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক ভালো। কিন্তু তারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। সব হিসাব-নিকাশ বলছে সংখ্যা গরিষ্ঠতা থেকে ৫০টির মতো আসন দূরে থাকতে পারে বিজেপি। যে কারণে তাদের জোট করতে হবে। ধর্মীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জোটের শরিকদের শর্ত অনুযায়ী কাজও করতে হবে। সেখানে বিজেপি নেতা মোদী হন বা অন্য কেউ।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া যে কোন রাজনৈতিক দলের জন্য অসম্ভব ব্যাপার। কারণ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব রাখে। আর এরা কেন্দ্রীয় দল থেকে আলাদা। এছাড়া ভারতের ১৩ শতাংশ মুসলিমের ভোট পাওয়া যাবে এমন চিন্তা করা বিজেপির জন্য প্রকৃতপক্ষেই কঠিন। বর্তমানে পার্লামেন্টে ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এবারের নির্বাচনের পর সে সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। যারা সরকারের সঙ্গে জোট করতে চাইবে। তবে সেক্ষেত্রে প্রত্যেক দলের স্বার্থ ও অঙ্গীকার অনুযায়ী জোটের কিছু রেড লাইনও থাকবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনের পর ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হবে বিজেপি। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোটের ঐ সব রেড লাইন মেনে মোদীকেও ধর্মীয় ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে সহিষ্ণু নীতি গ্রহণ করতে হবে। আর যদি তা না হয়, তখন ভারতকে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। যে কারণে শেষ পর্যন্ত দেশটি সহিষ্ণু রাষ্ট্রের পরিচিতিও হারাতে পারে।
