ঝঞ্ঝার মতো ছুটছে বাংলাদেশ

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২২:০৫
তখনও হাতে আছে ২৬ বল, ৮ উইকেট; জয়ের জন্য দরকার একটি মাত্র রান। আগের বলেই চার মেরে স্কোর সমান করা সাকিব এ বলে রান নিলেন না। নিশ্চিত সিঙ্গেল অবহেলা করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন—বড় শটে জয় নিশ্চিত করবেন। ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে একজন চিত্কার করে উঠলেন—এটা পরিষ্কার ঔদ্ধত্য! পরের বল। এবার জায়গামতো পেয়ে গেলেন। খুব শক্তি দিয়ে নয়, এবারও খানিকটা অবহেলা ভরেই তুলে মারলেন; বল সোজা বাউন্ডারি লাইন পার হয়ে আছড়ে পড়ল—ছক্কা! এবার ধারাভাষ্য কক্ষের অন্য ধারাভাষ্যকারের চিত্কার করে ওঠার পালা—এটা ঔদ্ধত্য নয়, বীরত্ব। সে আপনি ঔদ্ধত্য বলুন বা বীরত্ব বলুন; সাকিব আল হাসানসহ পুরো বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় যে একটা অন্যকিছু ভর করেছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ছোট দল বা অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশ এই প্রথম খেলছে না। এর আগেও এই পর্যায়ের দলগুলোর সঙ্গে ঢের ক্রিকেট খেলেছে; হেরেছে-জিতেছে; কিন্তু এমন খুনে চেহারার বাংলাদেশকে পর পর দুই ম্যাচে যে কখনোই দেখা যায়নি, সেটা দিব্যি করে বলা যায়। প্রথম ম্যাচে অনেক হাওয়ার গুঞ্জন তৈরি করা আফগানিস্তানকে বল হাতে গুঁড়িয়ে দেয়ার পর ব্যাট হাতে ছেলেখেলা করা। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের রানটা একটু সম্মানজনক হলেও দেশটির বোলারদের একেবারে গলির বোলার বানিয়ে ফেললেন সাকিবরা। নিশ্চয়ই করে এর কোনোটাই প্রতিপক্ষের প্রতি অবমাননা নয়। বরং নিজেদের দাপট ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যবধানটা আরও পরিষ্কার করে দুনিয়াকে জানিয়ে দেয়াই এই খুনে চেহারার সার্থকতা। বাংলাদেশ এই চেহারা ধারণ করায় একটা বার্তা অন্তত আইসিসির কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলে ভক্ত-সমর্থকরা মনে করছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে এই দাপুটে জয়ের পরই সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে অনেকেই পরিষ্কার বললেন—এবার অন্তত আইসিসি বুঝবে, বাংলাদেশের জায়গা বাছাইপর্বে নয়। হ্যা, এটা নিশ্চয়ই জরুরি বার্তা। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়েকে এক পাল্লায় উঠিয়ে আইসিসি স্বাগতিক দলকেও সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাছাইপর্ব খেলতে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা কদিন আগেও নিউজিল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নাকাল করেছে, আগের এশিয়া কাপেরই ফাইনাল খেলেছে, এরকম একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের জন্য নিশ্চয়ই এটা অবমাননাকর। টানা দুই ম্যাচে সহযোগী দেশ দুটিকে ৯ ও ৮ উইকেটে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার একটা জবাব দেয়া হল বৈকী! এই জবাব দেয়াটা অবশ্যই অনুমান। এরকম আরও অনুমান