হত্যার ৩৫ দিন পর নলকূপ থেকে অবশেষে হতভাগ্য গৃহবধূ শাহিনা আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ছেঁচরাপুকুরিয়া গ্রামের পরিত্যক্ত গভীর নলকূপ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাশটি উদ্ধার করেন খননকারীরা। এদিকে লাশ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ভোর থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। এ সময় উত্তেজিত জনতা মিছিল করে খুনিদের ফাঁসি ও পুলিশকে পুরস্কৃত করার দাবি জানায়।
প্রবাসী স্বামী মোবারক হোসেনের নির্দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাড়াটে খুনিরা শ্বাসরোধ করে তিন সন্তানের জননী শাহিনাকে হত্যা করে। পরে লাশটি পরিত্যক্ত নলকূপে ফেলে গুম করে রাখে। পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিং করে খুনি আব্দুল করিমকে আটক করলে চাঞ্চল্যকর এ হত্যার তথ্য বেরিয়ে আসে।
খনন কাজে নেতৃত্বদানকারী আলী হোসেন জানান, শাহিনার মরদেহ নলকূপের ৮০ ফুট গভীর পাইপের ৬৪ ফুট অংশে পাওয়া গেছে। দেবিদ্বার থানার ওসি তারেক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, লাশের মাথার অংশে ৫টি ইট রশি দিয়ে বেঁধে নলকূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। মরদেহের ২০ শতাংশ বিনষ্ট হলেও ৮০ শতাংশ স্বাভাবিক রয়েছে। নিহতের ভাই শাহিনা অপহরণ মামলার বাদী মজিবুর রহমান লাশ ও পরনের কাপড়-চোপড় দেখে মৃতদেহটি শনাক্ত করেন। তিনি আরো জানান, প্রায় ১২ জন খননকারী ছয়দিন চেষ্টা চালিয়ে লাশটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ জন্য ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান ঘাতক আবদুল করিমকে ৭ মার্চ গ্রেফতারের পর তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। সে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শাহিনাকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করে। ৯ মার্চ ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দিও দেয়। তিনি আরো জানান, নিহতের স্বামী দুবাই প্রবাসী মোবারক হোসেন ও তার বন্ধু জসিমউদ্দিনসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হবে। এসময় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফুল ইসলাম, দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হোসেন, স্থানীয় সুলতানপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের দুবাই প্রবাসী মোবারক হোসেনের সঙ্গে প্রায় ১২ বছর পূর্বে শাহিনার বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে ইমরান হোসেন (১১), তুষার আহমেদ (৮) ও একমাত্র মেয়ে রোজিনা আক্তার (৫)। স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতন সইতে না পেরে শাহিনা মামলা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।
স্বজনদের আহাজারি: গতকাল শাহিনার লাশ উত্তোলনের পর তার মা ও ৩ সন্তানসহ স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। এ সময় ঘটনাস্থলে আসা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ প্রতিবেশীরাও অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। ইমরান জানায়, ‘রাতে (৭ ফেব্রুয়ারি) খাওয়া-দাওয়া শেষে মা আমাদের নিয়ে ঘুমিয়েছিল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা মাকে আর দেখিনি।’ মা নিখোঁজের পর থেকে তারা উপজেলার তুলাগাঁও গ্রামের নানার বাড়িতে বসবাস করছে।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: এদিকে স্বামীর ভাড়াটে খুনিদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়া শাহিনার ৩ এতিম সন্তানের দায়িত্ব নিতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন জানান, [শাহিনার লাশ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু তার নিষ্পাপ অবুঝ ৩ শিশু মায়ের পাশাপাশি পাষণ্ড বাবাকেও ‘হারিয়েছে’। তাই তাদের লেখাপড়াসহ ভবিষ্যত্ জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
মোবারকের বাড়ি ভাংচুর: চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, লাশটি উদ্ধারের পর প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে তদন্ত চলে। পরে শাহিনার মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যায় পুলিশ। এদিকে মরদেহটি উদ্ধারের পর শাহিনার স্বামী মোবারক হোসেন, ঘাতক করিমসহ হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে জনতা। পরে মোবারক হোসেনের বাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের বাড়িঘরে আবারও হামলা হতে পারে এমন আশংকায় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
