শহীদুল জহিরের গল্প

আত্তীকরণের সাথে আপন মৃত্তিকার সন্নিবেশ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২০
যাদের কথা মনে রেখে শহীদুল জহির গল্প লিখেছিলেন তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তার গল্পের পাঠকসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে—একথাও দৃঢ়তার সাথে বলা যাবে না। শহীদুলের মৃত্যুর পর তাঁর পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা বিভিন্নভাবে তাঁর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখন অনেক কিছুই পাঠকের জ্ঞাত। কেন শহীদুল জহিরের গল্প ভালো লাগে, তার অনেক কারণ রয়েছে। আমরা জানি এক যুগের রচনাশৈলী আরেক যুগে কৌতুক এবং পরিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। শহীদুল জহির মাত্র চৌদ্দটি গল্পের মাধ্যমে কতদিন গল্পের ইতিহাসে টিকে থাকবেন, আমরা জানি না। কিন্তু ইতোমধ্যেই তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, হয়তো আরও হবে। শহীদুল জহিরের গল্পপাঠে যে নান্দনিক অভিজ্ঞতা হয় তা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। গল্পসংখ্যা কম হলেও তাঁর গল্পের বিষয় বিস্তৃত এবং বহুমাত্রিক। অন্যসব লেখকের সামাজিক রাষ্ট্রিক বৈশ্বিক বাস্তব অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র থেকে শহীদুল জহির কোন বিশ্লেষণে দূরের বা কাছের...। এসব বিষয় মাথায় রেখে একটা প্রাথমিক ফর্দ তৈরি করা যেতে পারে : ১. শহীদুল জহিরের গল্প গতিশীল, ক্লান্তিকর না। ২. শহীদুল জহিরের গল্পে রয়েছে প্রচুর সংশয়। ৩. শহীদুল জহিরের গল্প প্রচলিত প্লট প্রথা মুক্ত। ৪. শহীদুল জহিরের গল্প প্রতীক এবং সংকেতপূর্ণ। ৫. শহীদুল জহিরের গল্প গুরুত্বহীন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। ৬. শহীদুল জহিরের গদ্য জটিলতায় আক্রান্ত না। ৭. শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা রয়েছে। ৮. শহীদুল জহিরের গল্পে এক ধরনের পুনরাবৃত্তি রয়েছে যা অন্ত্যজ মানুষের জীবনে প্রতিদিন ঘটে। ৯. শহীদুল জহিরের গল্পে এমন সব উদ্ভট ঘটনা ঘটে যা পরোক্ষ বাস্তবতার নামান্তর। ১০. শহীদুল জহির গল্প নির্মাণে বাস্তবতাকেও পরিত্যাগ করেন না। এভাবে বলতে থাকলে সাহিত্যের ক্লাসের উত্তরের মতো শোনা যায়। অতএব ফর্দ তৈয়ার করা ক্ষান্ত দিয়ে আমরা এবার অন্য কিছু খুঁজব। শহীদুল জহির শুধু গল্প বলেন না। তাঁর গল্পের গন্তব্য পূর্ব থেকে বোঝা যায় না। তিনি এতটা আপাত বিরোধী বাক্য এবং চিত্রকল্প তৈরি করেন যার প্রথমটা সত্যি হলে দ্বিতীয়টা মিথ্যে হয়ে যায়, আর দ্বিতীয়টা সত্যি হলে প্রথমটা মিথ্যে হয়ে যায়। কখনো কখনো সত্য-মিথ্যাকে পৃথক করাও যায় না। হয়ে যায় একে অপরের পরিপূরক। জন্ম এবং মৃত্যু এতটা বিপরীত, কিন্তু একটা ছাড়া অপরটা অচল। তিনি কি এতসব মনে রেখে গল্প লিখতে বসতেন? নিশ্চয়ই না। কত বড় প্রস্তুতি থাকলে মনোজগতের রসায়নে এসব ঘটতে থাকে? বিজ্ঞান সবেমাত্র জেনমের পাঠোদ্ধার শেষ করেছে। তাই বলে শহীদুল জহিরের কবর খুঁড়ে ডি.