পুরনো ঢাকায় ওয়াসার পানিতে ময়লা দুর্গন্ধ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২৩:১০
বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার পড়েছে পুরান ঢাকায়। ওয়াসা যেটুকু পানি সরবরাহ করছে তাতেও ময়লা, দুর্গন্ধ। পুরান ঢাকার অধিকাংশ অঞ্চলের পানি ময়লা এবং পান ও ব্যবহার অযোগ্য। ফুটিয়েও পানি থেকে গন্ধ দূর করা যাচ্ছে না। দূষিত পানিতে শিশুদের শারীরিক অবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। নানা রোগ-ব্যাধি বিশেষত ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি সংকটের জন্য বিদ্যুত্ সরবরাহকে দায়ী করেছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াসা শতকরা ১৩ শতাংশ পানি নদী থেকে সংগ্রহ করে থাকে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা থেকে যে প্রক্রিয়ায় পানি সংগ্রহ করা হয় তাতে পানি বিশুদ্ধ হয় না। এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে অনেক সময় ওয়াসা অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে যার কারণে পানি দুর্গন্ধ হয়। বিশেষ করে সায়েদাবাদ ও চাঁদনীঘাট শোধনাগার থেকে সরবরাহকৃত পানিতে এই দুর্গন্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুর, বংশাল, নয়াবাজার, আরমানিটোলা, কুলুটোলা, মদনমোহন ঘোষ লেন, নারিন্দা, দোলাইখাল, চকবাজার, পানিটোলা, নয়াটোলা, মধুবাগ, শান্তিনগর, গেন্ডারিয়া, মুগদা, মগবাজার, কলতাবাজার, পাটুয়াটুলী লেন, বাংলাবাজার লেন, সুরিটোলা, বনগ্রাম, ওয়ারী, শশী মোহন বসাক লেন ও মৈশুন্ডিসহ আশপাশের এলাকায় গত এক মাস যাবত্ পানি সংকটের পাশাপাশি পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফ্যানাযুক্ত কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সাংসারিক কোন কাজে আসছে না বরং ঘরময় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাড়াচ্ছে রোগ-বালাই। সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়লা ও ফেনাযুক্ত ঘন কালো, ঘোলাটে পানির সাথে কেঁচোসহ নানা পোকা মাকড় যুক্ত হচ্ছে। একদিকে সংকট তার উপর দুর্গন্ধযুক্ত পানি নগর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে বেশ কিছু দিন যাবত্ এই সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে পানি সংকটের চাইতে পানি দূষণের বিষয়টি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পুরান ঢাকাসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানির দাবিতে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি ভাংচুর,বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। কিন্তু পানি সংকটের কোন সুরাহা হচ্ছে না। বাসিন্দাদের অভিমত, অবিলম্বে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। নইলে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ওয়াসা জানায়, বছরে মার্চ থেকে মে মাস শুষ্ক মৌসুমে এই সমস্যা বেড়ে যায়। ঢাকা শহরে দিনে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন লিটার পানি দরকার। কিন্তু ১ দশমিক ৯ থেকে ২ বিলিয়ন পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর ৩ ফুট করে নিচে নামছে। এর ফলে পানি স্বল্পতা বাড়ছে। শাঁখারী বাজারের গৃহবধূ শর্মিলা বসু ইত্তেফাককে বলেন, এমনিতেই পানি সংকট। তার উপর দুর্গন্ধ আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ওয়াসার লাইনে সরবরাহকৃত পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ আসছে। কালচে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি মুখে তোলা যাচ্ছে না। ফুটানোর পর পানির পাত্রের তলায় কালো কাঁদার ন্যায় গাদ জমা হচ্ছে। বিশুদ্ধ না হওয়ায় পানি পান করা সম্ভব হচ্ছে না। একই এলাকার বাসিন্দা সনদ নন্দী জানান, ওয়াসার পানির সাথে ময়লা, কেঁচো এমনকি পয়োঃবর্জও আসছে। দূষিত পানি পান করে তার পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার দুই ছেলে শৈলেন ও অসীমকে গত মঙ্গলবার মহাখালী উদারাময় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা বর্তমানে শাঁখারী বাজার পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার ১টি গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে পান করছেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিত্সক মো. আবু নোমান ইত্তেফাককে বলেন, দুর্গন্ধের কারণে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি পান করা যাচ্ছে না। পুরান ঢাকার হতদরিদ্র অনেক পরিবার নিরূপায় হয়ে ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করেও শেষ রক্ষা পাচ্ছে না। এতে করে তারা নানা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুরা এর খেসারত দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অনেকেই কেরানীগঞ্জ থেকে পানি এনে পান করছেন। দুর্গন্ধ পানির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রহমতুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, সঠিকভাবে পানি বিশুদ্ধকরণ করা হয়। ফুটানো পানি নিরাপদ। তবে প্রতিনিয়িত ওয়াসার লাইন থেকে পানি চুরি হচ্ছে। মেইন লাইন ছিদ্র করে এটা করার কারণে পানিতে ময়লা প্রবেশ করছে। ওয়াসার কিছু পুরান লাইন থাকার কারণে এটা হতে পারে। এছাড়া বাসা-বাড়িতে যে ট্যাংক রয়েছে তা দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার কারণে পানি দুর্গন্ধ হতে পারে।