কবিতা কোনো পেশা নয়, নেশা নয়, বিনোদন নয় কিন্তু এই সব কিছুর চেয়ে বেশি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কবিতা নিজেই একটা জীবনভাবনা, জীবন যাপনের ধরণ। চারপাশের এই ছোট্ট ভুবন এবং ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বের বিশাল মহাবিশ্বের সকল বিস্ময় যেন কবিতার মধ্যে ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথ একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশির বিন্দুকে কবিতায় তুলে আনেন তো জীবনানন্দ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরের আরো এক বিপন্ন বিস্ময়কে খোঁজেন কবিতার হাত ধরে। বিংশ শতকের ইংরেজ কবি ক্রিস্টোফার ফ্রাই যেন যথার্থই বলেন, ‘কবিতা হলো সেই ভাষা যেখানে মানুষ তার নিজের বিস্ময় আবিষ্কার করে।’ চিলির বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা কবিতাকে শান্তির ভাষা বলেন। অন্যদিকে কানাডার সমকালের গুরুত্বপূর্ণ কবি, গীতিকার, গায়ক, ঔপন্যাসিক লিওনার্দ কোহেন পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ‘কবিতা হলো স্রেফ জীবনের দলিল। যদি তোমার জীবনটা ভালোভাবে পোড়ে কবিতা শুধু তার ছাই।’ সমকালের মার্কিন কবি রিটা ডভ অবশ্য বলছেন, ‘কবিতা হলো ভাষার সবচেয়ে শুদ্ধতম ও শক্তিধর প্রকাশ।’ নানা মুনির নানা মত থাকবেই, আর কবিতা নিয়ে কবিদের মত বহুমাত্রিক হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা প্রতিটি মহত্ কবি ও কবিতা তার নিজ গুণেই আলাদা। সুমনের কথা ধার করেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘কে বেশি পাগল, কবি না কবিতা, দরকার নেই তার হিসাব নেবার।’ কবি ও কবিতা হিসাব নিকাশের ঊর্ধ্বে—এটা জানা কথা। তবু অনেকেই প্রশ্ন করে, কবিতার কী দরকার! কেউ কেউ শুধু প্রশ্ন করে ক্ষান্ত হয় না, আচারে-আচরণে কবিতার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসেন। বিশ্বব্যাপী কবি ও কবিতার প্রতি যেমন প্রেম ও অনুরাগের অভাব নেই, আবার কবি ও কবিতার গুরুত্ব নিয়ে অনেক শিক্ষিত (প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে)-দের মধ্যেও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সীমা নেই। আমি কবি নই, তবে কবি ও কবিতার সঙ্গ প্রেমী। ভালবাসি কবি ও কবিতাকে। সেই ভালবাসার দায় থেকেই কবিতার দায় নিয়ে কিছু বলতে চাই।
প্রথমে জানিয়ে রাখা ভালো, আমার মতে, কবি ও কবিতা কারও দায় মেনে চলে না, সেটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। পৃথিবীতে অবাধ স্বাধীনতা বলে যদি কিছু থাকে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে কবি ও কবিতা। এত মত এত পথের কথা শিল্পের আর কোনো মাধ্যমে নেই। কবিতা নানারূপে জ্বলে উঠেছে যুগে যুগে তার নিজস্ব আলোয়, আপন আনন্দে। সেই আনন্দের ভাগীদার প্রথমতই অবশ্যই কবিতা পাঠক, কবিতাপ্রেমী। একই কবিতা একেক পাঠকের হূদয়ে একেকভাবে আলোড়ন তোলে। প্রেমেন্দ্র মিত্র যখন বলেন—‘তারপরও কথা থাকে;/ বৃষ্টি হয়ে গেলে পর/ ভিজে ঠান্ডা বাতাসের মাটি-মাখা গন্ধের মতন/ আবছায়া মেঘ মেঘ কথা;/ কে জানে তা কথা কিংবা/ কেঁপে ওঠা রঙিন স্তব্ধতা।’ (কথা, প্রেমেন্দ্র মিত্র)। তখন প্রতিটি পাঠকেরই স্বাধীনতা থাকে এই ‘কথা’ কিংবা ‘রঙিন নিস্তব্ধতা’র নিজস্ব মানে তৈরি করে নেওয়ার। কবিতার সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব অথবা গুণই হলো এই স্বাধীন ভাবনার দরজা-জানালা খুলে দেওয়া। ছাইচাপা আগুনের মতো কবিতা তাই জ্বলে ওঠে বারবার আপন শক্তিতেই।
কবি ও কবিতার মধ্যে জ্বলে ওঠার শক্তি প্রবল ও তীব্র। কখনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ, কখনো রাষ্ট্রিক ভাবনা, কখনো বৈশ্বিক চেতনায় জ্বলে ওঠে কবিতা। কবিতার এই চেতনা ছড়িয়ে পড়ে প্রাণে প্রাণে। আফ্রো-আমেরিকান কবি মায়া এঞ্জেলো দৃঢ়স্বরে লেখেন ‘তবুও আমি জেগে ওঠি’ (Still I Rise)| তাঁর সেই কবিতা নিগ্রো নারীদের প্রতিবাদের স্বর হয়ে ওঠে—
‘You may write me down in history
With your bitter, twisted lies,
You may trod me in the very dirt
But still, like dust, I’ll rise.’
