বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে শহিদ কবিরের একক প্রদর্শনী

চেনা দুঃখ চেনা সুখ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২৩
মাটির কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা শহিদ কবিরের জীবনের প্রথম পাঠশালা মাটির ঘর। মাটিই তাঁর ছবি আঁকার প্রেরণা। তৃণমূল মানুষ তাঁর আত্মার আত্মীয়। বস্তিবাসী নারীর দেহাবয়ব, লালনের মরমি দর্শন থেকে শুরু করে স্পেনের জিপসি জীবন যাপন শহিদ কবিরের ছবির বিষয়। এবারের প্রদর্শনীর ৫৩টি ছবির মাঝে নন্দন পিপাসু দর্শক মুহূর্তে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন। এত বর্ণহীন ম্রিয়মাণ ধোঁয়াশা আবরণ কেন? এ প্রশ্নের সাথে শিল্পী একমত হয়ে জবাবে বলেন, ‘বেদনার রঙ ইম্প্রেশানিস্ট শিল্পীরা নির্মাণ করতেন বেশ। দৃষ্টিনন্দন চোখধাঁধানো চিত্রনির্মাণের পরিবর্তে রঙের পরতে পরতে অনুভূতিকে স্পর্শ করতে চেয়েছি।’ প্রচলিত রঙের ধারণা থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে রঙ তৈরি করে কাজ সম্পন্ন করেন। বিভিন্ন রঙের মাটি বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। শহিদ কবির ক্যানভাসের সাথে লেপ্টে দেন নানা রঙের মাটি, খড়কুটা, বালি, কাঠের গুঁড়া, আঁকার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন গুঁড়া রঙ, এটেল, দো-আঁশ মাটি, জমিনে ব্যবহূত এসব উপকরণ থেকে মাটির ঘরের দেয়ালে লেপে দেওয়া আস্তরের ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে দেশ গ্যালারিতে তাঁর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কোলাজ শিল্পকর্ম ও তেল রঙের কাজ দিয়ে সাজানো হয়েছিল সেই প্রদর্শনী। সেসব কাজের বিষয়ে মানবসত্তার অর্ন্তগত সুর বিম্বিত করে তুলেছেন। কয়েক দশক আগেও তিনি এ রকম অর্ন্তগত বেদনার জাল বুনেন ক্যানভাসে। বাংলাদেশের মানুষের লড়াই সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, মিছিল, হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন—এসব স্মৃতি কবিরের সৃজনকর্মে প্রভাব পড়ে। অন্ধকার পর্যায় পার হয়ে একটি আলোকোজ্জ্বল সকালের দিকে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। ছবিতে আলো নেই। তাঁর কাজের মাঝে গুমোট রঙের সমাবেশ রয়েই গেল। কারণ সত্তরের দশক পরবর্তী সমাজব্যবস্থায় মানুষের দিনপঞ্জি বদলায়নি। দিনমজুরের মুখে ক্লান্তি আর পোড়া রঙ কবিরের ক্যানভাসে হাজির হয়। ক্যানভাস জুড়ে নারী, পুরুষের তামাটে কালচে দাগ পড়া মুখ উপস্থিত হয়। প্রকৃতির কাছে শহিদ কবির উদারতা খোঁজেন মানুষের জন্যে। ‘ডাইং হার অনলি শাড়ি’ ছবিতে মেয়েটিকে লঞ্চের ছাদ থেকে দেখেছেন এভাবে—অর্ধেক শাড়ি মেয়েটির গায়ে বাকিটুকু রোদে মেলে দিয়েছে। একটি শাড়িতে দিনাতিপাত করা মানুষটির সংগ্রামকে ক্যানভাসে তুলে এনেছেন। লালন, রবীন্দ্রনাথ, বারান্দায় মানিপ্লান্ট, এমন অনেক বিষয়কে এ প্রদর্শনীতে রেখেছেন। এবারের প্রদর্শনীর কাজে ধারাবাহিক নির্মাণ কৌশলের সাথে বিষয়ের নতুনত্ব দর্শকদের তৃষ্ণা মেটাবে। বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে গত ১২ মার্চ শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হবে ১ এপ্রিল।