ফকির মো. আলী শাহ

মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২১
উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মরমী বাউল সাধক, মহান কবি ফকির লালন সাঁই। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় দোলপূর্ণিমার রাতে এ উত্সব পালন করতেন। তাই একে দোলপূর্ণিমা উত্সবও বলা হয়। লালনের তিরোধানের পর তাঁর ভক্ত-শিষ্য-অনুসারীরা প্রতি বছর এ উত্সব পালন করে আসছে। লালনের আখড়ার প্রধান খাদেম ফকির মো. আলী শাহ। নানা বিষয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ যথাসম্ভব তাঁর ভাষায় এখানে তুলে ধরা হলো। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন—ফিরোজ এহতেশাম ফিরোজ এহতেশাম : আপনার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা, কতদিন ধরে লালনের পথে আছেন, সেবা করছেন, লালনের পথে কেন এলেন—এইসব। ফকির মো. আলী শাহ : আমার জন্ম এই ছেঁউড়িয়াতেই, ১৯৪৭ সালে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এ আখড়ার প্রধান খাদেম হয়ে সাঁইজির সেবা করছি। আর সাঁইজির তরিকাতে আছি প্রায় ৩৫ বছর। আমার বয়স ৬৫ বছর। সাঁইজিকে ভালো লেগেছে তাই তাঁর তরিকাতে এসেছি। আমার বাবা ফকির গোলাম ইয়াসিন শাহও ছিলেন এই লাইনের, এই তরিকার। বাবা এখানেই (আখড়ায়) শায়িত আছেন। প্রশ্ন : বাউলদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে—‘আপন ভজন কথা, না কহিবে যথা-তথা, আপনাতে আপনি সাবধান।’ ভজন কথা বলার ওপর এ নিষেধাজ্ঞা কেন? ফকির মো. আলী শাহ : সাঁইজির তরিকাতে যারা গুরুবাদী না, যারা এখনও কারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি তাদের কাছে ভজন কথা, মর্মকথা বা গোপন কথা বলা নিষেধ আছে। সাঁইজির তরিকার যে ভাবধারা, ধর্মের বিধিবিধান, এটা গুরু-শিষ্যের ভিতরই সীমাবদ্ধ। কারণ, এটা সিনার ভেদ সিনায় সিনায় তো, সফিনার ভেদ সফিনায়, তা-ই। সিনা হলো আত্মা বা অন্তর, আর সফিনা হলো বাহ্যিক। এর কিন্তু কোনো বই-পুস্তক নাই। আমার সিনা, আমার যা কিছু আছে সব আপনাকে দিয়ে দিলাম, আপনার যা কিছু আছে সব আমাকে দিয়ে দিলেন। গুরু-শিষ্যের আদান-প্রদান। তো তারপরেও ধরেন যে, আমরা এখন বহু লেখাপড়া শিখে ফেলেছি তো, আমরা অনেক জেনে ফেলেছি! যেগুলো সাধু-গুরুরা জানেন না, ওগুলোও জেনে ফেলেছি। এই আর কি। প্রশ্ন : এরকম একটা কথা প্রচলিত আছে যে, গুরুকে ধরলে সব কিছু জানা যাবে। তো, গুরু কারা, আমরা গুরু কাকে বলব? ফকির মো. আলী শাহ : সাঁইজি বলছেন যে, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, ভবে সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার। গুরুকে যদি আপনার চেনার অভিলাষ থেকে থাকে, যদি মনে করেন যে গুরু একজন ধরব তবে আপনি জানবেন যে, সাঁইজি মিলায়ে দিবে আপনাকে! তো তারপরও