-Maya Angelou, Still I Rise
স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে কবিতার গুরুত্ব অপরিসীম। স্পেনের গৃহযুদ্ধে পিকাসোর গোয়ের্নিকার মতো লোরকার রক্তঝরা কবিতাসমূহই গণমানুষকে মুখরিত করেছে, আন্দোলিত করেছে। লোরকা জানতেন ফ্যাসিস্ট অপশক্তি তাঁকে হত্যা করবে, কিন্তু তাঁর কবিতাকে হত্যা করা যাবে না। ‘আমি যেমন জন্মাতে ভয় পাইনি তেমন মরতেও ভয় পাই না।’
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের একাধিক কবিতার উদাহরণ দেওয়া যায়। নজরুল তো ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাই পেয়ে গেলেন, ‘ভগবানের বুকে পদচিহ্ন’ এঁকে দেওয়ায় দুঃসাহস দেখালেন চির উন্নত বীর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কলকাতার দেশ পত্রিকায় ছাপা হলো মজলুম আদিবের কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা। পরাধীন সময়ে স্বাধীনতার জয়গান গাইলেন কবি শামসুর রাহমান মজলুম আদিবের ছদ্মনামের আড়ালে। কবিতা শুধু ভাবনা, চেতনা কিংবা বোধের স্বাধীনতা নয়, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, ভাষার স্বাধীনতার কথা বলে অকাতরে।
সেই বিবেচনায় কবিতা পাঠ সময়ের সাক্ষী হওয়ার সুযোগও করে দেয়। বোর্হেস যখন বলেন, ‘সত্য কেবল মাত্র তখনই নিজেকে প্রকাশিত করে যখন তা কবিতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়’—তখন আর বুঝতে বত্যয় ঘটে না যে, কবিতা সমকাল ও সত্যের ঊর্ধ্বে আমাদের নিয়ে যায়। কবিকে তাই বরাবরই সত্যদ্রষ্টা বলা হয়। ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ রোমান্টিক কবি জন কিটস তাই ‘ওড অন আ গ্রেসিয়ান আর্ন’ কবিতার শেষ দুই লাইনে এসে বলেন—‘‘সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর’ — এটাই সব/ এই পৃথিবীতে তুমি জানবে এবং যতটুকু জানার দরকার এটা সব।’
অনেক সময় অনেকেই হয়তো কবিতার দুর্বোধ্যতা কিংবা কবিতার সত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সচেতন পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, এই সব অভিযোগের একমাত্র জবাব, মনোযোগ। কবিতা স্বয়ং পাঠকের মনোযোগ দাবি করে। হেলাফেলা আর ছেলেখেলায় ভালোবাসা যায় না, কবিতা বোঝা যাবে কী করে! শুধু কবিতা কেন, চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা শিল্পের যেকোনো শাখা অনুধাবনে কিছুটা পঠন-পাঠন, মনোযোগ জরুরি। কবিতার ক্ষেত্রে তা অতি জরুরি। কেননা কবিতা শুদ্ধতম শব্দ আর বোধ নিয়ে খেলা করে। ‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা, কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা’ এই চরণদ্বয়ে হয়তো একটিও কঠিন বা দুর্বোধ্য শব্দ নেই, তবুও এই চরণ যুগল বোধের একাত্মতা দাবি করে। কবিতা তো শুধু ছন্দোবদ্ধ বাক্য নয়, কবিতা ভাবনার গভীরতর প্রকাশ। সেই কারণেই কবিতা আমাদের বোধ ও ভাবনার জগতকে বড় করে, জীবনকে বিস্তৃত করে। গভীর ভাবনা ও গভীর সত্যের প্রকাশ পাই কবিতার মাধ্যমেই। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’—সহজতম এই বাক্যের মধ্যেও প্রকৃতির অসীম লীলা ফুটে ওঠে অকাতরে।
আবুল হাসান অনুভূতিশীল হয়ে ওঠেন আমাদের এতাবত্ অদেখা, অচেনা ঝিনুকের জন্য। ছোট্ট ঝিনুককে তিনি পৃথিবীর বুকে মহত্ আর বৃহত্ করে তোলেন দুটি লাইন দিয়ে—‘ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহো,/ ঝিনুক নীরবে সহে যাও,/ ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’
ঠিক যেন একইভাবে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বসে সিলভিয়া প্লাথ অনুভূতিশীল হয়ে ওঠেন ছোট্ট মাশরুমের জন্য—
‘Diet on water,
On crumbs of shadow,
Bland-mannered, asking
Little or nothing.
