কুমারখালির ছেঁউড়িয়ায় লালন উত্সবের তৃতীয় দিন গতকাল সোমবার আখড়াবাড়ির আঙিনা মানব মিলন উত্সবে পরিণত হয়। ফকির লালন সাঁইয়ের দোল উত্সব সম্পর্কে উত্সবে আসা লালন গবেষক ড. অনুপম হাসান বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই জাতবিভেদ বিশ্বাস করতেন না। কর্মের মধ্য দিয়েও তিনি তা প্রমাণ করেছেন। সাঁইজি তার জীবদ্দশাতেই ফাল্গুনের শুভ পূর্ণিমা তিথি বা সৌর ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এ উত্সবের আয়োজন করতেন। একালে সাঁইজির ভক্তকুল দোল উপলক্ষে তার মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে গান, সাধুসঙ্গ, অধিবাস, যুগলান্ন প্রভৃতি অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে। তিনি বলেন, আমরা জানি, লালন ভক্তবৃন্দের কোনো বিশেষ ধর্ম-বর্ণ কিংবা জাত-পাতের বিভেদ নেই। ফলে দোল-উত্সব উপলক্ষে সারাদেশের বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষ ভিড় করেছে।
তিনি বলেন, দোলপূর্ণিমায় উত্সবের আয়োজন করে ফকির লালন সাঁইজি হিন্দু-মুসলিম শুধু নয়; সব ধর্মের-সম্প্রদায়ের মানুষকেই একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ধর্মের চেয়ে সাঁইজির নিকট ছিল মানুষ বড়; ধর্ম কিংবা জাত-পাতের মধ্য দিয়ে নয়, ঈশ্বরকে পেতে হলে, তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে জানা দরকার—সুপথের সন্ধান।
ফকির মালেক শাহ বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মহাগুরুর ধামে দোল উত্সবে আসি। যতোদিন বাঁচবো আসবোই।
লালনের মূল মাজারের সামনে মরা কলী নদীর তীরে স্থায়ী লালন মঞ্চে প্রতিদিন রাতভর চলছে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীত। সরকারিভাবে বানানো মূল মঞ্চে প্রকৃত বাউলদের খুব একটা দেখা মেলেনি। তবে মূল মঞ্চে কে এলো আর না এলো, কে কতো বড় আর ছোটো এতে আগত সাধুদের কোনো যায় আসে না। তারা সব সময় সাঁইজির ধামে ধ্যানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গতবারের তুলনায় এবার খেলাফতপ্রাপ্ত সাধু-গুরুদের আখড়াবাড়িতে সবচেয়ে বেশি আগমন ঘটেছে। সারারাত নির্ঘুম সাধু ভক্তরা সাধুসঙ্গ আর মহাগুরু সাঁইজির স্মরণে ধ্যান করছেন। খুব সকালে সাঁইজি দরবারে ভক্তি পর্ব শেষে তারা চাল-জল নিয়ে স্নান করছেন কলী নদীতে। এরপর সেরে নিচ্ছেন বাল্য সেবা (সকালের নাস্তা)। পাশাপাশি ভক্তদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আস্তানায় আসনে বসে লালন সাঁইজির গান দিয়ে আরাধনায় ব্যস্ত থাকছেন তারা।
বাউল আকবর ফকির বলেন, সাঁইজি লালনের আচার-আচরণ ও বক্তব্যে সমকালের মানুষ ধাঁধায় পড়েছিলো তার জাতিত্ব নিয়ে। জাতগর্বী সেইসব মানুষের কাছে জাত ধর্মই ছিলো মানুষের বড় পরিচয়। লালনও বহুবার তার জাত ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছেন। সামপ্রদায়িক জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন এর সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। বলেন, তিনি হিন্দু না মুসলমান- এ প্রশ্ন তার কাছে অর্থহীন। কেননা ‘ যাওয়া কিংবা আসার বেলায় জেতের চিহ্ন রয় কার রে’। কথা বলতে বলতেই বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তিনি গেয়ে ওঠেন ‘সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন। লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান’/ ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন কয় জেতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে’/।
জাহাঙ্গীর নগর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিজা সামস লালন ভূমিতে এসেছেন এই প্রথম। আগত সাধু ভক্তদের দেখে তিনি বলেন, ইতিপূর্বে শুধু টেলিভিশনেই দেখেছি। এবার সাঁইজির ধামে এসে ধন্য হলাম। তিনি বলেন, বাংলার মাটি বাউল রসে সিক্ত। রবিবার রাতে লালন একাডেমির আয়োজনে কলী নদীর তীরে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ কুমারখালি খোকসা আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রউফ।
