সুবিধাদি না থাকলেও উত্তরাঞ্চলে এক সময় ভারী শিল্পও গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন উদ্যোক্তারা। উত্তরের শেষার্ধে পঞ্চগড়ে বেসরকারি উদ্যোগেই শুরু হয় চা শিল্পের পদযাত্রা। কৃষি এলাকা হওয়ায় বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্প সারাদেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও হচ্ছে। রাজশাহী সিল্কের কদরের কথা কার অজানা। তথাপিও পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না উত্তরাঞ্চলের। উদ্যোক্তাদের আবেদন, ‘প্লিজ উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগান। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করুন।’
অন্য সব অঞ্চলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উত্তরাঞ্চলের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলে দারিদ্র্যের হারও বেশি। আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কলকারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হলে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীর্ণ হওয়া মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে। সেই ধারণা থেকেই উদ্যোক্তারা চাচ্ছেন বিনিয়োগ বাড়াতে। তাই গ্যাস-বিদ্যুত্ তথা জ্বালানি সুবিধাসহ কিছু বিশেষ সুবিধা দাবি করছেন এখানকার উদ্যোক্তারা। এরমধ্যে এখানকার কারখানায় উত্পাদিত পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেল লাইন স্থাপন অন্যতম। তাদের মতে, বিদ্যুত্ সমস্যা সমাধানে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র এবং তার আগ পর্যন্ত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে।
বিসিক শিল্প সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বগুড়ায় একসময় ভারী শিল্প গড়ে উঠেছিল। বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত ভারী শিল্পগুলোর মধ্যে ছিল বগুড়া কটন মিল ও জামিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। স্বাধীনতার পর দেনার দায়ে বন্ধ হয়ে যায়। ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। শিল্পগুলো বন্ধ করে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে হাউজিং এস্টেট। বেকার হয়ে পড়েছে ১৫/২০ হাজার শ্রমিক।
উত্তরাঞ্চলে শিল্পের কথা এলেই বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্পের প্রসঙ্গ চলে আসে। এখানকার উত্পাদিত যন্ত্রাংশের কদর দেশে-বিদেশে। কিন্তু শিল্পটি বিকশিত হতে পারছে না যেসব কারণে, তারমধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে বিদ্যুত্-গ্যাসের অভাব। তারপর রয়েছে প্রয়োজনীয় পুঁজি, নির্দিষ্ট প্রসেসিং জোন, দক্ষ শ্রমিকের অভাব। স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, এখানে তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ দিয়ে দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ হয়। ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশেও রয়েছে চাহিদা। সরাসরি এই শিল্পে রয়েছে প্রায় ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। ভাঙ্গা জাহাজের লোহা লক্করসহ পরিত্যক্ত লোহা হচ্ছে এসব যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল। এগুলো বগুড়ায় ফাউন্ড্রি শিল্প বলা হয়। আর এমন শিল্পের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এছাড়া বিভিন্ন ছোট, বড় ও মাঝারি মানের কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও ওয়ার্কশপ রয়েছে পাঁচ শতাধিক।
এসব কারখানায় তৈরি যন্ত্রাংশের মধ্যে রয়েছে পানির পাম্প, টিউবওয়েল, শ্যালো ইঞ্জিনের লায়নার, পিস্টন, পাওয়ার টিলার, ধান ও ভুট্টা মাড়াই মেশিনসহ সকল কৃষি উপকরণাদি। এছাড়াও প্লানার, ক্রাংক শ্যাফট্ গ্রানডিং, মিলিং, সেপার, বোরিং মেশিন, লেদ মেশিন, স’ মেশিন ইত্যাদি তৈরি হয়। বগুড়ার বিসিক, গোহাইল রোড, স্টেশন রোড, রেলওয়ে মার্কেট, সান্তাহারসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাগুলোর উত্পাদিত যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে হলে দরকার পাম্প টেস্টিং সেন্টার, হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, মডেল ওয়ার্কশপ নির্মাণ। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার কেউ নেই।
উত্তরাঞ্চল কৃষি এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলে এখানকার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশের চাহিদা বাড়তে থাকে। ফলে, এ শিল্পকে ঘিরে বগুড়ায় গড়ে উঠেছে বিরাট মার্কেট। শুধু কৃষি যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানই রয়েছে এক থেকে দেড় হাজার। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার ক্রেতারা এখান থেকে কৃষি যন্ত্রাংশ কিনে নিয়ে যান। উদ্যোক্তাদের দাবি, কৃষি খাত হওয়ায় সরকারের উচিত এই শিল্পে পর্যাপ্ত সুবিধা দেয়া। তাহলে কম মূল্যে কৃষকদের মধ্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ফাউন্ড্রি শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আইনুল হক সোহেল জানান, বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর উত্তরাঞ্চলের কৃষি শিল্পের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল এত বছরে সে সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। বগুড়া চেম্বার সভাপতি মমতাজ উদ্দিন জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পে বিনিয়োগ বাস্তবায়নও পিছিয়েছে। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে শিল্প বিকাশে ব্যাংক ঋণের জটিলতাও অন্যতম সমস্যা। কাঁচামালের সংকটতো আছেই। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উত্পাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তবু উদ্যোক্তারা থেমে থাকেননি। তবে আরো বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অবশ্যই সরকারকে সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু উত্তরাঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা নেই, সেখানে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের কিছু ইনসেনটিভ দিতে পারে সরকার। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা বিচার করে বিভিন্ন পণ্যের করের হার, কর রেয়াত ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ ফান্ড থেকে উত্তরাঞ্চলের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যায়। সর্বোপরি উদ্যোক্তাদের আগ্রহটাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