আমরা করতে পারি। ভাবতে পারি এশিয়া কাপের ব্যর্থতা ভুলতে, আফগানিস্তানের বিপক্ষের হারের যন্ত্রণায় মলম লাগাতে, কাছে গিয়ে গিয়ে এক গাদা পরাজয়ের স্বাদ ভুলতেও ক্রিকেটাররা এমন মরীয়া হয়ে উঠেছেন। আমরা ভাবতে পারি, মাঠের বাইরে ক্রিকেটারদের নিয়ে যে আলোচনার ঝড় উঠেছিল, তার জবাব দিতে এই খুনে চেহারায় এসেছেন ক্রিকেটাররা। তবে এ সবই অনুমান; এবং অনুমানগুলো ভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। বরং এ প্রসঙ্গে ক্রিকেটারদের ব্যাখ্যা শোনাটাই ভালো। ক্রিকেটাররা ঠিক এই খুনে চেহারার ব্যাখ্যা দেননি। তবে আগের দিন ক্রিকইনফোকে দেয়া ভিডিও সাক্ষাত্কারে মাশরাফি বিন মুর্তজা ও আব্দুর রাজ্জাক যা বলেছেন, তা শুনলে খানিকটা বোঝা যাবে বাংলাদেশের এই দাপুটে চেহারার রহস্য। মাশরাফি যেমন বলছিলেন, এই বাছাইপর্ব খেলা, না খেলার ওপর তাদের হাত নেই। তাই এখানে যারা প্রতিপক্ষ তাদের বিপক্ষে জয় পাওয়া নিশ্চিত করতেই দাপট দেখানোর বিকল্প নেই, ‘এটাই আসলে নিয়ম করা হয়েছে। ফলে আমাদের কিছু করার তো নেই। তবে অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর বিপক্ষে খেলাটা একটু বাড়তি বিপদের। প্রত্যাশা থাকে সবার, জিততেই হবে। আবার ওদের সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারণা থাকে না, খুব বেশি খেলা দেখার সুযোগ থাকে না। তাই নিজেদের সেরা খেলাটা খেলাই এখানে সহজ উপায়। ব্যাটে-বলে সর্বোচ্চটা দেখানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।’ এই একই সুরে কথা বলছিলেন আব্দুর রাজ্জাকও। তার মতেও এসব ম্যাচে খুব রিল্যাক্স থেকে একটু দাপট দেখানোটাই সমাধান। নইলে চাপ এসে চেপে ধরার ভয় থাকে, ‘আসলে এসব ম্যাচে আপনি যদি একবার চাপটা নেন, তাহলে মারাত্মক চাপেই পড়ে যাবেন। কারণ প্রত্যাশার একটা ব্যাপার থাকে, নিজেদের প্রমাণের ব্যাপার থাকে। তাই এসব চাপ না নিয়ে রিল্যাক্স থেকে নিজেদের খেলাটা খেলে যাওয়াই একমাত্র উপায়। সেটাই করেছি আমরা।’ তবে কারণ যাই হোক, বাংলাদেশ যে কাজটা করতে পেরেছে, তাতে সন্দেহ নেই। আজ হংকংয়ের বিপক্ষে কী হবে, সেটা সময় বলবে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দাপট দেখানোয় শতভাগ মার্ক নিয়ে পাস করেছে। আর এই ধারাটা ধরে রেখে সুপার টেনে খেলতে পারলে, তার যে একটা সুফল আসবে, সেটাও মাশরাফি দিব্যি বুঝতে পারছেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচগুলো খেলাটা আমাদের জন্য খুব কাজে দিচ্ছে। কারণ, আমরা মূল টুর্নামেন্টে যদি সবগুলোই এরকম দাপুটে জয় নিয়ে যেতে পারি, সেটা অসাধারণ ব্যাপার হবে। কারণ, টি-টোয়েন্টিতে মোমেন্টামটা একটা বড় ব্যাপার। সেটা নিয়ে সুপার টেনে গেলে অনেককিছুই হতে পারে। নিজেদের মাটিতে খেলা, আমাদের সঙ্গে থাকবে টানা জয়ের আত্মবিশ্বাস; ব্যাপারটা খুব মজার যে হবে, তাতে সন্দেহ নেই।’ সেই মজাটা দেখাতে পারলে একইসঙ্গে টুর্নামেন্টের পরিকল্পনাকারীদের মুখ যে আরও একটু কালো করে দেয়া যাবে, সেটাও নিশ্চিত। সেই কালো মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকবে পুরো বাংলাদেশ।