ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে মুরগি ও মাছের খাবার। একশ্রেণীর অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এই খাবার তৈরি করে মুরগির খামারি ও মাছ চাষীদের কাছে বিক্রি করছেন। রাজধানীর হাজারীবাগ ট্যানারীর কাছে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এই খাবার তৈরির কারখানা। গতকাল বুধবার মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে এই কারখানার সন্ধান পায় ও প্রায় তিন হাজার বস্তা খাবার জব্দ করে। পরে মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে কারখানাটিতে তালা ঝুলিয়ে দেয় কোর্ট।
র্যাব-৪ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আরিফুর রহমান ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আলামিন-এর নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট মকবুল আহমেদের মালিকানাধীন মুরগি ও মাছের খাবার তৈরির ওই কারখানায় অভিযান চালায়। তারা দেখতে পায় ট্যানারির কাঁচা চামড়ার বর্জ্য সংগ্রহ করে ঐ কারখানায় মুরগি ও মাছের খাবার তৈরি হচ্ছে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দুই গবেষক উপস্থিত ছিলেন। তাদের একজন ড. আবুল হোসেন কারখানার জব্দকৃত মুরগি ও মাছের খাবার পরীক্ষা করে বলেন যে ট্যানারীর বর্জ্যে তৈরি এই মুরগি ও মাছের খাবারে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ‘ক্রোমিয়াম’ (এক ধরণের ভারী ধাতু) রয়েছে। পরে মোবাইল কোর্ট কারখানা থেকে ৩ হাজার বস্তা মুরগি ও মাছের খাবার জব্দ করে কারখানাটি সিলগালা করে দেয়। এ ঘটনায় প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. লুত্ফর রহমান বাদি হয়ে কারখানার মালিক মকবুল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
জানা গেছে, মুরগী ও মাছের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রতি কেজির দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা । আর ট্যানারীর বর্জ্যে তৈরি প্রতি কেজি খাবারের দাম মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা। কম পয়সায় অধিক মুনাফার আশায় লোভী মুরগির খামার মালিক ও মাছ চাষীরা এই বিষাক্ত খাবার কিনে থাকেন।
এদিকে ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি মুরগি ও মাছের খাবার নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন ও অধ্যাপক ড. ইমরান কবির চৌধুরী। তারা জানান, গবেষণায় এ ধরণের খাবারে মাত্রাতিরিক্ত ‘ক্রোমিয়াম’ পাওয়া গেছে। ওই বর্জ্য থেকে প্রস্তুতকৃত খাবার থেকে ‘ক্রোমিয়াম’ মুরগী ও মাছের দেহের বিভিন্ন অংশে যেমন চামড়া , মাংস, যকৃত, হদপিন্ড, মস্তিস্ক ও হাড়ের ভিতরে জমা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, লাগাতার দুই মাস ওই বিষাক্ত খাবার খাওয়ানোর পর মাছ ও মুরগিতে ০. ৩২ মিলিগ্রাম হতে ৪ দশমিক ৫৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ‘ক্রোমিয়াম’ জমা হয়েছে। যা মানবদেহের সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশী। কোন মানুষ যদি তার জীবনকালীন সময়ে ক্রোমিয়ামযুক্ত দশ কেজি পরিমাণ মাংস কিংবা মাছ খান তাহলে কি পরিমাণ ‘ক্রোমিয়াম’ তার দেহে প্রবেশ করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত ‘ক্রোমিয়াম’ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ বিশেষ করে লিভার, কিডনি ও মস্তিস্কে জমা থাকে এবং ধীরে ধীরে ঐ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকার্যকর করে ফেলে। দেশে মরণব্যাধি বর্তমানে আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার এটাও অন্যতম কারণ বলে গবেষকরা জানান।
