সব বাধা পার হয়ে এগিয়ে যাব :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৪, ২৩:২৩
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে যাব। তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, আমরা তার স্বপ্নের বাংলাদেশের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য অর্জনে সংকল্পবদ্ধ। কেউ আমাদের ‘দাবায়ে’ রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে। তিনি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত ‘৭ই মার্চের ভাষণ ঃ বিশ্ব-ইতিহাসে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ ভাষণ’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক চড়াই-উত্ড়াই পেরিয়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি। দেশের মানুষের জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। শত ষড়যন্ত্র পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাঙালিদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।” দেখেন, কথটা কত সত্যি! স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি সবসময় সক্রিয় ছিল, এখনও রয়েছে। কিন্তু দেশের অগ্রযাত্রা তারা ব্যাহত করতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের তাত্পর্য ছাড়াও ওই ভাষণ প্রদানের আগে ও পরে তার কাছ থেকে দেখা বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ যাতে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে না পারে, স্বাধীনতার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে না পারে সেজন্য স্বাধীনতার শত্রুরা মাত্র দশ বছরের শিশু রাসেলকে পর্যন্ত বাঁচতে দেয়নি। তিনি বলেন, শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দিতে ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকেও তারা হত্যা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের অনেক সেক্টর কমান্ডারকেও হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোই নিষিদ্ধ ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণেই মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। একটি মাত্র ভাষণে জাতির পিতা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ ২৩ বছরের লড়াই-সংগ্রামের সফলতা এনে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভাষণটি কখনো পুরনো হয় না। ৪৩ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ ভাষণটি শুনছেন, কিন্তু ভাষণটির আবেদন এতটুকুও কমেনি। পৃথিবীর কোন ভাষণ বছরের পর বছর, ঘন্টার পর ঘন্টা এতো দীর্ঘ সময় বাজেনি, আবেদনও ধরে রাখতে পারেনি। দেশের মানুষ যখনই এই কালজয়ী ভাষণটি শুনেন, তখনই নতুন করে উদ্দীপ্ত হন। বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের প্রতিটি উচ্চারণ ও শব্দ আমাদের নতুন করে প্রেরণা যোগায়। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণ দিতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তুতি সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ভাষণ দেয়ার আগে অনেক নেতাই বঙ্গবন্ধুকে নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিভিন্ন বক্তব্য লিখেও দিয়েছিলেন। অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু ভাষণ দেয়ার আগে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর সামান্য বিশ্রামের সময় আমার মা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, অনেকে অনেক কথা বলবে, পরামর্শ দেবে কিন্তু তোমার কাছে যেটা ঠিক সেটাই বলবে। কারণ জনসভায় লাখো বাঙালির হাতে লাঠি, আর পেছনে সশস্ত্র পাক হানাদাররা। সব মানুষের দায়-দায়িত্ব তোমার ওপর। তাই তোমার মনে যা আছে তাই বলবে, কারোর কথা শুনার দরকার নেই। পিতার ঐতিহাসিক ভাষণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সত্যিই তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে কোনো লিখিত বক্তব্য বা নোট ছাড়াই বঙ্গবন্ধু তার মনের কথা বলেছেন। কোনো লেখা বা নোট ছাড়াই এক মহাকাব্য রচনা করেন, একটি ভাষণেই গোটা জাতিকে স্বাধীনতার গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে এনে দিয়েছিলেন মহান স্বাধীনতা। তিনি বলেন, ভাষণ দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধু জানতেন, এমনকিছু বলা যাবে না যাতে স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া যায় না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের মাধ্যমেই স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার এ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান ও নির্বাহী কর্মকর্তা মাশুরা হোসেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক অনুপম সেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার ছোট ছোট শিল্পীরা। এরপর একাত্তরের ৭ই মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী বজ্রনির্ঘোষ ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ডকৃত প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন খ্যাতনামা নাট্যশিল্পী লাকী ইমাম ও ড. শাহাদাত্ হোসেন নিপু। দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক অনুপম সেন বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণটি বিশ্ব-ইতিহাসে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। এছাড়া বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়েকটি অসাধারণ বক্তৃতা আছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি তার মধ্যে অন্যতম, সম্ভবত শ্রেষ্ঠতমও। মহাকাল ছাপিয়ে এই মহাকাব্যিক ভাষণটি তাই কোনদিন ম্লান হবে না। তিনি বলেন, একাত্তরে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী, বিত্ত-বৈভবের বিভাজন নির্বিশেষে এক মহাঐক্যে জাগ্রত করেছিলেন এক মহাভাষণের মাধ্যমে।