একটা প্রক্রিয়া আছে যে, গুরু কে হন? গুরু দেখে নিতে হবে। কথাবার্তা বললে বোঝা যায়, মুখ দেখলে বোঝা যায়। কখনো আবার বোঝা যায় না। ওই যে কালকে আপনার সাথে একটা ছেলে আসছিলেন, ছটফট ছটফট করছিলেন, আপনি বলছিলেন দাঁড়া, দাঁড়া, দাঁড়া। মানে উনার কাজ সিদ্ধি হয়ে গেছে, ও নাই, আর দরকার নাই। না, সঙ্গ দিতে হবে। সঙ্গ না দিলে জানা যাবে না। তবে ফকিরদের মধ্যেও ক্যাটাগরি আছে। একই ক্লাসে যেমন কেউ ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করে, কেউ গোল্লাও পায়। তেমনি আমাদের ভিতরেও ভালো-খারাপ মানুষ আছে। আমরা বলি যে, রাগ বর্জন করতে হবে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক রাগী মানুষ আছে। সাঁইজির তো প্রথম ধারাই আছে লোভ, ক্রোধ, হিংসা, ঐশ্বর্য, মাত্সর্য—এগুলা থাকলে কেউ ফকির হতে পারবে না। প্রশ্ন : বাউল, সাধু, ফকির—এসব যে আমরা বলি, কাদেরকে বলি, তাদের কি কোনো স্তর আছে, সাধনার স্তর? মানে, সাধনার একটা স্তর অতিক্রম করলে তাকে বাউল বলে, আবার অন্য স্তর পার হলে তাকে সাধু বলে—এরকম কি ব্যাপারটা? ফকির মো. আলী শাহ : হ্যাঁ, অবশ্যই স্তর আছে। আউল হচ্ছেন আপনারা, যারা ঐহিক লোক, সাধারণ মানুষ। বাউল হচ্ছেন যারা সাঁইজির ধর্ম গ্রহণ করল। তার পরবতী পর্যায় দরবেশ। ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর-ফাইভ এরকম স্টেপ আছে না? এখানেও তা-ই। এখানে প্রথম পাঁচটা সাধনা আছে—আউল, বাউল, দরবেশ, সাঁই, তারপরে ফকির। ফকির হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়। এদের সবার সঙ্গে সবার এই ভাবধারার মধ্য দিয়ে লিংক রয়ে গেছে। যিনি ফকির, তিনি সাঁই, তিনি বাউলও। প্রশ্ন : ‘যাহা আছে ভাণ্ডে (দেহভাণ্ডে), তা-ই আছে ব্রহ্মাণ্ডে’—এই কথাটা দিয়ে বাউলরা কী বোঝাতে চায়? ফকির মো. আলী শাহ : যাহা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তার সবই আছে দেহভাণ্ডে। দুনিয়ায় যা দেখা যায় বাহ্যিক, অন্তরেও তা-ই আছে। এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, ধরায়ে দিই আপনারে, তাইলে মক্কা কই? মক্কা তো বাহ্যিক, মক্কা নগরে কাবা ঘর আছে। তাইলে এই দেহে কাবা ঘর কোথায় আছে? আছে, দেহে কাবা ঘর আছে। সেটা আপনি অনুসারী, অনুরাগী না হলে জানতে পারবেন না। প্রশ্ন : লালনের গানে বা তত্ত্বে নিজেকে জানার যে ব্যাপারটা আছে, মানে আত্মতত্ত্বের বিষয়টা, তো নিজেকে জানা যায় কিভাবে? ‘নো দাই সেলফ’ তো বলে গেছেন সক্রেটিস... ফকির মো. আলী শাহ : সক্রেটিস বলে গেছে ‘নো দাই সেলফ’, নিজেকে নিজে জানো। তো কখন জানে মানুষ? যখন নিজেকে মানুষ বিলীন করে দেয়। আপনি বলেন না যে, এই মোবাইল সেটটা কার? আমার। যখন এই ‘আমি’ বা ‘আমার’ শব্দটা থাকবে না, আমার আমিত্বকে যখন খর্ব করতে পারব, ত্যাগ করতে পারব, আমার বলতে আর কিচ্ছু