শহরজুড়ে নানান রংয়ের আলো, স্টেডিয়ামজুড়ে বাজছে দুনিয়া কাপানো শব্দযন্ত্র, চলছে শেষ সময়ের নিরাপত্তা প্রহরা, নগরীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলেছে খেলোয়াড়দের বহর!
এই একটার পর একটা দৃশ্যই বলে দেয়, এক মহাআয়োজনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশ। হ্যাঁ, আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির জন্য প্রস্তুত এখন বাংলাদেশ। আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। তারপরই পর্দা উঠবে বিশ্ব ক্রিকেটের বৃহত্তম এই আসরের।
স্বাগতিক বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের খেলার ভেতর দিয়ে আজ দুপুর সাড়ে তিনটায় মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে শুরু হয়ে যাবে এই মহাআসরের মাঠের লড়াই। একই দিনে চট্টগ্রামে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হবে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচ।
ইতিমধ্যে এই টুর্নামেন্ট উপলক্ষে বিশ্বের ও দেশের নামকরা সঙ্গীতজ্ঞদের নিয়ে এক ‘সেলিব্রেশন কনসার্ট’ হয়ে গেছে ঢাকায়। টুর্নামেন্টে অংশ নিতে বিশ্বের সব ক্রিকেট দল বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে বা দু’একদিনের মধ্যে পৌঁছাবে। অনুশীলন ম্যাচের ভেতর দিয়ে মাঠের উত্তেজনাও ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর আজ থেকে শুরু হবে সত্যিকারের ‘বিশ্বকাপ’ লড়াই।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই টুর্নামেন্টের নাম মোটেও ‘বিশ্বকাপ’ বা এরকম কিছু নয়; নাম তার—আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্রিকেট ইতিহাসের বৃহত্তম এই আয়োজনকে বিশ্বকাপ বলে ডাকতেই পছন্দ করেন। আর সেটা না করারও তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ সব ধরনের হিসাব নিকাশ বলছে, ক্রিকেটের বিশ্বে এটাই সবচেয়ে বড় ‘কাপ’।
খেলোয়াড়ের সংখ্যাতেই এর ধারেকাছে কোনো টুর্নামেন্ট হয় না ক্রিকেটে। ছেলেদের ১৬টি এবং মেয়েদের ১০টি; মোট ২৬টি দলের ৩৯০ জন খেলোয়াড় লড়বেন পাশাপাশি হতে থাকা দুটি টুর্নামেন্টে! খেলোয়াড়ের বিচারে যেমন, দলের বিচারেও এমন টুর্নামেন্ট আগে কখনো দেখেনি ক্রিকেট। বিশ্বজুড়ে সম্পৃক্ত হতে যাওয়া দর্শকের বিচারে, প্রচার ব্যবস্থার বিচারেও এটি ক্রিকেটের ইতিহাসের এক নম্বর।
সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আশা করছে, এবার প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ বিশ্বজুড়ে এই টুর্নামেন্টটি দেখবে; ফুটবল বা অলিম্পিকের তুলনায় এটা হয়তো কিছুই না। কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে কোনো টুর্নামেন্টে এতো দর্শক সম্পৃক্ত করা হয়নি। আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বলেছে, ২৯টি চ্যানেল বিশ্বের ২২৩টি দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে এবারের আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির খেলা। এই খেলাগুলো বিশ্বের ২০টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় সম্প্রচারিত হবে; টেলিভিশন ও রেডিওতে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণে অনলাইন সম্প্রচার তো থাকছেই।
বাংলাদেশের দর্শকদের জন্যই এ এক অসাধারণ, অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। এতো উঁচু মানের বৃহত্ আয়োজনের সম্প্রচারই এর আগে বাংলাদেশ থেকে কখনো হয়নি। এখানে প্রতিটি ম্যাচ সম্প্রচার করা হবে ২৮টি করে ক্যামেরায়! এর মধ্যে প্রচলিত স্ট্যাম্প ক্যাম, আলট্রামোশন ক্যাম ছাড়াও বাংলাদেশের ‘আকাশে’ প্রথমবারের মতো দেখা মিলবো স্পাইডার-ক্যামের। এই খেলা সম্প্রচারে কণ্ঠ দিতে বিশ্বের প্রায় সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের নামকরা সব তারকা ধারাভাষ্যকার ইতিমধ্যে বাংলাদেশে চলে এসেছেন।
এই বিশালত্ব নিয়ে এতো কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই- এটা যে বিশ্বকাপের চেয়ে বড় ‘বিশ্বকাপ’ সেটা বোঝানো।
এই বিশ্বকাপের ছেলেদের অংশে অবশ্য দুটো পরিষ্কার বিভাজন হচ্ছে। আজ থেকে যে প্রথমপর্বের খেলা শুরু হচ্ছে, এটাকে অনেকে বলছেন বাছাইপর্ব। এখানে দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের সঙ্গে অংশ নেবে ছয়টি আইসিসির সহযোগী দেশ। এই মোট আট দেশের দুই গ্রুপ থেকে দুটি চ্যাম্পিয়ন দল চলে যাবে মূলপর্ব বা সুপার টেনে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছে আইসিসি র্যাংকিংয়ের শীর্ষ আট দল। আর তাদের সঙ্গেই শুরু হবে ট্রফির জন্য প্রতিযোগিতা। এদিকে মেয়েরা সরাসরি লড়বে তাদের ট্রফির জন্য।
শেষ পর্যন্ত ফলাফল যাই হোক; দেশের মাটিতে এই মহাযজ্ঞের অংশ হতে পারাটাও একেবারে কম কথা নয়। এরপর ফল যা ভালো আসবে, সেটাও প্রাপ্তি বলে মেনে নিতে হবে।