এন.এ টেস্টের প্রয়োজন নেই। তারপরও আমরা জেনেছি শহীদুলের বাবা এই পথের যাত্রী ছিলেন। উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ আমাদের অনেক গল্পকারের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও শহীদুল জহিরের গল্প তাদের চেয়ে পৃথক। শহীদুল জহিরের গল্প কি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের শরীরের মতো এতটা গভীরে নিমজ্জিত অথবা হাসান আজিজুল হকের গল্পের মতো অথবা আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মত বদমাশ’-এর গল্পগুলোর মতো? আমরা বলব, না, তিনি নিজের মতো। আর গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে যে জাদুর ঋণ নিয়েছেন এইজন্য কি আমাদের মন খারাপ হয়? আলোচনা বিশদ, কিন্তু সহজ। আমরা একদিকে বলব গ্লোবাল ভিলেজ কনসেপ্টের কথা, সেই সাথে সহনশীল জাতীয়তাবাদ (?)। দেশের হয়েও বিশ্বের, ঋণ নিচ্ছে (রাষ্ট্র), আবার ফেরতও দিচ্ছে। দিচ্ছে সুদে মূলে। সাহিত্যের ঋণের ব্যাপারে ফয়সালাটা কী? ফয়সালাটা হলো আত্তীকরণ। যেন বমি (বমন) না হয়। আত্তীকরণের সাথে আপন মৃত্তিকার সন্নিবেশ—এসব আজকের কথা নয়, রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই বলেছেন—দেবে নেবে মিলাবে মিলবে। সহিত্যের ঋণ গ্রহণে কোনো বাধা থাকার কথা না। অনেকে আবার বলেন, এসব কলোনিয়াল ভঙ্গি। তাহলে তো কোমর বেঁধে দেশীয় শাস্ত্র ঘেঁটে ‘আমাদেরও আছে বা ছিল[’—এমন প্রমাণ দিতে হবে। শুধু বলব রামায়ণ-মহাভারতে দেখুন হাজার হাজার জাদু। একালের পাঠক যুক্তি খোঁজেন কার্যকারণের পারম্পার্যে, না থাকলে তা আর মানতে চান না। শহীদুল জহিরের ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পে কাকের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এমনটি কি সম্ভব? কাক কী করে দুটি মানুষকে অর্থাত্ আকালু এবং টেপিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়? এই বিষয়ে দূরবর্তী কিছু পাঠ নেওয়া যেতে পারে। পাখির উড্ডয়ন বা তার কিচির-মিচির কিংবা পাখির গান থেকে ভবিষত্ নির্ণয়ের পন্থা যেমন প্রাচীন তেমনি সমগ্র বিশ্বে বিস্তৃত। গ্রিস রোম ও বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে এ ব্যবস্থা ছিল জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও কাক শকুন ও বাজ প্রভৃতি পাখি ভবিষত্ কথনে সক্ষম বলে বিশ্বাস করা হয়। কাক নাকি ত্রিকালজ্ঞ। পাখিরা যেহেতু আকাশে আকাশে উড়ে বেড়ায় স্কাই অর্থে নয় হেভেন অর্থে, খুব সম্ভব সেহেতু তারা ডিভাইন বা স্বর্গীয় সংবাদ জানতে পারে। এসব টোটেমবাদের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের এখানে আরও প্রচালিত আছে, কাকের কা কা ডাক অমঙ্গল ডেকে আনে। কাঠুরে ও দাঁড়কাক গল্পে কাক প্রসঙ্গটি বার বার এসেছে আকালুর বউ টেপির মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে আকালু এই বিষয়ে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। গল্পের গতির কারণে শায়খ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের সেই সিঁ মোরগের গল্পের রূপ নেয়। যেখানে সিঁ মোরগ দেখতে গিয়ে আগ্রহী নিজেরাই এক একটি সিঁ মোরগে পরিণত হয়। শহীদুল জহির এমন একটি ইঙ্গিত গল্পের শেষ লাইনে দিয়েছেন। ‘... তারপর আশ-পাশের মফস্বল থেকে কিছু কাক আসে এই শহরে এবং মফস্বলের এই কাকেরা নতুন প্রজন্মের কাকের জন্ম দিয়ে শহরের আকাশ পুনরায় ভরে তোলে।’ বলা হয় গদ্য গদ্যই। গদ্যে কবিতার মতো আড়াল থাকবে কেন? অথচ গদ্যের আড়ালের লোভ আমরাও সামলাতে পারি না। পরোক্ষে যেতেই হয়। প্রত্যক্ষে ক্লান্তি এসে গেছে। একটু আড়াল সরিয়ে আমরা দেখে নিতে পারি—তারপর আশপাশের মফস্বল থেকে আকালু এবং টেপিরা আসে এই শহরে এবং মফস্বলের এই আকালু টেপিরা নতুন প্রজন্মের আকালু এবং টেপিদের জন্ম দিয়ে ঢাকা শহর পুনরায় ভরে তোলে। আপামররতো ঢাকা শহরে আসছে, তারপরও বলতে হয় এই গল্পে আকালু টেপির কাক বেষ্টিত উড্ডয়ন—অসম্ভবের ভারে আক্রান্ত। তদুপরি এই গল্প আমাদের মন্দ লাগে না। যার অংশ বিশেষ তামসিক হয়েও রাজসিক এবং বৃহত্ অংশ মানবিক। শহীদুল জহিরের গল্পের একটি প্রবণতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়—তাঁর গল্পের চরিত্ররা প্রায়ই সংশয়ী ‘আগারগাঁ কলনীতে নয়নতারা ফুল কেন নেই’ গল্পে—আবদুস সাত্তার বাসায় ফিরছিল সেটা হয়তো বর্ষার মৌসুম ছিল অথবা অদিনের কোনো বর্ষণের কারণ—সংশয়-১। আবদুস সাত্তার এসব কিছু দেখে অথবা দেখে না—সংশয়-২। হয়তো বা ফজলুল করিমের কিশোর ছেলের কলোনী ত্যাগ এবং আবদুস সাত্তারের বারান্দায় ফুল উড়ে আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভেতর একটি সম্পর্ক ছিল; হয়তো বা দুটি ঘটনার ভেতর কোনো সম্পর্ক ছিল না, সময় এর কাকতালীয় মিল ছিল শুধু—সংশয়-৩। এবং এই গল্পে কৃষি কলেজের এক অধ্যাপককে ডেকে আনা হলে তিনি তার ব্যাক্তিগত নোট বইয়ে বিষয়টি সম্পর্কে যে দীর্ঘ অনুচ্ছেদ লিখেন পুরোটা সংশয়ে ঠাসা। তিনি লিখতে গিয়ে ‘আমার সন্দেহ হয়’ বলে নোট বইয়ের লেখাটি এগিয়ে নেন। আর তা না হলে গল্পের কাঠামোটি ভেঙে যেত। সংশয়ই আধুনিকতার লক্ষণ, আর গল্পটি শেষও হয় একটি সংশয়পূর্ণ বাক্য দিয়ে ‘তবে কৃষি কলেজের অধ্যাপকের পরামর্শমতো প্রজাপতি ও মাটির বিষয়ে সাবধান থেকে চেষ্টা করলে ভবিষত্-এ হয়তো এখানে পুনরায় নয়নতারা ফুল দেখা যাবে। শহীদুল জহিরের অসংখ্য প্রবণতার মধ্যে এই সংশয়ী প্রবণতা হাল আমলের অনেক লেখকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা সবলের না দুর্বলের—দোষের না গুণের—বলা না গেলেও ভালো লাগারযে—এ কথা বলা যায়। এমন অসংখ্য কারণ রয়েছে শহীদুল জহিরের গল্প ভালো লাগার পেছনে। শহীদুল জহির (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩—২৩ মার্চ ২০০৮)