নেই, তখন নিজেকে চেনা যাবে, ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। গুরু তো সর্বেসর্বা, তাকে সর্বস্ব দিয়ে দিয়েছি। এই হচ্ছে আমিত্বকে হারানো, সর্বস্ব ত্যাগ করা, এই হচ্ছে কুরবানি। প্রশ্ন : নিজেকে জানার প্রক্রিয়াটা কী? কিভাবে জানব? সাধনা দরকার? ফকির মো. আলী শাহ : জানার প্রক্রিয়া? আপনি ষড়রিপু-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাত্সর্য—কন্ট্রোল করেন তখন আপনি কিছুটা আভাস পাবেন। সাধনা দরকার তো বটেই, সাধনা ছাড়া কিচ্ছু নেই এখানে। বড় কঠিন ব্যাপার আছে। আপনি সারাদিন কিছু টাউনে ঘুরে বেড়াইলেন বা পিকচার হলে ছবি দেখলেন, ঝিনাইদহে, আপনার বাড়ি কোথায়? রংপুর। রংপুরে স্টেডিয়াম নিশ্চয়ই আছে। রংপুর-টংপুর দেখলেন আর সন্ধ্যাবেলা যায়ে পেয়ে গেলেন, তা পাবেন না। সাধনা থাকা দরকার। আত্মতত্ত্ব, নিজেকে জানা। প্রশ্ন আছে না, আমি কে, কোত্থেকে আসলাম, কোথায় ছিলাম, কী ছিলাম, কোথায় যাব? এ তো চিন্তা করি আমরা নয়তো করি না। আমরা গড্ডালিকা প্রবাহে জীবন কাটাচ্ছি। ষড়রিপু যখন কন্ট্রোল হয়ে যাবে তখন আপনি নিজেকে জানতে পারবেন। নিজের সঙ্গে লড়াই। বিলীন করার ব্যাপার তো আছেই। প্রশ্ন : ঈশ্বরের সাথে বিলীন...? ফকির মো. আলী শাহ : এক অর্থে তা-ই। তবে এইখানে কিছু কথা আছে কিন্তু। এইখানে কথা আছে যে, ‘যে মুর্শিদ সে-ই রাসুল, ইহাতে নাই কোনো ভুল, খোদাও সে হয়।’ এখন এই খোদার সাথে লীন হতে হবে। ওই খোদাই এই খোদা। প্রশ্ন : অর্থাত্ মুর্শিদই, মানুষই খোদা? ফকির মো. আলী শাহ : ঠিক মানুষই খোদা না, মুর্শিদ খোদা, যার যার মুর্শিদ তার তার কাছে খোদা। প্রশ্ন : কিন্তু মুর্শিদ তো মানুষই... ফকির মো. আলী শাহ : হ্যাঁ, এখন আমি যদি আপনাকে মুর্শিদ মনে করি, আপনার ভিতরে এক ঈশ্বর তো আছেই তাই না? তাইলে? প্রশ্ন : বলা হয় যে, ঈশ্বর তার আদলে বা রূপে মানুষকে তৈরি করেছে... ফকির মো. আলী শাহ : হ্যাঁ, তাই তো হইল। আদম তারই (ঈশ্বরের) প্রতিচ্ছবি। তাকে দেখেছেন আপনি? দেখা যায়? যায় না। তো তারপরও দেখা যায়। কিন্তু এ দেখা যাওয়ার কথা বলা যাবে না। এ হচ্ছে সাধার জিনিস, গুরুপ্রদত্ত জিনিস। এমনি এমনি সাধারণ ধারায় আসেন, যদি আপনি স্বীকার করেন যে, তারই (ঈশ্বরের) প্রতিকৃতি এই আদম, তাইলে আদমই আল্লাহ। সাঁইজি বলছেন, যথা কাল্লা তথা আল্লাহ... কিন্তু সবাই মক্কায় খুঁজতে যায়! মক্কায় গেলে কি পাওয়া যায়! প্রশ্ন : লালনের দর্শনটা আপনার কাছে কী মনে হয়? ফকির মো. আলী শাহ : কোন দিককার দর্শন বলব আমি? লালনের তো বহু দর্শন। লালন নিজে একটা দর্শন, তাঁর দেহটা একটা দর্শন, তাঁর বাণী একটা দর্শন, তাঁর চলাফেরা দর্শন, তাঁর খাওয়াও দর্শন, ঘুমানোটাও দর্শন। তাঁর সব কিছুই দর্শন। আমি কোন দর্শনের কথা বলব আপনাকে? প্রশ্ন : লালন মূলত কী বলতে