প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম সঙ্গী বিদ্যুত্। কৃষি বা শিল্পের উত্পাদনের বেলায় বিদ্যুত্হীনতার কথা ভাবা যায় না। দেশের মোট জাতীয় আয় কী পরিমাণ হবে তা এখন নির্ভর করছে বিদ্যুত্ উত্পাদনের সঙ্গে। বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ার ফলে দেশের মোট জাতীয় আয় বেড়েছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণার সঙ্গে কিন্তু বিদ্যুত্ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ফলে দেশের অনেক উত্পাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়বে। দেশের ১৬ কোটি মানুষকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির দায়ভার বহন করতে হবে। দেশের মানুষের আয়ের সীমার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত। নইলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের ওপর যে প্রভাব পড়বে তার ফলে সে তার পরিবারের জন্য অন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যটি কিনতে পারবে না। অর্থনীতির ভাষায়— ভোগকারী বাজার থেকে কোন দ্রব্য কতটুকু ক্রয় করবে তা নির্ভর করে দ্রব্যের দাম ভোগকারীর আয়ের ওপর। এখন যদি বিদ্যুতের দাম বিদ্যুত্ ব্যবহারকারী গ্রাহকের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে বেড়ে যায় তাহলে দেখা যাবে গ্রাহক তার পরিবারের অন্য পণ্যটি না কিনে বিদ্যুত্ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ বিদ্যুিবহীন দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করা যায় না।
প্রান্তিক কৃষকেরা সেচকার্য এবং বিভিন্ন জৈব সার প্রস্তুত করতে বিদ্যুতের ব্যবহার করে থাকে। এখন অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রান্তিক কৃষকেরা কৃষি উত্পাদনে বিদ্যুতের ব্যবহার যদি কমিয়ে দেয় তাহলে মোট জাতীয় উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন কৃষির উত্পাদন হতো প্রাকৃতিকভাবে। সেচব্যবস্থায় প্রকৃতির জল দেশীয় পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হতো কৃষিজমিতে আর সার ছিল জৈব যা কৃষক নিজেই উত্পাদন করতো। ফলে শ্রমের বাইরে কৃষকের আর্থিক উত্পাদন ব্যয় হতো না। তখন কৃষিপণ্যের বাজারদর যাই থাকুক কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। কিন্তু বর্তমানে অজৈব সার ছাড়া কৃষি উত্পাদনের কথা চিন্তা করা যায় না আর উচ্চ ফলনশীল বীজ উদ্ভাবনের নামে কৃষিপণ্যের বীজের বাজার এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দখলে। এ অবস্থায় কৃষিপণ্যের বাজার দর কমে গেলে কৃষককে ভর্তুকি গুনতে হয়। বর্তমানে কৃষিপণ্যের বিপণনে যে সব চ্যানেল গড়ে উঠেছে তার ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষিপণ্যের লাভ ভোগ করছে আর প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা প্রাপ্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি উপকরণ সার্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিটির উপকরণ উত্পাদনের সঙ্গে বিদ্যুত্ জড়িত। তাই বিদ্যুতের মূল্য যখন বেড়ে যাবে তখন প্রতিটি কৃষি উপকরণের দামও বেড়ে যাবে আর এতে করে কৃষি উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাবে যার বড় ব্যয়ের বোঝাটা প্রান্তিক কৃষককেই বহন করতে হবে। তাই দেখা যায় বিদ্যুতের দামের সঙ্গে কৃষি অর্থনীতির নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। গত একটি আর্থিক বছরের হিসাবে দেখা গেছে, কৃষকেরাই দেশের সামগ্রিক মূল্য স্ফীতির লাগাম টেনে নিম্নমুখী রাখছে তাদের কৃষি ক্ষেত্রের উত্পাদিত পণ্য দিয়ে। খাদ্যপণ্যর দাম ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। যে সব খাদ্যপণ্যর দাম কমে যাওয়ার জন্য মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হয়েছে তার সবগুলো এ দেশের কৃষক উত্পাদন করে থাকে।
তাই দেশের কৃষি এবং কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থা সচল রাখতে হলে প্রান্তিক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। কারণ ৬৮ শতাংশ মানুষ কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
রাজশাহী
