মানবতাবাদী লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং পরলোকে

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২৩:৩৬
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং আর নেই। শতবর্ষ পূরণের এক বছর আগে ৯৯ বছর বয়সে গতকাল মানবতাবাদী এই বুদ্ধিজীবী মৃত্যুবরণ করেন। বৃহস্পতিবার দুপুর বারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে ৯৯ বছর বয়সে নয়াদিল্লির সুজন সিং পার্কে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খুশবন্ত সিং যেক্ষেত্রেই কাজ করেছেন সেখানেই শীর্ষে বিরাজ করেছেন। মুক্তচিন্তাবিদ হিসাবে সারাবিশ্বেই তিনি সমাদৃত। সাংবাদিকতায় যেমন তেমনি ঔপন্যাসিক হিসাবে তিনি খ্যাতির শীর্ষে বিরাজ করেছেন। রাজনীতি, ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্যের কলামে, রম্যরচনা এমনকি কৌতুকের বই লিখেছেন। রাজনীতিও করেছেন, ছিলেন সংসদ সদস্য। খুশবন্তের প্রয়াণে ভারতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। চিত্রতারকা শাহরুখ খান এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদিও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অসংখ্য ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী শোক প্রকাশ করে বিভিন্ন লেখা পোস্ট করছেন। খুশবন্ত সিংয়ের ছেলে রাহুল সিং জানিয়েছেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছিলেন। রাহুল বলেন, ‘বাবা কপটতা, মৌলবাদ ঘৃণা করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ।’ গতকাল সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ১৯১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের হাড়ালিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর অঞ্চলটি পাকিস্তানের অধীনে চলে যায়। তিনি সংবাদপত্র যোজনা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এছাড়াও ভারতের ‘দ্য ন্যাশনাল হেরাল্ড’ ও ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ও সম্পাদনা করেছেন। এছাড়া ‘দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’র সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, ‘আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল’ এবং ‘দিল্লী’ তার বিখ্যাত বই। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ গ্রন্থটি তার বহুল আলোচিত এক গ্রন্থ। যা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পটভূমি নিয়ে লেখা। লেখকের পরিবারও দেশভাগের কারণে লাহোর ছেড়ে নয়াদিল্লিতে বসবাস শুরু করেন। লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা এ গ্রন্থটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বইটির জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার গ্রোভ প্রেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। খুশবন্ত ৯৫ বছর বয়সে ‘দ্য সানসেট ক্লাব’ উপন্যাস লিখেন। তার দুই খণ্ডের ননফিকশন, ‘অ্যা হিস্ট্রি অব দ্য শিখস’ ছাড়াও অনুবাদ, সামপ্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে লেখা, উর্দু কবিতা সব মিলিয়ে তার লেখার পরিমাণ অনেক। ২০০২ সালে পেঙ্গুইন থেকে তার আত্মজীবনী ‘ট্রুথ, লাভ অ্যান্ড এ লিটল ম্যালিস’ প্রকাশিত হয়। রাজধানী দিল্লির শিখদের সংস্কৃতি ও দিন গুজরান নিয়েও তিনি গ্রন্থ লিখেছেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের লোকসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালে খুশবন্ত ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক পদ্মভূষণ লাভ করেন। কিন্তু অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রতিবাদে ১৯৮৪ সালে তিনি পদ্মভূষণ ফিরিয়ে দেন। ২০০৭ সালে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন। তা বাবা স্যার শোভা সিং এর ছিল কন্সট্রাকশনের ব্যবসা। নয়াদিল্লির অনেক দৃষ্টিনন্দন ভবন তার বাবার প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত। তার মা লেডি ভেরিয়ম কোউর ছিলেন এক বিদুষী মহিলা। লাহোর কলেজে পড়া শেষ করে খুশবন্ত সিং পাড়ি জমান ক্যামব্রিজের কিংস কলেজে। লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়া শেষ করে দেশে ফিরে তিনি লাহোরে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নয়াদিল্লিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুর আগে তিনি এ পেশাতেই ছিলেন। নয়াদিল্লিতে এসে তিনি মিনিস্ট্রি অব এক্সটার্নাল এফেয়ার্সে যোগ দেন। এরপর ১৯৫১ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন।