দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা তথা স্বল্পোন্নত দেশের কালোটিকা থেকে মুক্তির রূপকল্প আছে। লক্ষ্য অর্জনে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন খাতে অগগ্রতির একটি সময়ভিত্তিক রূপরেখা দেয়া হয় তাতে। আর বলা হয়, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্্যাপন করবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিকে আনন্দময় ও তৃপ্তিদায়ক করতে এর চেয়ে বড় উপকরণ আর কিইবা হতে পারে। এই উন্নয়ন-স্বপ্ন পূরণের কাজ শুরু হয় সরকারের প্রথম দিন থেকে
স্বল্পোন্নত বিশ্বের ৪৯টি দেশের একটি বাংলাদেশ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ খেতাবটি স্বাধীনতার আগে থেকেই লেগে আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। সেই লক্ষ্যেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ মার্চ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর দ্বিতীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাঁর নেতৃত্বে কাজও শুরু হয়েছিল। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। দারিদ্র্য হ্রাস, কৃষি বিপ্লব সাধন এবং আমদানি বিকল্প পণ্য উত্পাদনের মাধ্যমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৭৩-১৯৭৮ প্রণয়ন করেছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ও পরাজিত শক্তি জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণের মূল শক্তিকেই হত্যা করে। সেই থেকে শুরু হয় সুদিনের অপেক্ষা।
নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মধ্যদিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। দেশ আবার উন্নয়নমুখী হয়। কিন্তু দেশের সামর্থ্যের সাথে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ না করায় লক্ষ্যভেদী উন্নয়ন হয়নি। ছিয়ানব্বইয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকার বঙ্গবন্ধুর মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা ঢেলে সাজায়। ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৯৭-২০০২ প্রণয়ন করে। ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি সম্প্রসারণ করা হয়। দেশের প্রধান শত্রু দারিদ্র্য বছরে দেড় শতাংশ করে হ্রাস পায়। দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশে নেমে আসে। সবাইকে নিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করার কৌশল অবলম্বন করায় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের আয়-রোজগারের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হয়। মানুষ কিছুটা হলেও স্বাধীনতার স্বাদ পায়। ২০০১ সালে হোমওয়ার্ক করে আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিকল্পিত নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়। পরের পাঁচ বছর ৫ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিচারে দেশের উন্নয়ন হলেও উন্নয়নের স্বাদ পেয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কার্যকর কর্মসংস্থান হয়নি। তখন দুর্নীতি চরমে পৌঁছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশন্যালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত উপর্যুপরি পাঁচ বছর দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি হয় কিন্তু এর বিচার হয় না। বরং দুর্নীতিবাজরাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে। সমাজ তাদেরকেই সমীহ করে, তাদের জয়গান করে, বা করতে বাধ্য হয়। আমলাতন্ত্র তাদেরকে কাছে টেনে আহ্লাদিত হয়। প্রতিকারকারীরা তা দেখেও না দেখার ভান করে। বিশ্ব জুড়েই দুর্নীতি আছে- এ ধোয়া তুলে অর্থনীতির প্রধান এই শত্রুকে আস্কারা দেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পিছনে বড় প্রেরণা জুগিয়েছে দলটির নির্বাচনী ইশতেহার। তাতে জনগণের ৩৮ বছরের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকনির্দেশনা আছে। দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা তথা স্বল্পোন্নত দেশের কালোটিকা থেকে মুক্তির রূপকল্প আছে। লক্ষ্য অর্জনে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন খাতে অগগ্রতির একটি সময়ভিত্তিক রূপরেখা দেয়া হয় তাতে। আর বলা হয়, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্্যাপন করবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিকে আনন্দময় ও তৃপ্তিদায়ক করতে এর চেয়ে বড় উপকরণ আর কিইবা হতে পারে। এই উন্নয়ন-স্বপ্ন পূরণের কাজ শুরু হয় সরকারের প্রথম দিন থেকে। সময় মাত্র ১৩ বছর।