চান? ফকির মো. আলী শাহ : এখানে অনেকে দেখতে এসে বলেন যে সাঁইজি কোন ধর্ম করতেন? তখন আমরা একটা কথাই বলি, ‘মানবতার ধর্ম’। তিনি মানুষের কথাই বলে গেছেন। অনেকেই বলে, সে (লালন) কি নামাজ পড়ত? কত বড় পাপ কথা বলল। আরে বাপ, নামাজ পড়ল কিনা সেটা তার ব্যাপার, যার যার নামাজ সেই সেই পড়ে। তো যা-ই হোক, উনার দর্শনের থিম হচ্ছে, একজন মানুষের ভিতরে এক অসীম মানুষ বাস করছে। সেই অসীম মানুষটার নৈকট্য পেতে হলে এই মানুষটাকে সাধন করতে হবে। আপনার কী নাম? ফিরোজ। এই ফিরোজ একটা মানুষ। এই ফিরোজের ভিতরে কিন্তু আরেকটা ফিরোজ বাস করছে। ওই ফিরোজটাকে পেতে হলে এই ফিরোজটাকে সাধনা করতে হবে। এই ফিরোজটাই হচ্ছে মূল। বাহ্যিক ফিরোজের ভিতর দিয়ে ভিতরের ফিরোজটাকে পাওয়া যাবে। এই হচ্ছে সাঁইজির থিম, সংক্ষেপে। তার মধ্যে এখন ফিরোজকে কিভাবে ভজন-সাধন করব, তখনই দেহতত্ত্বের বিষয় এসে গেল। প্রশ্ন : লালনের গানে কিছু প্রতীকী ও পারিভাষিক শব্দ আছে। লালনের ভাবধারায় যারা দীক্ষিত না, সাধারণ মানুষ, তারা কি সঠিক অর্থে সেই শব্দটি বুঝতে পারবে, নাকি ভুল বুঝবে? ফকির মো. আলী শাহ : আছে তো, অনেক শব্দই আছে। সাধারণ মানুষের অনেকে হয়তো এই শব্দগুলোকে ভুল অর্থে নিতে পারে। সব জিনিসেরই কিন্তু একটা ফাঁক আছে, আড়াল আছে। তবে একটা প্রমাণ দেই আপনাকে। সাঁইজির এক বাণী আছে, ছয় মাসের এক কন্যা ছিল, নয় মাসে তার গর্ভ হইল, এগারো মাসে তিনটি সন্তান, কোনটা করবে ফকিরি। যে ফকিররা জানে তারাই এটা বুঝবে, সাধারণ লোকে বুঝবে না বা ভুল বুঝবে। প্রশ্ন : বাউলদের মধ্যে তো সাধন-সঙ্গি বেছে নেওয়ার ব্যাপার আছে যে, সাধন-সঙ্গি বেছে নিয়ে বাউলরা সিদ্ধি লাভ করে... ফকির মো. আলী শাহ : যার আছে তার তো আছেই, যার স্ত্রী বা স্বামী নাই তার সাধন-সঙ্গি দরকার। তখন তারা যে সাঁইজির তরিকা জানে-বোঝে সেরকম দেখে সাধন-সঙ্গি বেছে নেয়। এরপর তারা সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে। কিভাবে সিদ্ধি লাভ করে তা বলা যাবে না। তবে সাধন-সঙ্গি ছাড়া সিদ্ধিলাভ করা সম্ভব না, সাধন-সঙ্গি লাগবেই। সাঁইজির তরিকায় যুগল সাধনা দরকার, তাই যুগল সাধককেই লাগবে। আমি কিন্তু কথায় কোনো কিছু ফাঁক রাখছি না। সাঁইজি বলছেন, নিজের মনকে করলাম সোজা, বিবির মনে গোল রইল, আমার নামাজ আদায় কই হইল। বিবির মনে গোলমাল থাকলে আর নামাজ হবে না। কোন নামাজ? পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, কপালে কালো পড়ার নামাজ? এই সেই নামাজ না। এটা দায়েমি নামাজ। পড় রে দায়েমি নামাজ এ দিন হল আখেরি। আমরা নামাজ কিন্তু পাঁচবার পড়ি না, দুইবার পড়ি। সকাল এবং সন্ধ্যায়। প্রশ্ন : আপনার গুরু কে? ফকির মো. আলী শাহ : আমার গুরু এখান থেকে সাত মাইল দূরে আলমপুর ইউনিয়নের রাজপুরে অবস্থান করছেন। আমার গুরুর নাম রহমত