নির্বিশেষ অবগাহনেই কবিতার চিরায়ত স্বাধীনতা। প্রণয়স্পর্শে সে স্বাধীনতা পায় হূদয়ের শুদ্ধতা। হূদয় উত্সারিত প্রণয়ে কবির আনুভূতিক আলোড়নে যে কথামালার প্রসব ঘটে তার কবিকল্পিত শিল্পজ পরিচিতি হয় ‘হূদয়লিপি’। কবি শামীম রেজার চতুর্দশপদী কবিতার গাঠনিক রূপের বাহ্যিক এবং অন্তঃস্বরখচিত প্রণয়ের নিহিত অবিরল প্রণয়ধারা এ কাব্য। ইতিহাস, ঐতিহ্যে সেকাল-একালের মেলবন্ধনে আদি-অকৃত্রিম-আধুনিক সময়ের উপস্থাপনাতেই কবিপ্রণয়ের মানসিক উদ্গীরণশক্তির প্রকাশ। আগাগোড়া প্রতিটি কবিতার মধ্যে লুকায়িত আছে দেহজ বাসনা-কামনিঃসৃত প্রণয় এবং সকাতর আবেগের অনুরণন। কবিতাবলিতে পাঠের আনন্দ সহজাতভাবে বিদ্যমান। শ্রুতিমধুরতা ওই পাঠের আনন্দকে শতভাবে উন্মুক্ত করে দেয়। হূদয়লিপি-র উত্স কী বা কে এই হূদয়লিপি-র অনুপ্রেরণা—এটা স্বাভাবিক-সহজ-সুন্দর প্রসঙ্গ। কবির মনে যে স্বতন্ত্র ব্যক্তিক প্রণয়িনীর বাস তাঁকে হূদয়মথিত অনুমোদনে কবি তাঁর কল্পনার ডালপালায় বিস্তৃত করেন যাতে আবেদনটি হয় বহুরৈখিক। কবিকল্পিত মানসী, প্রণয়িনী বা প্রেয়সীর প্রতি কবিতাগুলো নিবেদিত। শিল্পিত বক্তব্যে অন্তর্গতভাবে তা একজনই, কিন্তু বাহ্যিকভাবে তাকে নানা নামে চেনা যায়। বলা সঙ্গত, কবির ভঙ্গিগত রেখাপাতে তাকে নানা নামেই উপস্থাপিত হতে হয় যা কবিতার নির্বিশেষ অবগাহনকে দাবি করে। সে দাবি পূরণেই কবি খোঁজ করেন প্রণয়ঘটিত স্বপ্নমানসীর। স্বপ্নমানসীর পার্থিব নাম তখন প্রণয়েশ্বরী, রমেনেশ্বরী, হূদয়েশ্বরী, স্বর্গেশ্বরী, কবিতাশ্বেরী ইত্যাদি। ভীষণ প্রণয়স্পর্শে শরীরী উপস্থিতির চিরন্তন আবেদন হূদয়লিপির আত্মা। হূদয় হারানো বা পেয়ে ফের হারানোর যন্ত্রণা কিংবা তাকে বারবার অনুসন্ধানের সাধনা বৈচিত্র্যের মাত্রায় এসেছে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে গতিময় অবস্থান থেকে জীবনশিল্প নির্মিত হয়ে পল্লি, নাগরিক ছোঁয়ায় প্রবাহিত হতে হতে বৈশ্বিক ব্যাপ্তিতে যাত্রা করেছে যেখানে প্রথাগত প্রণয়ে নয়, অবারিত প্রণয়ে বিশ্বাসী কবি। অনুভবে তাঁর ‘মনের চেয়ে বড় কোরান-গীতা নাই বিশ্বে দেখা’ (মানুষের মন)। রতিশয্যা বা কামজাত উপকরণের বক্তব্যে কবি আধুনিক। তিনি বলেন—‘ঈশ্বর বীজদণ্ড বেয়ে আমার হয়েই/ প্রবেশ করবে যোনীদ্বারে; দেখেছি শেষ পর্যন্ত/ শুধু রতিক্রিয়ারত এক মেয়ে এক পুরুষ;/ ঈশ্বরের মূল পুজো অর্চনা কী এই রতিক্রিয়া।’ (ঈশ্বরের বীজদণ্ড) আধুনিকতা তার পূর্বজ ঐতিহ্যকে মেনেই সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল সত্তামননে আধুনিক তকমা পেয়েছে। প্রাচীন কিছুকে তার ঐতিহাসিক পূর্বসূরিরূপে মানতে হয়। কবি শামীম রেজা ইতিহাস-ঐতিহ্যের দায়বোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ‘প্রেমের নদীতে সাকী-কে কবে বুঝে দিয়াছে ঝাঁপ।’ (ঘৃণা কর তাও ভাল) ‘সাকী’র ঐতিহ্যিক যাত্রা গালিব বা খৈয়ামের কাব্যেও মেলে। ব্যবহারের মাত্রায় প্রসঙ্গটি তাই সুদূরঅতীতকালের উপকরণ। কবির নাম যখন সরাসরি মিলছে, দায় কত গভীর সহজেই অনুমেয় হয়। অনুভূতিতে এসেছে—‘হাফিজ ওমর দিবো ছাড়ি, চুম্বনে ভাসাও তরী/ হেরা পাহাড়ে তুইলা রাখা আছে তোমার বিবেক।’ (তারারা জ্বলছে বুকে)। হাফিজ-ওমর রচিত কাব্যে ‘সরাব’, ‘স্বর্গ’ ইত্যাদিসূত্রে পার্থিব ও মৃত্যুপরবর্তী সময়ের উপস্থাপনায় ছিল নিজস্বতা। একালে এসে প্রণয়কে আমরা সেই চিরায়তসূত্রেই গেঁথে ফেলি হূদয়ঘটিত ঘটনা হিসেবে, কিন্তু সূক্ষ্ম পার্থক্য ঘটে বক্তব্যের একালীন প্রায়োগিকতায়। হূদয়লিপি-র উদ্ভাসনে তা ঘটেছে এমনিভাবে—‘দৃষ্টিতে উদ্বাস্তু ছায়া, দূরেতে আলোকরশ্মি হাসে/ কুমারী নারী হে তীক্ষ নাসারন্ধ্রে খোঁজো স্বর্গ ঘ্রাণ/ দেখো তিরোধান কালে কী করে আইটেম গার্ল নাচে।’ পরক্ষণেই বলা আছে—‘বনপরী নও র্যামেপও হাঁটোনি কোনোদিন তুমি/ তমসা রাজ্যের খোঁজ তুমি আমি কেউই পাইনি/ স্বর্গেশ্বরী কাব্য ভালোবেসে আবাদ করলে ভূমি।’ (স্বর্গেশ্বরীর হূদয়) সেকাল থেকে একালে এসে পার্থক্য গড়ল ‘আইটেম গার্ল’ ও ‘র্যামেপ’র রমণী। আবেদন সেই প্রণয়ের জন্যই, কেবল প্রণয়কে জানানোর ঢঙটিতে আলাদা উপস্থাপনা। সময়গত আধুনিকতাই তার প্রাণ। প্রসঙ্গ অনুসারে ব্যবহূত মীরাবাঈ, অফির্য়ুস, অ্যান্টনি-ক্লিওপেট্রা, আলস্কা মসজিদ, মালবিকা, বাবুর, তাম্রলিপি, মেনকা, ডোমনী, কামযোগী কাপালিক ইত্যাদি ব্যক্তি বা স্থানবাচক ঐতিহাসিক মিথিক্যাল প্রয়োগ শিল্পিত হয়েছে। মিথের চিরায়ত ব্যবহার কবিরও চিরায়ত সৃষ্টির অংশে নতুনত্ব পায়। শামীম রেজার হাতে মিথ ব্যবহারের নবসৃষ্টির পালে নতুন হাওয়া লক্ষণীয়—‘দেবী তুমি কাকে যে ভালোবেসে নীরব হলে শেষে/ কাবার বাতি, কোনার্ক প্রদীপ ম্লান, রূপের পাশে/ বলো দেবী কত শনিগ্রহ হূদয়ে কামড়ে দিলো/ কাফের মনও প্রেমধর্ম দীক্ষায় প্রেমিক হলো।’ (লুণ্ঠিত হূদয়) ‘দেবী’ নানাভাবে প্রণয়ের মানবীকে ভাস্বর করে। আর তাকে ঘিরে কাফের মনও গলল। প্রায়োগিকতায় নবসৃষ্টি এভাবেই চাঙ্গা হয়; বিনিময়ে পাঠকের পাঠসূত্রে লাভবান হওয়ার সুযোগ আসে। প্রণয় নিবেদনের মধ্যে কবির কাতরতার বহিঃপ্রকাশ। সে কাতরতা মধুর। তা শরীরী ও ইন্দ্রিয়সর্বস্ব। পঞ্চেন্দ্রিয় বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা-ই বলি, সবই তখন কর্মমুখরতায় মুহ্যমান। কবির মুখর বাণীতে তখন কেবলই রোমান্টিসিজম—‘ও চোখে হরিণ ছোটে, ঢলে পড়ে যাত্রীপূর্ণ রথ/ প্রেমে পড়িনি বলো তুমি, দৃষ্টিতে প্রেমের শপথ।’ (দৃষ্টিতে প্রেমের শপথ) কিংবা ‘আমার শিখায় দীপ্ত না হলে কে চিনবে তোমায়’ (তারারা জ্বলছে বুকে) চোখ, দৃষ্টি কিংবা ব্যক্তিক শিখা এসব ভিন্ন ভিন্ন মানসিক উত্সকে উসকে দেয়। প্রকাশের গভীরতায় বৈচিত্র্য এনে প্রণয়কে বাঙ্ময় করাই সেখানে মূখ্য। ইন্দ্রিয় তখন কবিকে তাঁর আপন অনুভূতির প্রতি বিশ্বাসী করে যাতে প্রণয়কে জিইয়ে রেখে হূদয়ের গোপনার্থ নজরে আসে। ভয় একটা থাকেই সেখানে। প্রণয়কে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি পৌঁছানো একটা সাধনা আবার সাধনায় তার অনুমোদন না পেলে প্রণয় নিবেদনকারীর বেদনার নিঃসরণ হয়। অভিমান বা আক্ষেপ সহজাত মানবীয় ধর্মরূপে এসে পড়ে। তারই একখণ্ড ছবি—‘তারারা জ্বলছে বুকে, প্রেমে না পড়লে কি জ্বলতে?/ এমন আলোর খোঁজ রাখোনি, জ্বালিয়েছো সলতে।’ (তারারা জ্বলছে বুকে) যে প্রণয়সপর্শে এমনিতেই জ্বলেছে সলতের প্রচেষ্টাগত ব্যাপার যেন তাতে মৌনমুখর প্রণয়ের অসাধারণ ইঙ্গিত। অতঃপর অবধারিত বিচ্ছেদ। প্রণয়ের ঘটনায় বিচ্ছেদই সেই সুর যা প্রণয়কে অধরা মাধুর্যে চিরসবুজ করে। বিচ্ছেদের বহুরেখায় শামীম রেজা হূদয়লিপি-কে ঋদ্ধ করেন এবং বাঁকগুলোই তার সাক্ষ্য। বাঁকে বাঁকে স্বতন্ত্র কথা, স্বতন্ত্রের রেখায় পার্থক্য নির্মিত, কেননা কবি অনেকার্থ দিতে উদ্বাহু। যখন বলেন—‘যে হূদয় হারিয়েছে সেই পেয়েছে শাশ্বতের খোঁজ/ পৃথিবীতে এই লোকসানে লাভ জোটে রোজ রোজ।’ (যে হূদয় হারিয়েছে)। সৌম্য-সুন্দর-বিশ্বজনীন অনুভূতিতে পড়া যায় এ পঙিক্তযুগল। আদি থেকে কবির সমকাল পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রণয়ের ইতিহাস তো এটাই যেখানে বিচ্ছেদ হলে জুটে যায় অমিয় প্রণয়াভিজ্ঞতা। বক্তব্যের স্বাতন্ত্র্য তার মতোই। এবার পার্থক্যের দিকটাও এতেই নিহিত। মিলন ও বিচ্ছেদ দুই বিপরীত সত্তা এ পঙিক্তযুগলকে মেলে ধরেছে অন্তঃস্বরে। যেমনটি এখানেও—‘চিরকাল একসুরে পাখিরা বিরহী গান গায়/ মানুষ শুধু বাঁশি নয়, বারবার মন পাল্টায়।’ (স্বর্গেশ্বরীর হূদয়)। হূদয়লিপির বড় উদ্ভাসন স্মরণযোগ্য পঙিক্তর অসাধারণ বিন্যাস। অডেন এককালে কবিতাকে বলেছেন—‘মেমোরেবল স্পিচ’। বাংলা কবিতায় এমন পঙিক্তর অভাব নেই। কবি শামীম রেজা হূদয়লিপি-তে ‘মেমোরেবল স্পিচ’-এর ব্যবহার করেছেন নান্দনিক বহুরৈখিক শিল্পসপর্শে। সবই প্রণয়খোদিত নানা প্রেক্ষিতে রচিত হয়েছে। ক. ‘আল্লার ভাষা আরবি ভগবান সংস্কৃতে লেখেন/ বাংলা দলিত ভাষা, শুনে ঈশ্বর মৃদ্ধ হাসেন’ (আল্লাহর ভাষা আরবি) খ. ‘খোদার কুরসি ম্লান তোমার রূপসৌন্দর্য ছাড়া/ প্রেম চিত্রশালে আমি হীন তুমি যে আশ্রুতধারা’ (হূদয়েশ্বরী) গ. ‘প্রজ্ঞা পারমিতা অক্ষরেই জন্ম যে যুদ্ধ প্রেমের/ বলো নামাজি মেয়ে কোন ধর্ম বড় প্রেমের চেয়ে’ (যুগল পূর্ণিমা) ঘ. ‘শিউলি ফুলে তারার ছবি দিঘিতে আজো যে জ্বলে/ প্রেমহীন জ্ঞানে কীভাবে মেধার প্রদর্শনী চলে?’ (প্রেমহীন জ্ঞান) ঙ. ‘কামকমিপতা কুমারী নারী যে বুকে গঙ্গার ঢেউ/ ধর্মভয়ে ভালবাসা ছেড়ে অরণ্যে যেও না কেউ’ (কামকমিপতা কুমারী) চ. ‘অন্তর দিয়াই বলি প্রেমিক প্রেমিকাদের শোনো/ ঠোঁট যে ঠোঁটকে বিশ্বাস করে না কখনো কখনো।’ (প্রেমিক প্রেমিকাদের বলি) হূদয়লিপি-র লিপিকৌশল থরে থরে সাজানো, সেখানে হূদয়ধর্মে প্রণয়ই শ্রেষ্ঠ, আচার-প্রাতিষ্ঠানিকতা বা ধর্মসংস্কার নয়। কবির পরিমিতিবোধ চতুদর্শপদী পঞ্চাশটি কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে নিবদ্ধ। আবেগে কবি সরস গভীর, প্রকৃতিমুখরতায় ভেষজ, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সচেতন আর এসবের নির্মিতি হূদয় উত্সারিত প্রণয়ে। সঙ্গে পাঠকের হাতে থাকবে কবি শামীম রেজার ‘ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল’-কাব্যগ্রন্থের সেতুবন্ধ কবিতা। আছে দুটি কবিতা। এ কবিতা দুটিও স্বরেই প্রণয়প্রধান। প্রথমটির শেষের দুই পঙিক্ততে আছে—‘আসলে কি এমন প্রেমের সাঁতার জানে কেউ/ হূদয়ে শুধু আছড়ে পড়ে অনন্তেরই ঢেউ।’ স্বতঃস্ফূর্ত প্রণয়ের গাথা এ যেন। পরের কবিতাটি কাতরতায় স্মৃতিমুখর ও দেখা হওয়া না হওয়ার মানসিক দিকে বেদনার বোধে মথিত। ‘দেখা হবে কাল, রোদেলা সকাল/ তুমি আমি মিলে আকাশের নীলে’; এভাবে শুরু হয়ে শেষে এসে কাতরস্বরের অনুরণনে নিমগ্নসত্তার প্রকাশ হয়েছে—‘দেখা হবে দুখ, যার যার তার/ নিজস্ব ক্ষত, আলাদা বাহার।’ ব্যক্তিক সুরের প্রকাশে সামষ্টিক প্রয়াসকে দেখানোর এ অনুভব অসামান্য। সমস্তটা জুড়ে কবি শামীম রেজার হূদয়লিপি অনবদ্য প্রণয়কাব্য। সে প্রণয়ে সচেতন কবিতাপ্রেমী পাঠকমাত্রই একান্তপাঠে ঋণী বোধ করবেন।
