মরুর বুকে স্বপ্নের মৃত্যু!

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৬
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে প্রতিবছরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এদের একটা বড় অংশই যাচ্ছে অবৈধ উপায়ে। দারিদ্র্য পীড়িত কষ্টের জীবন পিছু ফেলে স্বপ্নের দেশে একটু সুখের আশায় যাচ্ছে যে মানুষগুলো, তারা কি সবাই নিরাপদে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে? না, পারছে না। সাগরে ডুবে, শীতে জমে অথবা মরুভূমির প্রখর রোদে পুড়ে পথেই জীবন হারাচ্ছে অনেকে। তারপরও সোনার হরিণের খোঁজে ছুটে চলেছে মানুষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাগোয়া দেশ মেক্সিকো। প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোই দেশটির অবস্থা। দারিদ্র্য, দুর্নীতি, আইন-শৃঙ্খলার অভাব বলা যায় দেশটার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক ব্যবসা ও মানব পাচার যা বহুকাল ধরেই ভোগাচ্ছে প্রতিবেশী মার্কিন সরকারকে। সেই অনাদিকাল থেকেই মেক্সিকো থেকে দরিদ্র মানুষেরা উন্নত জীবনের আশায় বৈধ-অবৈধ পন্থায় পাড়ি জমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। অবৈধভাবে সেখানে যেতে তারা অতিক্রম করছে বিশাল মরুভূমি। কিন্তু বিশাল মরু পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশে যাওয়ার সৌভাগ্য সকলের হয় না। মরুর বুকেই ঝরে যায় অনেক মূল্যবান জীবন। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা রাজ্য ও মেক্সিকোর ৩৮৯ মাইল দীর্ঘ সীমান্তের মাঝে রয়েছে ১০০ বর্গমাইলের বিশাল মরুভূমি। রুক্ষ এই মরুভূমির বুকে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ধু ধু বালির মাঝে এখানে যত্রতত্র রয়েছে ক্যাকটাসসহ কিছু শুকনো গাছপালা, আছে র্যাটেল স্নেক, কাকড়াবিছে, গিরগিটিসহ কিছু মরুপ্রাণীর বসবাস। সূর্যের প্রখর তাপে একনাগাড়ে বেশিক্ষণ পথ চলা প্রায় অসম্ভব। এমনকি সাথে পর্যাপ্ত পানি, খাবার ও শরীর ঢাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় নিয়ে যাওয়ার পরও বিপদে পড়তে হতে পারে। মরুপথে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রগামীরা প্রায়শই পড়েন বিভিন্ন বিপদে। কখনও বা হন মরুবাঘের শিকার আবার কখনও পড়েন ‘মানুষ বাঘের’ খপ্পরে। সঙ্গে আসা দালাল বা গাইড সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে মরুর বুকেই মেরে রেখে যায় তাদের। এই মরুভূমি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেতে প্রতিবছরই মারা পড়েন বেশ কিছু মানুষ। ২০০১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মারা গেছেন দু’হাজার একশ জনেরও বেশি। অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে হিটস্ট্রোকে। মাথার ওপর সূর্যের প্রখর তাপ মানব শরীর দীর্ঘক্ষণ সইতে পারে না। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ঊষর মরুর বুকে মানুষের এই অসহায় অবস্থার কথাই তুলে ধরেছেন লুইস অ্যালবার্টো উরিয়া তার পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ ‘দ্য ডেভিলস হাইওয়ে’তে। তিনি বলেছেন, মরুর বুকে চলতে চলতে এক পর্যায়ে সুস্থ মানুষও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এটা শরীর যন্ত্রকে থামানোর জন্য মস্তিষ্কের একটা প্রক্রিয়া। অনেকটা খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে এসে গাড়ির ব্রেক চাপার মতো। হিটস্ট্রোকের শেষ স্টেজে আসার পর মানুষ হ্যালুসিনেশনে ভোগে অর্থাত্ উল্টোপাল্টা জিনিস দেখতে থাকে। হয়তো দেখে মরুর বুকে সুন্দর হ্রদ বয়ে গেছে অথবা সামনে দিয়ে হরিণ দৌড়ে যাচ্ছে। পানি ও খাবারের তীব্র চাহিদার কারণে এমনটা দেখে মানুষ। এই ভয়ংকর মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়েই মেক্সিকো থেকে প্রতিবছর মানুষ যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর প্রায় দুই হাজার মাইল দীর্ঘ সীমান্তের পুরোটাই অ্যারিজোনার মতো এত বিপদসংকুল নয়। তবে অন্য পথে অবৈধভাবে যেতে ধরা পড়ার ভয় বেশি। সেজন্য দীর্ঘ মরুপথই বেছে নিচ্ছে অধিকাংশ মানুষ। আগে অবশ্য এত বিপদসংকুল পথে যুক্তরাষ্ট্রে যাবার প্রবণতা খুব বেশি ছিল না। যে কারণে মৃত্যু কম হতো। কিন্তু বছর দশেক যাবত্ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে যথেষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। দুর্বল অর্থনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার দেশ থেকে অভিবাসীর সংখ্যা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে মোতাবেক ২০১০ সাল থেকে দু’বছরে দু’লাখেরও বেশি অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণের সুবাদে সে দেশের নাগরিকত্বপ্রাপ্ত তাদের সন্তান রয়ে গেছে সেখানেই। মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো এমন অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানের কাছে ফিরে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বৈধভাবে না পেরে অবৈধ পন্থাই বেছে নিচ্ছেন অনেকে। আর অ্যারিজোনার বিশাল মরু পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন যাচ্ছে অনেক হতভাগ্যের। সূত্র: আল জাজিরা