ভারতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেবযানী খোবড়াগাড়ে ইস্যুটি দিল্লি-ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সম্পর্কে এমন টান বসিয়েছিল যে, তা প্রায় ছিঁড়ে যাবার যোগাড় হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়েছিল ভারত। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে নেমে আসে ‘কঠোর ব্যবস্থা’র খড়গ। অনেকটা শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে দেবযানীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উভয় কূল রক্ষা করতে পেরেছিল।
ভারতের সঙ্গে ছিঁড়তে যাওয়া সম্পর্ক ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল আবার দেবযানীও মার্কিন আদালতের কঠোর সাজার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবার আশা ত্যাগ করতে দেবযানী এবং ভারত উভয় পক্ষের আশা ছিল মার্কিন আদালতে দায়ের করা মামলা অকার্যকর হয়ে যাবে।
হয়েছিল তেমনটি। দেবযানীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা খারিজ করে দেন বিচারক। রায়ে বলা হয়, দেবযানী খোবড়াগাড়ে নির্দোষ। মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে প্রাথমিক জয় পান এই ভারতীয় কূটনীতিক। পাশাপাশি, নিউইয়র্কের ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত অবস্থায় তিনি কূটনীতিক হিসাবে আইনি রক্ষাকবচের আওতায় ছিলেন বলে আদালত তার রায় জানায়। সে কারণেই তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সমস্ত ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিয়েছে বলে জানায় আদালত।
ভারতে ফেরার আগে ভিসা কারচুপি ও পরিচারিকাকে কম বেতন দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল দেবযানীকে। এমনকী থানায় নিয়ে এসে তাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি চালানো হয়েছিল। ক্যাভিটি সার্চ করতেও দ্বিধা করেনি পুলিশ। অথচ ক্যাভিটি সার্চ করা হয় কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের। তল্লাশি চালানোর পর তাকে রাখা হয়েছিল সেই কুখ্যাত অপরাধীদের সঙ্গে থানার একই সেলে। এই খবর প্রকাশিত হতেই সারা ভারতে ক্ষোভ দেখা দেয়। ভিয়েনা কনভেনশন অনুসারে এই ভারতীয় কূটনীতিককে আইনি রক্ষাকবচ দিতে অস্বীকার করেছিল বারাক ওবামা প্রশাসন।
অথচ সেই ওবামার দেশের মাটিতেই খারিজ হয়ে যায় তার প্রশাসনের যুক্তি। গোটা বিতর্কের সময় খোবরাগাড়ে আইনি রক্ষাকবচ পাওয়ার অধিকারিনী ছিলেন বলে গত বুধবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে নিউ ইয়র্কের আদালত। আইনি রক্ষাকবচের আওতাধীন কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করা যায় না বলে আদালত জানায়। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে এই রায় সম্পর্কে সেদিন কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। পরাজয় হওয়া সত্ত্বেও তারা চুপ করে ছিলেন।
সেই চুপ করে থাকার অর্থ স্পষ্ট হলো। ঝড়ো বাতাস শুরুর আগে যেমন গুমোট আবহাওয়ার দেখা মেলে। দেবযানীর বিরুদ্ধে আবারো মামলা করেছে মার্কিন প্রশাসন। ফের অস্বস্তিতে পড়েছেন দেবযানী। মামলাতেই শেষ নয়। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে মার্কিন প্রশাসন। শুক্রবার ম্যানহাটনে মার্কিন কৌঁসুলিরা এই মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই তাকে আটক করে আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে। মার্কিন সরকারি আইনজীবী প্রীত ভারারা জানিয়েছেন, দেবযানীকে গ্রেফতার করে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে তা আদালতকে জানাতে হবে। এমনই নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা।
দেবযানীর আইনজীবী ড্যানিয়েল আরশ্যাক যে হতাশ তা স্বীকার করে নিয়েছেন। আরশ্যাক জানিয়েছেন, তিনি আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে যাতে এই ইস্যুতে ভারতের সাথে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন যে তাকে নিয়ে আবার টানাটানি শুরু করেছে এটা রহস্যজনক। আদালতের হাত দিয়েই যেখানে মামলাটির মৃত্যু হয়েছিল সেখানে নতুন করে মামলা খুঁড়ে আনার কোনো যুক্তি ছিল না বলে তিনি মনে করেন।
সরকার পক্ষের আইনজীবী বলেছেন, ‘মার্কিন গ্র্যান্ড জুরি দেবযানীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এনেছেন’। এবারও ভিসা জালিয়াতি এবং পরিচারিকাকে কম বেতন দেয়ার জন্য নতুন করে অভিযোগ আনা হয়েছে। সুতরাং দেবযানীকে গ্রেফতার করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। এই অপরাধে তার যাতে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয় তাও নিশ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য, ভিসা প্রতারণা মামলায় গত ১২ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে দেবযানী খোবরাগাড়েকে গ্রেফতার করে মার্কিন পুলিশ। পরে আড়াই লাখ ডলারের বিনিময়ে জামিনে ছাড়া পান তিনি। মার্কিন প্রশাসনের একটি সূত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, দেবযানীকে গ্রেফতার করার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও চাওয়া হতে পারে। আন্তর্জাতিক সহায়তা বলতে তারা ইন্টারপোলকে বুঝিয়েছেন কি না তা স্পষ্ট নয়। ভারত- মার্কিন সম্পর্কে ক্ষত সৃষ্টি করা যে ইস্যুটি স্মৃতির আড়ালে হারাতে বসেছিল এবং যে বিব্রতকর ইস্যুটি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল উভয় দেশ তা আবার জাগিয়ে তোলা হলো কেন সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে লাখো মনে।
