সংসদ বর্জন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের আহ্বান

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২২:৫০
নবম জাতীয় সংসদের (২০০৯-২০১৩) পুরো মেয়াদে ১৯টি অধিবেশনে মোট ৪১৮ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধীদল ৩৪২ কার্যদিবস বা ৮২ শতাংশ সময় সংসদ বর্জন করেছে। আর প্রধান বিরোধীদলের নেতা মাত্র ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ সময় উপস্থিতির মাধ্যমে সর্বনিম্ন উপস্থিতির নতুন রেকর্ড করেছেন। তাই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নবম জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর টিআইবি’র পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা প্রতিবেদন ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, নবম সংসদে কোরাম সংকটের কারণে গড়ে ৩৬ মিনিট হিসেবে ২২২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট অপচয় হয়েছে। পূর্ণ-মেয়াদে কোরাম সংকটের মোট অর্থমূল্য প্রায় ১০৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। তবে নবম সংসদে সদস্যদের গড় উপস্থিতির হার অষ্টম সংসদের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দশম জাতীয় সংসদ বিষয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে সংসদে নামে বিরোধী দল রয়েছে। তারা কোনো ভূমিকা পালন করছে না। তবে বর্তমান সংসদের এই ব্যতিক্রমী রূপ সাময়িক এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেও মনে করছেন তারা। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম. হাফিজউদ্দিন খান, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রমুখ। প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার। বর্তমান সংসদের প্রেক্ষিতে বিরোধীদলের সংসদ বর্জন প্রতিরোধে আইনের প্রয়োজন আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় পার্টি আক্ষরিক অর্থে বিরোধী দল। তাদের ভূমিকা বাস্তবে অনুধাবন করতে পারি না। বিরোধীদলের উচিত তাদের ভূমিকা ও অবস্থান স্পষ্ট করা। এই সংসদ সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী হবে না বক্তব্যের যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, দশম নির্বাচনের আগে তত্কালীন সরকারি জোট বলেছিলো ২৪ জানুয়ারির পর একাদশ সংসদের নির্বাচনের জন্য আলোচনা করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা শুধু তা-ই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তবে নির্বাচন কবে কখন হবে তা আমরা জানি না। একই প্রশ্নের জবাবে এম. হাফিজউদ্দিন খান বলেন, জাতীয় পার্টি নামে মাত্র বিরোধী দল। এই বিরোধীদলের কাছে কেউ কিছু প্রত্যাশা করতে পারে না। টিআইবির সুপারিশ হলো সংসদকে কার্যকর করতে হবে। এজন্য প্রকৃত বিরোধীদল দরকার। প্রতিবেদন অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা প্রথম সংসদে ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। নবম সংসদে ১৯টি অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যয়িত মোট সময় ছিল ১৩৩১ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট। প্রতি কার্যদিবসে গড় বৈঠক-কাল ছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট। যা অনেক গণতান্ত্রিক দেশের সংসদের মেয়াদের তুলনায় অনেক কম। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নবম জাতীয় সংসদে আইন পাসে গড় সময় কম, সংসদ বর্জন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে আলোচনা না হওয়া, অসংসদীয় ভাষার বারবার ব্যবহার, কোরাম সংকট বৃদ্ধি, বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার অভাব নেতিবাচকভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ় ও সংসদকে কার্যকর করতে প্রতিবেদনে ২১ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। ‘টিআইবির বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ও পক্ষপাতমূলক’ এদিকে টিআইবি’র প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংসদ কার্যকরের বিষয়ে তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা পক্ষপাতমূলক। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের মতোই ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে গঠিত জাতীয় সংসদে বিরোধীদল ৭০ দিনের জন্য সংসদে এসেছে। কাজেই টিআইবি’র এ ধরনের বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত। গতকাল সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মেরিট লুন্ডেমোর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রওশন এরশাদের প্রতিবাদ ‘সংসদে বিরোধীদল নেই’- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, টিআইবি ঢালাও বক্তব্য দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, জাতীয় পার্টি (জাপা) কার্যকরভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। বিবৃতিতে রওশন এরশাদ আরো বলেন, সংসদ অধিবেশনের দিকে তাকালে সহজেই অনুমেয় যে, বিরোধী দল হিসেবে জাপা সক্রিয়। টিআইবির এই ধরনের ঢালাও ও দায়িত্বহীন মন্তব্য মেনে নেয়া যায় না।