So many of us!
So many of us!’
-Mushrooms, Szlvia Plath
ছোট্ট, অতি সাধারণ, অগণিত মাশরুমের জন্য আমাদের বোধের জগতে বেদনা জেগে ওঠে। আসলে কবিতাই পারে ঝিনুক কিংবা মাশরুমের শরীরেও আত্মা এনে দিতে। আর সুনীলের প্রাণ যখন কেঁদে ওঠে, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না!’—তখন আমরাও আমাদের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের কথা না রাখা কত কথার দিকে মুখ ফিরাই। একটি লাইন যেন মুহূর্তে একটি জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে ওঠে। কবিতার এই অমিত শক্তি আমরা আর কোথায় খুঁজে পাব!
পাবলো নেরুদা, জালালউদ্দিন রুমি কিংবা ম্যারি অলিভারের কবিতা বদলে দিতে পারে একটা মানুষের জীবন। জীবনকে কত বিচিত্রভাবেই না দেখেন কবিরা। ল্যাঙ্গসটন হিউজ তাঁর ‘লাইফ ইজ ফাইন’ কবিতায় বলেন—
Though you may hear me holler,
And you may see me cry—
I’ll be dogged, sweet baby,
If you gonna see me die.
Life is fine! Fine as wine! Life is fine!
Life is fine, Langston Hughes
সত্যিই শত চিত্কার, আর্তনাদ আর বেদনার পরও জীবন তো মদিরার মতোই মধুর। শিশুদের জন্য কবিতা লিখে পোয়েট লরিয়েট হয়েছেন জ্যাক প্রেলুিস্ক। মার্কিন এই কবি জীবনকে দেখেন মজার দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি এই ভেবে আনন্দিত হন যে তার নাকটা মুখের মধ্যে আছে। নাকটা যদি পায়ের মধ্যে থাকত তাহলে পায়ের বিশ্রী গন্ধ শুঁকে তার জীবন কাটত কিংবা নাকটা যদি মাথার ওপরে থাকত তাহলে চুলের সুড়সুড়িতেই বেসামাল অবস্থা হয়ে যেত। তাই তিনি বলেন—
‘Be glad your nose is on your face,
not pasted on some other place,
for if it were where it is not,
you might dislike your nose a lot.
- Be glad Your Nose is on Your Face - Jack Prelutsky
নিজের নাকটি যথার্থ স্থানে থাকার জন্য কবিরা খুশি হতে পারেন। আবার একটি ভালো কবিতার জন্য, একটু শান্তির জন্য কবিরাই অবিরাম সাধনা করেন—
Wanting one good organic line
I wrote a thousand sonnets
Wanting a little peace,
I folded a thousand cranes.
Translations, Sam Hamill
যুদ্ধবিরোধী মার্কিন কবি স্যাম হ্যামিল আমেরিকাতে বসেই ইরাক যুদ্ধ কিংবা আফগান যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তাঁর কবিতা দিয়ে গড়ে তোলেন শান্তির আন্দোলন। সত্যিকার শান্তির জন্য ৭১ বছর বয়সী এই কবি আজও লড়ে যাচ্ছেন কবিতার লড়াই—
What is true peace, I cannot know.
A hundred wars have come and gone
as I’ve grown old. I bear their burdens in my bones.
Mine’s the heart that burns
today, mine the thirst, the hunger in the soul.
-True Peace , Sam Hamill
সাফো থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান পর্যন্ত কালে কালে যুগে যুগে কবিরা কত অযুত নিযুত কোটি কবিতা লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কালের খেয়ায় তার প্রয়োজন আছে কি নেই সেই বিচার কাল করছে এবং করে যাবে। আমরা শুধু পাঠক হিসেবে আলোড়িত হই, আনন্দিত হই, বিস্মিত হই, বেদনাহত হই, অভিভূত হই নানা কবির নানা কবিতা পড়ে। এখনো পড়তে বসলে কোনো কোনো কবিতায় কাচা রক্তের দাগ পাওয়া যায়, কোনো কোনো কবিতায় বিশুদ্ধ গোলাপের গন্ধ পাই, কোনো কবিতায় জীবন এসে উঁকি দেয়, কোনো কবিতায় থাকে মৃত্যুর ছায়া। সব মিলিয়ে কবিতা আমাদের জীবন ও মৃত্যুকে জুড়ে দেয় অসংখ্য বোধ আর অনুভবের সুতোয়।