শাহ। উনি জীবিত আছেন। প্রশ্ন : নফি, এজবাত-এই জিনিসগুলা কী, একটু বলেন তো? ফকির মো. আলী শাহ : আপনি তো দেখি সবই (প্রশ্ন) নিয়ে আইছেন। (হাসি) তো সেইখানে যেতে হচ্ছে যে, শহরে ষোল জনা বোম্বেটে, করিয়ে পাগলপারা আমায় নিল সব লুটে। তো সব তো লুটে নিচ্ছেন আমার কাছ থেকে (হাসি)। নফি, এজবাত হলো জিকির। আমি বলব, কিন্তু এর মূলে কিন্তু যাব না। এই জিকির করতে ছয়টা মোকামে যাওয়া লাগে। সেখানে গুরুরূপ আমার জ্ঞানে থাকতে হবে। গুরুরূপ জ্ঞানে রেখে ওই ছয় মোকামে যাব, গিয়ে নফি, এজবাতটুকু পড়ব। এই ছয়টা মোকাম কী তা বলা যাবে না। এই দেহের ভিতরে ছয়টা মোকাম, মানে ছয়টা জায়গা, ছয়টা ঘর আছে। তাই সাঁইজি বললেন, ছয় মহলে ঘড়ি ঘোরে, শব্দ হয় নিঃশব্দের ঘরে, কলকাঠি মুকন্দদ্বারে, কি আজব কারখানা, কয় দমেতে বাজে ঘড়ি করো রে ঠিকানা। সাঁইজি আমার কিচ্ছু বাদ রাখেন নাই। প্রশ্ন : এখন তো অনেকেই লালনের গানের কথা ও সুর বিকৃত করে গায়। এটা বন্ধ করার কোনো উপায় নাই? ফকির মো. আলী শাহ : এটা যার যার ব্যাপার। এটা সম্বন্ধে আমি কী বলব! যেমন সাঁইজির একটা বাণী আছে, পাখি কখন জানি উড়ে যায়, একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়...’। কত করুণ সুর না? এটা কি লাফালাফির গান? এই গানটা গাওয়ার সময় কি নাচা আসবে? আমি যত বড় নর্তকী হই, যত বড় কোমড় দুলানেআলা হই, আমার কোমড় কি দুলবে? আমার চোখ দিয়ে টসটস করে পানি ঝরবে। নয়নবারি ঝরলে কি আর নাচা আসে! কিন্তু এখন দেখি এই গানটার সময় নর্তন-কুর্দন হয়! এই হচ্ছে ঘটনা! এখন বুঝে নেন। লালনের মূল সুর এখন তো টিকায়ে রাখার কোনো পজিশন নেই। তখন অসুবিধা ছিল যে সাঁইজির গানের তো কোনো স্বরলিপি ছিল না। স্বরলিপি থাকলে তারা হয়তো সেটা মেইনটেইন করত। তাই এখন যে যেরকম মনে করছে সে সেরকম গাচ্ছে। আদি বাউল যারা, আদি ফকির যারা তারা গাইত, তাদের পরম্পরায় এটা হয়ে আসছে। আদি সুরে যারা গায়, তারা হয়তো সঠিক গায়। এখন মডার্ন সিঙ্গার যারা তারাও সাঁইজির স্বরলিপি তৈরি করে ফেলেছে! তারপরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি তো, সাঁইজির অনেক আদি সুর হারিয়েই গেছে বলতে গেলে। ফরিদা পারভীন কিন্তু অনেক গান আদি সুরে গায়। তিনি আমার বাবার কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। আমার বাবা ফরিদা পারভীনকে গান শিখায়েছিল। প্রশ্ন : বাউলধর্মের মূল টার্গেটটা কী, উদ্দেশ্যটা কী? ফকির মো. আলী শাহ : বাউলধর্মের টার্গেটটা তো এক কথায় বলা যাবে না। এর আগে ‘বাউল’ শব্দের অর্থটা বুঝতে হবে। ‘বা’ মানে বাতাস, ‘উল’ মানে সন্ধান। বাতাসের সন্ধান। এই যে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস যাওয়া আসা করছে না? এরই সন্ধান করা। ইনি কে? কোথায় থাকেন? এর সন্ধান করার নামই বাউল।