গেইল চোখটা বাঁকিয়ে বললেন, ‘তিন ফরম্যাটে সমস্যা? আমি তো চাই চার ফরম্যাট থাকুক। এর সঙ্গে মাস্টার্স ক্রিকেটটাও অফিশিয়াল করা দরকার। আমি যাতে অবসরের পরও ক্রিকেট খেলতে পারি। এই যে পিটারসেন অবসর নিলো; ওকে মিস করছ না? আমাকেও কী ওরকম মিস করতে চাও?
মাথায় সরু বিনুনি করা চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি; খুব সিরিয়াস ভঙ্গি নিয়ে এসে টেবিলে বসলেন। এই ‘সিরিয়াসনেস’ দেখেই বিভ্রান্ত হয়ে কি না, কে একজন সিরিয়াস প্রশ্ন করলেন—অনেকদিন স্পিনার গেইলকে দেখা যায় না, এবার দেখা যাবে তো?
মুখটা আরও গম্ভীর করে একটু ভেবে বললেন, ‘ও হ্যাঁ। এই প্রশ্নটা আমাকে আসলে প্রায়ই শুনতে হচ্ছে। বোঝেনই তো, সবাই স্পিনার গেইলকে দেখতে চায়। চাইবে না কেন? আফটার অল, গেইল বিশ্বের সেরা স্পিনার তো!’
সঙ্গে সঙ্গে সব সিরিয়াসনেস ছক্কার মতো করে বাউন্ডারির বাইরে চলে গেল। হাসির হুল্লোড় শুরু হলো।
সেই শুরু। এরপর থেকে টানা প্রায় মিনিট পনেরো ধরে মিডিয়া সেশনে উপস্থিত সাংবাদিকদের একটার পর একটা চমক দেয়া কথাবার্তা, হাসির খোরাক উপহার দিয়ে চললেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, কেন তিনি বর্তমান দুনিয়ার সেরা বিনোদন দেয়া ক্রিকেটার। হ্যাঁ তিনি আসলেই ‘মাস্টার অব এন্টারটেইনমেন্ট’—ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল; ক্রিস গেইল।
অনেকেই আফসোস করেন ক্যামেরা, টাকা আর অতিপেশাদারিত্বের দাপটে ক্রিকেট থেকে নির্ভেজাল বিনোদন ব্যাপারটা হারিয়ে যেতে বসেছে। এই পেশাদার দুনিয়াতে সম্ভবত সবচেয়ে ‘পেশাদার’ ক্রিকেটার ক্রিস গেইল।
বরিশাল বার্নার্স, ঢাকা গ্লাডিয়েটর্স থেকে শুরু করে রয়েল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরু, সিডনি থান্ডার্স; দুনিয়ার সব প্রান্তে ‘অর্থের বিনিময়ে’ ক্রিকেট খেলে বেড়ান গেইল। অথচ মজার ব্যাপার হলো, সেই গেইলই এখনও ক্রিকেটে সম্ভবত অপেশাদার যুগের সেই মজা, প্রাণোচ্ছলতা সবচেয়ে বেশি ধরে রেখেছেন।
গতকালই ব্যাটসম্যান গেইল অনায়াসে নিজেকে ‘বিশ্বের সেরা’ স্পিনার বলে মজাটা শুরু করলেন। এরপর প্রশ্ন হলো, ব্যাটিংয়ে ইদানিং সবাই নতুনত্ব আনছে, তিনি কিছু করতে চান কি না? গেইল রসিকতা করার জন্য যেন তৈরিই ছিলেন। একটুও না হেসে বললেন, ‘অনেক ইম্প্রোভাইজড শট তো অনেকে আবিষ্কার করে ফেলেছে। একটু অপেক্ষা করুন, এবারের টুর্নামেন্টেই দেখতে পাবেন। কী দেখবেন? ডান হাতে ব্যাট করবো।’
বাঁহাতি গেইলের এ রকম ভয়াবহ ঘোষণা শুনে বোলারদের রক্ত ভয়ে শীতল হয়ে যেতে পারে।
তবে গেইল এই একটা ঘোষণা দিয়েই ঠাণ্ডা হওয়ার লোক নন। আরেকটা ঘোষণাও দিয়ে দিলেন। পরের টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরিটা করতে হবে, তার দিন তারিখ ঠিক করে জানিয়ে দিলেন, ‘জ্যামাইকায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সামনে যে টেস্ট, ওটা আমার শততম টেস্ট। প্রস্তুত থাকুন, ওখানে আরেকটা ট্রিপল সেঞ্চুরি করবো।’
নিউজিল্যান্ডের বোলাররা শুনতে পেলেন কিছু?
