নগরীর খুলশি থানাধীন ষোলশহর মোড় এলাকার একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় দুই বন্ধুর ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে লাশ দু’টি উদ্ধার করে। এরপর তা ময়না তদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
নিহতরা হলেন, মো. কামরুল হাসান (১৯) ও মো. ফোরকান উদ্দিন (২০)। কামরুল নগরীর এমইএস কলেজের ছাত্র ছিলেন। এবছর তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে ফোরকান চট্টগ্রাম ইপিজেডে একটি বিদেশি মালিকানাধীন গার্মেন্টসে ওয়েল্ডারের চাকরি করতেন। কামরুল খুলশি থানাধীন ষোলশহর এলাকার তুলাতলি মতিনের কলোনিতে পরিবারের সাথে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ফোরকানের বাসাও একই এলাকায়।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিহতরা এমইএস কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। দুই গ্রুপের কোন্দলের জের ধরে দুই বন্ধুকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। তবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, কামরুল ও ফোরকান রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা নেই। পুলিশও এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
এদিকে সেপটিক ট্যাংক থেকে কামরুল ও ফোরকানের লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এমইএস কলেজের ছাত্রলীগ কর্মীরা ষোলশহর এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। এসময় তারা বেশ কয়েকটি যানবাহনের কাঁচ ভাংচুর করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহত কামরুলের মা জোত্স্না বেগম গতকাল ইত্তেফাককে জানান, শনিবার রাত ১১টার দিকে বাসার সামনের দোকানে চা খাওয়ার কথা বলে কামরুল বাসা থেকে বের হয়ে যায়। রাত ১২টার দিকে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে কামরুল জানায়, সে ষোলশহর দুই নম্বর গেটে রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরবে। এরপরও সে ফিরে না আসায় রাত ১২টায় তার মোবাইলে আবার ফোন করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নিহত ফোরকানের মা খুরশিদা বেগম জানান, গতকাল সকাল ৮টা ২১ মিনিটে ফোরকানের মোবাইলে ফোন করা হলে অন্য প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজের পরিচয় না দিয়ে বলেন, ফোরকানকে খুন করা হয়েছে। তার লাশ কবরস্থানের পশ্চিম পাশে একটি সেপটিক ট্যাংকের মধ্যে আছে। তাকে কে খুন করেছে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি চারজনের নাম বলে। ফোরকানের মোবাইল ফোন তার হাতে কেন- জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলে, ‘খুনের খবর দিয়েছি। এজন্য তোমাদের শোকর করা উচিত। এতো কিছু জানতে চাও কেনো।’ এ কথা বলার পর সে ফোনটি কেটে দেয়। একই সময়ে খুলশি থানায় ফোন করে এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ষোলশহর এলাকায় দুই কিশোরের লাশ পড়ে থাকার খবর দেয়।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ষোলশহর মোড় সংলগ্ন কবরস্থানের পশ্চিম পাশে একটি খালি প্লটের ভেতরে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে লাশ দু’টি পড়ে আছে। পুলিশ প্রথমে কামরুলের এবং পরে ফোরকানের লাশ উদ্ধার করে। দু’জনেরই হাত, পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখ কালো কাপড় দিয়ে পেঁচানো ছিল। দু’জনেরই পায়ের রগ কাটা ছিল। এছাড়া ফোরকানের শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে মাংস কেটে নেয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে সিএমপির সহকারী কমিশনার (পাঁচলাইশ জোন) দীপক জ্যোতি খীসা ইত্তেফাককে বলেন, এই হত্যাকাণ্ড দলীয় কোন্দল না ব্যক্তিগত বিরোধের জের, সে সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। বিষয়টি তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পরীক্ষা দেয়া হলো না কামরুলের
বাবা মায়ের অভাবের সংসার। অনেকটা নুন আনতে পানতা ফুরানোর মত অবস্থা। তা সত্ত্বেও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন জ্যোস্না বেগম। তার স্বামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্ন বিভাগে কাজ করেন। তার সামান্য আয়ে পরিবারের সদস্যদের অন্ন সংস্থান হতো। এর পাশাপাশি কামরুলের পড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো তাদের। কামরুল এবছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। কয়েকদিন আগে ছেলের পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করার জন্য স্থানীয় এক স্বর্ণের দোকান থেকে সুদে ১২ হাজার টাকা ধার করেন মা। কিন্তু কামরুলের আর পরীক্ষা দেয়া হলো না।
