জার্মানিতে পড়াশোনা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ১৮:৩৪
জার্মান সরকার শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিশ্বের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ হয়ে থাকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুষদে। বিগত ১৫ বছরে জার্মানি বিদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার নিয়মেও অনেক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষায়িত বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান চালু করেছে যেখানে তারা মানসম্পন্ন বেশকিছু বিষয় পড়িয়ে থাকেন। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি ও ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি রয়েছে জার্মানিতে। জার্মান সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যাতে বলা হয় জার্মানিতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা পড়াশুনার পাশাপাশি আগের তুলনায় বেশি সময় কাজ করার সুযোগ পাবেন। যা তাদের শিক্ষা ব্যয়ভার মেটাতে সাহায্য করবে। পড়াশুনা শেষ করে একজন ছাত্র বা ছাত্রী চাকরি খোঁজার জন্য ১৮ মাস পর্যন্ত নতুন ভিসা পাবে। জার্মানি নিরাপত্তার দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ স্থান। সহজ ও উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম ও জীবনযাত্রার মান এবং সহজেই জার্মান থেকে ইউরোপের অন্য দেশে সুযোগ করে নেবার সুবিধা দেশটিকে করে তুলেছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের উপর নির্ভর করবে আপনার সমগ্র ব্যয়। তবে আশার কথা এই যে জার্মানির বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার খরচ দেশটির সরকার বহন করে এবং দেশের শিক্ষার্থীদের মত বিদেশি শিক্ষার্থীরাও বিনা খরচে শিক্ষার সুযোগ পায়। জার্মানিতে মোট ১৬টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে যার ভিতরে ১৪টিতে সরকার শিক্ষা ব্যয় মউকুফ করেছে। নিচে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযোগী বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হল— ফ্রী ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন: বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৮৭ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে সমৃদ্ধ সমাজ বিজ্ঞান, মানবিক ও গবেষণা অনুষদ। কর্তৃপক্ষ আশা করছে খুব দ্রুত তারা তাদের মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি ছাত্রছাত্রী পাবে। লুদভিক ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ: জার্মানির পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটি একটি। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটিরও রয়েছে শক্ত অবস্থান। মোট ১০০টির বেশি শিক্ষা বিভাগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষার্থীর ১৫ ভাগই বিদেশি। এখানে বেশ কয়েকটি বিভাগ যেমন ব্যবসায়, ব্যবস্থাপনা, মনোবিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়গুলো ইংরেজিতে পড়ার সুযোগ রয়েছে। উল্ম ইউনিভার্সিটি: এই ভার্সিটিতে বেশকিছু বিষয় রয়েছে যেখানে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজিতে মাস্টার্স করতে পারে। এসব বিষয়গুলো হলো, অ্যাডভান্সড ম্যাটারিয়াল্স, অ্যাডভান্সড অনকোলজি, কম্যুনিকেশন টেকনোলজি, এনার্জি সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, ফিন্যান্স এন্ড মলিকিউলার সাায়েন্স। শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করারও সুযোগ রয়েছে এখানে। হাইডেলব্যার্গ ইউনিভার্সিটি: হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউট দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক চর্চার জন্য বিখ্যাত। এখানে পড়ানো হয় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষা যেমনঃ বাংলা, হিন্দি, উর্দু, তামিল। হয় সংস্কৃতের চর্চাও। জার্মানিতে হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ই সর্বপ্রথম। সব মিলে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ১২টি অনুষদ। এর সঙ্গে রয়েছে তিনটি গ্রাজুয়েট স্কুল। এই স্কুলগুলো আসলে তিনটি বিভিন্ন গবেষণাগার। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স এবং জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে প্রায় ২৮ হাজার ছাত্রছাত্রী। বিদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি অর্থাত্ ১৮ শতাংশ। সমগ্র খরচ ও বৃত্তির সুযোগ: প্রথমেই বলা হয়েছে সরকারি স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তরের জন্য কোনো টিউশন ফি নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ এবং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জন্য প্রতি সেমিস্টারে ৪০০ থেকে ৭২০ ইউরো নেয়া হয়। আবাসন ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যয়ের জন্য সরকারি হিসাব অনুসারে আপনার প্রতিমাসে প্রয়োজন ৫০০ ইউরো। জার্মানিতে চিকিত্সা বীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক। এর জন্য আপনার প্রতি চার মাস অন্তরে প্রয়োজন ৭০ ইউরো। সবমিলে বলা যায়, এ সকল দিক দিয়ে জার্মানি বেশ ব্যয়বহুল। তবে আশার কথা এই যে, জার্মান সরকার বিদেশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বেশকিছু বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। যেমন ডিএএডি প্রতি বছর ১৩০০ ভারতীয় শিক্ষার্থীকে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দেয়। জার্মানিতে পড়তে আসা যেকোনো অসচ্ছল শিক্ষার্থী এ সকল বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। এ বিষয়ে উল্ম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ছাত্রী ফাহমিদা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ডয়েশল্যান্ড স্টিপেন্ডিয়ুম নামে বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিলাম। তবে প্রথম বছর সেটা না পেলেও দ্বিতীয় বছর পেয়েছি। এছাড়াও যে সকল প্রতিষ্ঠান দরিদ্র ও অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকেন তাদের মধ্যে রয়েছে— কনরাড আডেনাওয়ার ফাউন্ডেশন, হাইনরিশ ব্যোল ফাউন্ডেশন, ফ্রী ডরিশ এবার্ট ফাউন্ডেশন, বোরিংগার ইংগেলহাইম ফাউন্ডেশন ইত্যাদি। মডেল: রাজ, ইভান, সাকিলা, মারিয়া। ছবি: তানিম আবেদন প্রক্রিয়া জার্মানিতে আবেদনের জন্য মূলত প্রয়োজন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের নির্দিষ্ট অনুষদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন। আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা এখনো বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহারের বিষয়ে অনেক পিছিয়ে। তারা মূলত বিভিন্ন এজেন্সির সহযোগিতা নিতে বেশি আগ্রহী। সবার প্রথমেই আপনাকে সাহায্য নিতে হবে ইন্টারনেট থেকে। প্রথমে সব ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটগুলোর তালিকা করুন। যখন আপনি আপনার খরচ, বিষয় ও আবাসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাবেন তখন আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হবে। আবেদনের নিয়ম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রকম হলেও এর নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব পেজে পাওয়া যাবে।