আমার শৈশবের খুব সামান্য সময়ই কেটেছে বাংলাদেশে। স্বাধীনতার পরে, বয়স তখন শিশু শ্রেণিতে পড়ার; খুলনায় খালার বাড়ি আসি বেড়াতে, গোঁ ধরি এখান থেকে যাবো না। খালু ভর্তি করে দেন স্কুলে, ক্লাস ওয়ানে। খালাত ভাই-বোনদের সঙ্গে খুব আনন্দে কাটে
কিছু দিন। তারপর মায়ের জন্য মন অস্থির হয়ে ওঠে, শেষমেশ ৬ মাস না যেতেই লোক এলো আমাকে নিতে। এক দিকে মা-বাবার কাছে ফেরার আনন্দ, আর এক দিকে খালাবাড়ির আপনজনদের মায়ায় জড়িয়ে কষ্টের কান্না।
আমার জন্ম কলকাতার হাওড়া ব্রিজের ওপাড়ে—হাওড়া জেলার মুনশিরহাট। আমাদের বাড়িই মুনশিবাড়ি। আমাদের বাড়ির নামে হাট, রেলস্টেশন, পোস্ট অফিস- সবই
বাবামায়েরই নয়, বাবা-চাচাদের, মানে বংশের প্রথম সন্তান আমি। তাই আদরের আধিক্যটা ছিলো সীমাহীন। স্বজনরা এবং গ্রামের পড়শিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেতো আমাকে কোলে নেবার জন্য। আমার শরীর,এবং চেহারা ছিলো সবার কাছেই আদরযোগ্য। আর বাবা আমাকে ছেলেদের পোশাকে রাখতেন। এজন্য একটু দূরের জনরা আমাকে দেখেই বলতো, অই যে মুনশিদের সুন্দর ছেলেটা যাচ্ছে—। প্রথমে ভরতি হলাম ঘোষপাড়ার স্কুলে, তারপর চিন্তামনি হাই স্কুলে। পরে আরো ভালো স্কুল ডোমজুড় ঝাপড়দহ বালিকা বিদ্যালয়ে।
বাবা চাচারা বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত । আবার সাহিত্যশিল্পেরও সমঝদার ছিলেন। চাচারা চাইতো আমি গানে-আবৃত্তিতে-ডিবেটে; মানে সব বিষয়ে সেরা হয়ে ঊঠি।
পরীক্ষাতে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করি, আবৃত্তিতেও সবার সেরা, অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করি। সবাই আমাকে ভালবাসে, মুল্যায়ন করে।
এদিকে সেজো চাচা বের করে প্রভাতী নামের ছোটদের চম?কার পত্রিকা। বলে, লেখ, তুই খুব ভালো লিখতে পারবি। বাবা কলকাতা থেকে দেব সাহিত্য কুটীরের মজার ছবিঅলা বইপত্র, সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু, আবোলতাবোল, হজবরল আর চাঁদ মামা, কিশোরভারতী, সন্দেশ, কিশোরমন, আনন্দমেলা—- এমন কত পত্রিকা কিনে আনেন।
ওগুলো পড়ি আর ভাবি—আমিও লিখবো। সত্যি সত্যি একদিন লিখে ফেলি একটা কবিতা ; নেতাজীকে নিয়ে। সবাই তারিফ করলো, চাচারা বললো তুই কবি হয়ে গেছিস। নেতাজী ছাপা হল ঘরের পত্রিকা প্রভাতীতে। এরপর শুধুই লিখেছি। গল্পও লিখতে শুরু করি। বেশ ভালো লাগে সবাই লেখক ভাবছে বলে। এদিকে বাংলাদেশ, বিশেষকরে বঙ্গবন্ধু আমার প্রিয় প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে । লিখি, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহি—ওখানকার পত্রিকা আমার লেখা ছাপায়, অবশ্য তা ছাপা হয়, খালাতভাই ফারুক নওয়াজের মাধ্যমে।
এরপর তো বাংলাদেশ আমার আপন দেশ হয়ে যায়। লিখি সব কাগজেই, বইও বের হচ্ছে। এখন না লিখে থাকতে পারি না। এই লেখালেখিটা, বিশেষ করে আমার গল্পটার
প্লট বেশি পাই নানাবাড়ির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশ। কতদিন যে যাইনি সেখানে। কিন্তু আমার মনে সেই পরিবেশ আর প্রিয়জনদের মুখ নিত্য দোল খায়।
আমার নানাবাড়ি—শান্তিনিকেতনের কাছে, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার লাল মাটির গ্রাম খাঁজি । ছোট্ট রেললাইন, ছোট্ট রেলগাড়ি । গরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি, পালকি, সাঁওতালদের ছেলেরা মোষের পিঠে চড়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে—- এখনো ভাসছে চোখে। আমাদের বাড়িতে কাজ করতো সাঁওতাল ছেলে খ্যাচা, লুলু। হাতের কী নিরিখ! এক ঢিলে উড়ন্ত চিল নামিয়ে আন তো। কী বিশ্বস্ত ছিল তারা। আমার গল্পে তারা বার বার নায়ক হয়ে আসে। আমি লেখক হয়ে ওঠার জন্য ঋণী আমার বাবা এবং কাকাদের কাছে। জীবনের এক বিশেষ পরবে এসে সহায়তা পেয়েছি দাদাভাই, কথাশিল্পী বিপ্রদাশ বড়ুয়া, ফারুক নওয়াজ এবং আমার প্রকাশকদের কাছে। পেয়েছি ইউনিসেফ প্রণীত মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড—শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, মানকুমারী বসু পুরস্কার, ফিলিপ্স-সাপ্তাহিক ২০০০ সেরা দশ গল্প পুরস্কার ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে, কিশোর কবিতা; খোকার কাছে চিঠি, স্বপ্ন আমার রঙিন ঘুড়ি। কিশোরগল্প; লুলুর ফিরে আসা, পাখিমানুষ, শেয়াল রাজা হতে চেয়েছিল, জিজোর ভাই জয়বাংলা, মায়ের কথা না শুনলে, জোছনা রাতের ফেরিওলা, সোনার মেয়ে নয়নতারা ইত্যাদি, এবং জীবনি-গ্রন্থ; মাদার টেরিজা। বড়দের গল্প-বই এবছর বেরিয়েছে। নাম—মাজু কবিরাজের চতুর্থ স্বপ্ন।
লিখে যাবো শেষ অবধি। ছোটদের জন্য ডান পিটে নামে একটি পত্রিকাও বের করি। বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ছোতদের এবং মেয়েদের জীবনায়নে অনেক কাজ করার ইচ্ছা। করে যাচ্ছি, ইচ্ছা আলর দিকে যাওয়ার। জানি না কতদূর জেতে পারব।