নিউজিল্যান্ডের বোলাররা না শুনতে পেলেও এর ঠিক পরের আলোচনাটাই সোহাগ গাজীর শোনা দরকার। হ্যাঁ, সর্বশেষ সিরিজে গেইলের হাত-পা বেঁধে রাখা বাংলাদেশি স্পিনার সোহাগ গাজী। দীর্ঘকালের মধ্যে ব্যর্থতম সময় উপহার দেয়া সোহাগের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই এলো।
কিন্তু গেইলের প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে তিনি সোহাগের নাম মনে রেখেছেন। খুব খানিকটা সময় ধরে মনে করার অভিনয় করলেন। তারপর হেসে বললেন, ‘ও আচ্ছা, সেই সোহাগ? যাকে আমি টেস্টের প্রথম বলে ছক্কা মেরেছিলাম! দেখেছ, একটা ছক্কা ওকে কেমন বিখ্যাত করে দিয়েছে।’
কথাটা বলে নিজেই হেসে লুটিয়ে পড়লেন। তারপর ব্যাপারটা সোহাগের জন্য অবমাননার হয় কি না, সম্ভবত সেই ভয়েই একটু সামলে নিলেন, ‘আসলেই ভালো বোলার ও। বাংলাদেশের জন্য খুব ভালো সম্ভাবনাময়। ওই সিরিজে দারুণ বল করেছিলো।’
এর মাঝেই পাশে থেকে আইসিসির মিডিয়া কর্মকর্তা ‘সিরিয়াস’ প্রশ্ন করলেন—টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি; ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটই থাকা উচিত কি না। গেইল চোখটা বাঁকিয়ে বললেন, ‘তিন ফরম্যাটে সমস্যা? আমি তো চাই চার ফরম্যাট থাকুক। এর সঙ্গে মাস্টার্স ক্রিকেটটাও অফিশিয়াল করা দরকার। আমি যাতে অবসরের পরও ক্রিকেট খেলতে পারি। এই যে পিটারসেন অবসর নিলো; ওকে মিস করছ না? আমাকেও কী ওরকম মিস করতে চাও?’
একটু না!
অনেক ঠাট্টা হলো, অনেক মজা হলো; না লেখার মতো অনেক রসিকতাও হলো। এমনকি এবার জিতলে গ্যাংনামের মতো নতুন কিছু করবেন, তাও জানিয়ে দেয়া হলো। নিজেই বললেন, এমন মজা দিতে, আনন্দ দিতে ভালো লাগে তার; সেটা মাঠে হোক, আর আড্ডায়।
তবে এই যে ‘গেইল মানেই আনন্দ’ এই ব্যাপারটা ক্রিকেট মাঠে যে মাঝে মাঝে তাকে একটু বিপদে ফেলে দেয়, সেটা এক ফাঁকে জানিয়ে দিলেন, ‘আমি বুঝি, শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজে নয়, এখন সারা পৃথিবীতেই আমি ব্যাটিংয়ে নামলে লোকে এই আনন্দ খোঁজে। সবাই ভাবে, আরেকটা বিস্ফোরক ইনিংস হবে। এই ভাবনা আমাকে চাপেও ফেলে। এটা তো ক্রিকেট, বলে কয়ে এ রকম মজা তো রোজ করা যায় না। তারপরও চেষ্টা করে যাই।’
একটু সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে সুরটা? সমস্যা নেই। ঠিক ওঠার সময় বলে দিলেন, ‘হ্যাঁ, অনেকদিন হলো, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করা হয় না। অপেক্ষা করুন; এবার হবে।’
আমরা অপেক্ষায় থাকলাম, ক্রিস। পুরো পৃথিবীই আনন্দ নিয়ে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে।
