বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। বদলাচ্ছে মানুষের জীবনমান। আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগে ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের চেহারাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। বিশাল কর্মযজ্ঞ আর উদ্যোক্তা-শ্রমিকের মুখের হাসি ত্বরান্বিত করছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দু’পাশে গত দেড় দশকে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শুরুতে মেঘনা সেতুর উভয়পাশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে চিত্র ছিল, তা ক্রমেই প্রসারিত হয়েছে। আর তা বেসরকারি খাতের অবদানেই। ওদিকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডোরকে রাজনৈতিক কর্মসূচিমুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি অবশ্যই অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় হতে হবে। অর্থনীতি ধ্বংস করে এমন কর্মকাণ্ড কারোই কল্যাণ বয়ে আনবে না। দেশের বৃহত্ বন্দর চট্টগ্রামে পণ্য আনা-নেয়ার কাজেও ব্যবহূত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এখানকার কারখানায় পণ্য উত্পাদন করে তা শিপমেন্টের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা সমপ্রতি ঘটে যাওয়া সীতাকুন্ডের সহিংসতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঐ পরিস্থিতি যেন আর ফিরে না আসে।
শিল্পমালিকরা জানান, ‘সীতাকুন্ড ভীতি’ তাদের এখনো কাটেনি। গেল সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সহজেই ভাঙচুর ও সহিংস ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে এই করিডোর। সীতাকুন্ডে সহিংসতা হলেও তা পুরো করিডোরের শিল্পকারখানাই শুধু নয়, বরং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কারখানার পণ্যও সময়মত জাহাজীকরণ ব্যাহত হয়েছে। মহাসড়কের সীতাকুন্ড অংশে অন্তত ১৫টি প্রাইভেট কন্টেইনার ডিপো রয়েছে।
ঐ সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে দিনে-রাতে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনার মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। পণ্য পরিবহনে সৃষ্টি করা হয় অচলাবস্থার। চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘ঐ কয়েক মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শত কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ভবিষ্যতে যেন এধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্যে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আগামীতে আরো বাড়বে। এখানকার সম্ভাবনাকে উদ্যমী উদ্যোক্তারাই কাজে লাগাবেন। তবে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের সহযোগিতা দেয়া। কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখা উদ্যোক্তাদের সবভাবেই প্রোটেকশন দেয়ার দায়িত্ব সরকারের।
তবে নির্বাচনউত্তর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। ব্যবসায়ীদের শীর্ষসংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি কাজী আকরামউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমানে যে স্থিতিশীলতা আছে তা অব্যাহত থাকলে বিগত দিনের ক্ষতি পুষিয়ে আনা সম্ভবতো হবেই, বছর শেষে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হবে।
এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে উদ্যোক্তাদের সমস্যাও নিরসন জরুরি বলে মনে করেন প্রাইম মুডার এসোসিয়েশনের নেতা আকতার হোসেন। তিনি জানান, মহাসড়কে পেট্রোল ডিউটির নামে পুলিশ যানবাহন থামিয়ে চেকিং এর অজুহাতে হয়রানি করছে। এটিও বন্ধ করা উচিত।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এই করিডোরের দুই পাশেই নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। কোন কোন শিল্পগ্রুপ জমি কিনে রেখেছেন ভবিষ্যত্ শিল্পস্থাপনের আশায়। ‘ইন্ডাষ্ট্রিয়াল করিডোর’ হওয়ায় এটাকে কেন্দ করে বেড়েছে জমির দাম। বেড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বড় কারখানার পাশে সহায়ক ছোট কারখানা কিংবা সরবরাহ ব্যবসা জমেছে। কর্মবিমুখ লোকেরাও কর্মস্পৃহা পেয়েছে। আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় এসব এলাকায় সমাজ ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটছে। সমপ্রসারিত হচ্ছে সহায়ক সেবা খাত। হয়েছে কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল কলেজও। গড়ে উঠেছে দোকানপাটও। কুমিল্লার দেবিদ্বারে ছয়ঘরিয়ায় ঊষা জুট স্পিনার্সের পাশে এমনি এক দোকানে কথা হয় আজমল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, স্থানীয়দের আগে শুধু কৃষিকাজ করতে হতো। এখন অনেকে কারখানায়ও কাজ পাচ্ছে। এতে করে বেকারের সংখ্যাও কমছে।
একই চিত্র ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডেও। এই রাস্তা ধরেও গতি পাচ্ছে শিল্পস্থাপন প্রক্রিয়া। শুরুতে জমির দাম কম হলেও ক্রমেই বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের অনেকেই বলছেন, সামনের দিনগুলোতে শিল্পের জন্য জমি পাওয়াই দুস্কর হবে। তাদের মতে, এখনি পরিকল্পনা করে খাতভিত্তিক শিল্প স্থাপন করা গেলে জাতীয় অগ্রগতি সুষম হবে। ঢাকার অদূরে সাভার, কালিয়াকৈর, টঙ্গী এলাকায় আগে থেকেই শিল্প স্থাপন শুরু হয়েছে। এসব এলাকায়ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের শুরুর দিকে অনেক ঝুটঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তথাপিও তারা দমে যাননি বরং এখনো কারখানা সমপ্রসারণের পথে হাঁটছেন অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসঙ্গ এলেই রাজনৈতিক সহিংসতা প্রবৃদ্ধির পথে বড় অন্তরায় হিসাবে চিহ্নিত হয়। সর্বশেষ রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং সর্বশেষ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে অর্জিত হবে। সিপিডি বলেছে, বিগত কয়েক মাসে হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতায় যোগাযোগ, কৃষি, পোশাক শিল্প ও পর্যটন খাতে মোট ৪৯ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য খাতের ক্ষতি যোগ করলে ক্ষতি আরও বেশি হবে।
এতকিছুর পরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে। বাংলাদেশ বরাবরই বাণিজ্য ঘাটতির দেশ। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ ঘাটতি কমেছে। চলতি অর্থবছরে তা আরও কমবে বলে দাবি করেছেন সরকারের একজন মুখপাত্র।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেসসচিব বিজন লাল দেব বলেন, সহিংসতা সত্ত্বেও জিডিপি’র প্রায় ২০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। কৃষিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। যোগাযোগ ও পর্যটনসহ সেবাখাত সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও এখন চাঙ্গাভাব ফিরে এসেছে। চলতি হিসাবে স্থিতির পরিমাণ বাড়ছে। তিনি জানান, অর্থবছরের ছয় মাসে রপ্তানি আয়ে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অপরদিকে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ হাজার ৮শ’ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে যা দিয়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
