সরকারের একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত শিক্ষা এবং প্রতি বছরই এ খাতে ব্যয় বাড়ছে। শিক্ষার উন্নয়নে সদিচ্ছার অভাব না থাকলেও সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে সংকট থেকেই যাচ্ছে। দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ৩২৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২১৩টি বিদ্যালয়েই প্রধানশিক্ষকের পদ খালি রয়েছে। এছাড়া সহকারী প্রধানশিক্ষকের পদও খালি রয়েছে শতাধিক। সহকারী প্রধানশিক্ষকের পদমর্যাদা আর সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদমর্যাদা একই হওয়ায় সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা যে রিট করেছে, তাতেই সহকারী প্রধানশিক্ষকদের পদোন্নতি আটকে যায়। আর এতেই সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। শিক্ষা অধিদফতর থেকে সহকারী প্রধানশিক্ষক ও সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অভাবে তা আটকে আছে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে বিপুলসংখ্যক সহকারী প্রধানশিক্ষক ও প্রধানশিক্ষকের পদ খালি রয়েছে সেগুলো পূরণ করতে শিক্ষা অধিদফতর থেকে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা আমলে নিয়ে পদোন্নতি জটিলতা দূর করতে হবে।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় অপেক্ষা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভালো লেখাপড়া হয় বলে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের পছন্দের তালিকায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের এই ধারণার যেন ব্যত্যয় না ঘটে তার জন্য যত দ্রুত সম্ভব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খালি পদগুলো পূরণ করতে হবে। শিক্ষার মান ধরে রাখতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন উপকৃত হবে, তেমনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানও ধরে রাখা সম্ভব হবে। তাছাড়া সহকারী প্রধানশিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হলে একদিকে বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট যেমন দূর হবে, তেমনি নতুন করে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। যেখানে অনেক শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। তাছাড়া দেশে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে থাকলেও তারা সুযোগের অভাবে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে না। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম খরচে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারে। তাই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যাতে কমে না যায় তার জন্য জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ অত্যাবশ্যকীয়।
আর ৩০৪টি সরকারি কলেজ ও সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ হাজার ১৪৫টি শিক্ষক পদ শূন্য। ২০টি কলেজে অধ্যক্ষের পদও ফাঁকা। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকদের অবসরে যাওয়ার কারণে যে সব পদ শূন্য হচ্ছে সেসব পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগ না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে শিক্ষক সংকট তেমন একটা না থাকলেও মফস্বলের সরকারি কলেজগুলোকে এজন্য ধুঁকতে হচ্ছে। সঠিক সময়ে নিয়োগ না দেওয়ায় শিক্ষক সংকট সরকারি কলেজগুলোতে নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্মর্তব্য, সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে ২৭০টি কলেজ, চারটি আলিয়া মাদ্রাসা, ১৬টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট ও ১৪টি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে শিক্ষকের সৃষ্ট পদ ১৪ হাজার ৮৭৬টি। এর মধ্যে প্রভাষকের ৭ হাজার ৫৩৯টি পদের মধ্যে ২ হাজার ২৮৯টি ফাঁকা। সহকারী অধ্যাপকের ৪ হাজার ১২৭টি পদের মধ্যে ৪৮৯টি, সহযোগী অধ্যাপকের ২ হাজার ৩৯৪টি পদের মধ্যে ২৯১টি এবং অধ্যাপকের ৮১৬টি পদের মধ্যে ৭৬টি পদ শূন্য। অধ্যক্ষের পদ ফাঁকা হওয়ার পর নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কিন্তু অন্যান্য পদে সহজে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। সরকারি চাকুরেদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়ানোর ফলে গত দুই বছর কেউ অবসরে যাননি। কিন্তু ওই সময় পার হওয়ার পর গত ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিনই কোনো কোনো শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। ফলে শূন্য পদের সংখ্যাটিও বাড়ছে।
আমার মতে, বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কলেজগুলোতে এখন যেহেতু চার বছর মেয়াদি সম্মান কোর্স পড়ানো হচ্ছে এবং ডিগ্রি কোর্স তিন বছর করা হয়েছে, সেহেতু চাহিদা অনুযায়ী আরও পদ সৃষ্টি করে মেধাবীদের নিয়োগের কথা ভাবতে হবে।
ঢাকা