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ইশতেহারের লক্ষ্য পূরণে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ প্রণয়ন করে। এর আলোকে কৃষির আধুনিকায়ন, ম্যানুফেকচারিং ও সেবাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অধিক উত্পাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সর্বোপরি দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কর্মমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১১-১৫ প্রণয়ন করে। বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনের ধারায় ইতোমধ্যে পাঁচ বছর পেরিয়েছে। এই সময়ে দারিদ্র্য ৪০ শতাংশ থেকে ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো গড় অর্জন ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকার প্রবৃদ্ধির ছোঁয়া সকলের মধ্যে পৌঁছে দিতে নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের মোট কর্মক্ষম নারীর প্রায় ৩০ শতাংশ এখন উত্পাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছে। যা পাঁচ বছর আগেও ১০ শতাংশের নিচে ছিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা সত্ত্বেও পণ্য রপ্তানিতে বছরে গড়ে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অপরদিকে উন্নত বিশ্বে রপ্তানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং এলডিসিগুলো সম্মিলিতভাবে ২০১০ ও ২০১১ সালে প্রায় ২৫ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও ২০১২ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০১৩ সালে ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বসেরা সাফল্য অর্জন করেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। পাঁচ বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে। প্রায় এক কোটি বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের আয় বেড়েছে। মাথাপিছু আয় ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। যেখানে ২০০৮-এ ছিল ৬৩০ ডলার।
নারীশিক্ষা প্রসারে সরকারের উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও উপকরণ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রণোদনা ভাল ফল দিচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। খুব কম উন্নয়নশীল দেশই এমন সাফল্য দেখাতে পেরেছে। অপুষ্টি রোধে সরকার কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে কৃষক নিজের জমি ও খামারেই সব ধরনের পুষ্টিপণ্য উত্পাদন করতে পারে। নিজের ঘরে উত্পাদিত হলে তা নিজেরা খেতেও পারবে। এজন্য দেশব্যাপী “একটি বাড়ি, একটি খামার” প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশে কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৪৪ শতাংশ কৃষিখাতে নিয়েজিত আছে। সরকারি প্রণোদনা, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তির প্রাপ্যতা নিশ্চিত, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ভোক্তা চাহিদা বাড়ার ফলে কৃষক লাভবান হয়েছে। তারা কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। কৃষি উত্পাদনশীলতাও অনেক বেড়েছে। কম জমিতে অধিক ফসল উত্পাদিত হচ্ছে। জনসংখ্যা ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশ চাল উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে উঠেছে। কৃষিখাতেও উত্পাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি জাতীয় অর্থনীতির সাথে যুক্ত হচ্ছে। সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য নিরাপত্তা দিচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বেশকিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছে। শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ৩৩ জনে নেমে এসেছে। যা জাতিসংঘের দেয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম। বিশ্বের খুব কম দেশই এত দ্রুত এত ভাল সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। মাতৃমৃত্যুর হারও প্রতি লাখে ১৮৫ জনে নেমে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বেশ সফলতা দেখিয়েছে। সিডর ও আইলায় ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়াই এর প্রমাণ। সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং পরিবর্তনের সাথে খাপ-খাওয়ানোর লক্ষ্যে বৈদেশিক অর্থায়নে পুনর্বাসন, কৃষি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তারপরও বাঙালি জাতি হিসেবে দুর্যোগ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচণ্ড সামর্থ্য রাখে। বারবার তা প্রমাণও করেছে। এসব অর্জন মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার পথে কতটুকু অগ্রগতি এনে দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা হওয়ায় রূপকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে না। বরং ২০০৯-এর সরকার তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যেখানে এগিয়ে রেখে গিয়েছিল নতুন সরকার সেখান থেকেই আবার কাজ শুরু করতে পেরেছে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ধারায় কোনো ছেদ পড়েনি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৬-২০২০ প্রণয়নেও কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকছে না। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া সম্ভব। কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী অগ্রগতি হলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক হতে পারবো তার একটা হিসাব থাকা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান আংটাডের ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিবেদন ২০১৩’ অনুযায়ী তিনটি বড় বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারলে একটি স্বল্পোন্নত দেশ উন্নয়নশীল দেশ তথা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এক. দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় তিন বছরে গড়ে ৯৯২ ডলার হলে এবং বর্তমান মাথাপিছু আয় ১ হাজার ১৯০ ডলার হলে; দুই. মানব সম্পদ সূচক, তথা ক) পুষ্টি বা কত শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে আছে, খ) স্বাস্থ্য তথা শিশুমৃত্যুর হার কত, গ) স্কুলে ভর্তি তথা মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার হার এবং ঘ) শিক্ষার হার তথা বয়স্ক শিক্ষার হার; এবং তিন. অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সূচক। এখানে ছয়টি সূচক আছে। ক) প্রাকৃতিক ঝুঁকি তথা কৃষি উত্পাদনে অনিশ্চয়তা সূচক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত শতাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খ) বাণিজ্য বিষয়ক ঝুঁকি তথা পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কেমন। গ) বাহ্যিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তথা কত শতাংশ মানুষ নিম্নাঞ্চলে বসবাস করে। ঘ) ঝুঁকির অর্থনৈতিক দিক তথা কৃষি, বন ও প্রাণিসম্পদ থেকে জিডিপি’র কত শতাংশ আসে এবং পণ্য রপ্তানির পরিমাণ সূচক। ঙ) ক্ষুদ্রাকার তথা জনমিতি এবং চ) দুর্গমতা বা দুর্গমতা সূচক। এই সবগুলো মিলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সূচক তৈরি করা হয়। এই জটিল প্রতিটি সূচকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে একটি দেশ গ্র্যাজুয়েশন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কমপক্ষে দুইটিতে পরবর্তী ছয় বছর এই অর্জন ধরে রাখতে পারলে জাতিসংঘ তখন উন্নতি অনুমোদন করে। তবে জিডিপি অর্জনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়। যদি কোন দেশ জিডিপি’র নিম্নসীমা অর্থাত্ ১ হাজার ১৯০ ডলারের দ্বিগুণ জিডিপি অর্জন করতে পারে তাহলেই সেই দেশ উন্নয়নশীল ক্যাটাগরির জন্য বিবেচিত হবে। অন্য দুইটি বৈশিষ্ট্যে অর্জন কতটুকু তখন তা বিবেচনায় নেয়া হয় না। বাংলাদেশ দ্বিতীয় বিকল্পে এগোচ্ছে না। কারণ খেটে খাওয়া মানুষের দল আওয়ামী লীগ দারিদ্র্য বিমোচনমূলক নীতির মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যা বর্তমানে উন্নত ও দাতা সংস্থাগুলো ইনক্লুসিভ গ্রোথ বা সবাইকে নিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সরকার গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। তদুপরি বাংলাদেশের এখন জনমিতির সবচেয়ে লাভজনক অবস্থায় আছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখন কর্মক্ষম। অর্থাত্ তাদের বয়স ১৬ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। বিশ্বের কোনো দেশে এমন জনমিতি কয়েকশত বছরের মধ্যে একবার আসে এবং তা গড়ে ৩০ বছর স্থায়ী হয়। বাংলাদেশ এখন সেই শুভযোগে প্রবেশ করেছে। এই বিশাল জনশক্তিতে কাজে লাগাতে উন্নয়ন কমর্কাণ্ডে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রূপকল্প অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার অর্জনের লক্ষ্যে বিগত পাঁচ বছরের অর্জনকে বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে। শিল্পায়নে শ্রমশক্তির ২৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যও পূরণ করতে হবে। তাহলে উন্নয়ন ইনক্লুসিভ ও টেকসই হবে। বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে।
