লালন দোল উত্সব আজ শুরু ছেঁউড়িয়ায়

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৯
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে আজ ১৫ মার্চ হতে শুরু হবে পাঁচদিনব্যাপী লালন দোল উত্সব। এবার উত্সবের শিরোনাম “পারে লয়ে যাও আমায়”। উত্সবকে ঘিরে লালন একাডেমির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৭ টায় লালন দোল উত্সব আনুষ্ঠানিক-ভাবে উদ্বোধন করবেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল-আলম হানিফ। সম্মানীত অতিথির বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লাই জিং। সাঁইজির মাজারের সামনে মরাকালী নদীর তীরে ‘লালন মঞ্চে’ প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হবে লালন সংগীত, লালন গবেষকদের সমন্বয়ে আলোচনাসভা ও লালন মেলা। সরকারিভাবে আজ উত্সব শুরু হলেও লালন ভক্ত, শিষ্যবৃন্দ কয়েকদিন আগে এসেছেন ‘ভবের হাটে’। দেশ-বিদেশের লালনভক্তদের প্রয়োজন হয় না দাওয়াতপত্র। তাদের হূদয়েই লেখা থাকে উত্সবের দিন তারিখ। ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির ধামে প্রতিবছর প্রধান দুইটি উত্সব উদযাপন করা হয়। একটি মার্চ মাসে দোল উত্সব অপরটি পহেলা কার্তিক ১৬ অক্টোবর সাঁইজির তিরোধান দিবস। দুইটি উত্সবই ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। বাউল সম্রাট মহামতি ফকির লালন সাঁই তাঁর জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার তিথিতে ছেঁউড়িয়ায় ভক্তদের নিয়ে উত্সব করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় পালন করা হয় দোল উত্সব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুইটি উত্সবে যোগ দেন অগণিত লালনভক্ত ও শিষ্যবৃন্দ। পুরো আখড়াবাড়ি লাখ লাখ ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয়। মহামতি ফকির লালন সাঁইজির জীবন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। ফকির লালন সাঁইজির জাত বা সম্প্রদায় নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। তাঁকে নিয়ে অসংখ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সেখানেও একেকজন গবেষক একেক কথা বলেছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৭৭২ সালে, আর মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর। লালনকে নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে বসন্তকুমার পালের ‘মহাত্মা লালন ফকির’। এ গ্রন্থে লেখক বলেছেন, ‘লালনের জন্ম সাবেক নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়ারা গ্রামে হিন্দু কায়স্থ পরিবারে। তার বাল্যনাম লালন কর। পিতার নাম মাধবচন্দ্র কর। আবার অনেকের মতে , তার জন্মস্থান তত্কালীন যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে। এছাড়া বিতর্ক রয়েছে তিনি হিন্দু না মুসলমান এ নিয়েও। কারও মতে, লালন কায়স্থ পরিবারের সন্তান, পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী। পরে লালন ধর্মান্তরিত হন। গবেষকদের বেশিরভাগই মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায় পরিবারের সন্তান। লালন ফকির নিজের জাত-পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/ লালন কয়, জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ শিশুকালেই লালন শাহ তার পিতাকে হারান। বিয়েও করেন বেশ অল্প বয়সে। কোন কাজে তিনি গ্রামের বাইরে থাকা অবস্থায় লালন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। দৈবক্রমে বেঁচে যান লালন। এসময় তার পরিচয় হয় গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। লালন গ্রামে ফিরে এলে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ তাকে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলতে দেয় না। লালন ফিরে আসেন সিরাজ সাঁইয়ের কাছে। পরে তিনি কুষ্টিয়ার বিরাহিমপুরে পরগনার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়া গড়ে তোলেন। ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে ফকির লালন আমৃত্যু সেখানেই বাস করেন। লালন ভক্ত মলম শাহ আখড়া তৈরির জন্য ষোল বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ঐ জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে তোলেন। প্রথমে সেখানে সাঁইজির বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। ছেঁউড়িয়ায় আখড়া স্থাপনের পর থেকে তিরোধানের আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন। লোকায়ত বাঙালির মরমি সাধনা, সংগীত ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে নামটি সেটিই হলো ফকির লালন সাঁই।। বাংলার এক ক্রান্তিকালে তিনি জন্মেছিলেন সংস্কার-জাতপাত ও শাস্ত্রশাসিত এক ধর্মান্ধ সমাজে। আপন অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও চেতনার মধ্য দিয়ে এই অনুদার পরিবেশকে অগ্রাহ্য ও অতিক্রম করে আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একইসঙ্গে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শক্তির অর্চনা করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন-নিগৃহীত-অবজ্ঞাত নিম্নবর্ণের জনমানুষের ‘মানবগুরু’-পরমপুরুষ ‘জীবনসাঁই’।