ছোট বড় সব উদ্যোক্তার দাবি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৯
সুমন মিয়া তালাচাবির কারিগর। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাবো চৌরাস্তায় দেখা মেলে তার। ভ্রাম্যমাণ, তথাপি কাজের কমতি নেই। যা-ই আয় করে তাতেই সন্তুুষ্টি। রাজনীতি নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই তার। নিজের কাজ নিজে করেন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। দেশের বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষেরই প্রতিনিধি সুমন মিয়া। তার যেমন রাজনীতি নিয়ে মাথাব্যথা নেই, তেমনি সরকারেরও মাথাব্যথা নেই তাকে নিয়ে। তার মতই জীবনধারণের জন্য কিছু একটা করার সংগ্রামে ব্রত রয়েছে এদেশের অসংখ্য মানুষ; যাদের পেছনে সরকারের কোন সহায়তা নেই। অথচ সরকারের নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে বিশাল এই জনগোষ্ঠী নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে সরকারকেই বরং সহায়তা করছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজের কাজের সুযোগ ঘটে, তেমনি একটি পরিবার বেঁচে যায়। সহায়-সম্বলহীন পরিবারের সন্তানরাই সাধারণত এধরনের কাজ করে থাকে। সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষ বিশাল ‘অর্থনৈতিক ভাঙ্গনের কবল থেকেও রাষ্ট্রকে রক্ষা করে চলেছে। স্বউদ্যোগী লোকগুলো ধন্যবাদার্হ। এধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে কোটিপতি হওয়ার নজিরও আছে। বিশিষ্ট গবেষক শাহীনউল আলম শেখ বলেন, ক্ষুদ্র আর বৃহত্ বলে কিছু নেই। উদ্যোগটাই বড়। যারা এধরনের ব্যবসাপাতি করে চলেছেন, তাদের দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া উচিত। বিশেষত যারা ৫/৭ বছর ধরে একই কাজ করছেন তাদের সম্ভাবনা খুঁজে বের করে অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। কর্মক্ষম অথচ বেকার লোকদের গুচ্ছভিত্তিক স্বল্প ঋণ সুবিধা দিয়ে এধরনের আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার। এতে অসংগঠিত এ খাত সংগঠিত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর সঠিক প্রতিফলন ঘটবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটাতে পারলে দ্রুততার সঙ্গেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তখন সরকারের দরকার হবে শুধু ‘কানেকটিভিটি’ বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়া। কারণ, বর্তমানে বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশই সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইএমএফ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন জিডিপি’র আকার বিবেচনায় বিশ্বের ৪২তম অর্থনীতি। মোট বাণিজ্য প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অর্জন একটি নীরব বিপ্লব হিসেবে ধরা পড়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার কাছে। এর মূলে রয়েছে এদেশের সৃজনশীল জনসম্পদ। আর উদ্যমী উদ্যোক্তা। এদেশের ১৬ কোটি মানুষের ৬০ শতাংশই পূর্ণ কর্মক্ষম। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই কর্মক্ষম বিশাল জনশক্তিই বাংলাদেশের বড় সম্পদ। দেশের উন্নয়নে দৃঢ়সংকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ জনশক্তিকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। তাই রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আর কোন সহিংসতা কিংবা অনিশ্চয়তা দেখতে চান না উদ্যোক্তারা। মতিঝিলের হকার তারা মিয়া থেকে শুরু করে বড় উদ্যোক্তারা চান রাজনৈতিক স্থিতি। তাতে তাদের আয় বাড়ে। তাদের আয় মানেই দেশের আয়। এফবিসিসিআই’র সাবেক ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে দেশ এগিয়ে যাবেই। রাজনীতি হতে হবে অর্থনীতি কেন্দ্রিক। বিশ্বব্যাপী অনেক আগেই অর্থনৈতিক কূটনীতি শুরু হয়েছে। তাই অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করা উচিত। তাতে তারাও দেশ পরিচালনায় সফল হবেন। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সকলের স্বপ্ন পূরণ হবে।