১৯৮১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। অসলোতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ফুটবল পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছিল নরওয়ে।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই কিংবদন্তী ধারাভাষ্যকার বোর্হে লিলিয়েনের কালজয়ী সেই চিত্কার শোনা গেল রেডিওতে, ‘আমরাই বিশ্বসেরা! আমরাই বিশ্বসেরা! আমরা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি। ফুটবলের সুতিকাগার ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি। লর্ড নেলসন, লর্ড বেভাব্রুক, স্যার উইনস্টন চার্চিল, স্যার ইডেন, ক্লেমেন্টে অ্যাটলি, হেনরি কুপার, লেডি ডায়নার দেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি। শুনতে পাচ্ছেন, ম্যাগি থ্যাচার? শুনতে পাচ্ছেন! আমরা আপনাদের সব্বাইকে হারিয়েছি; সব্বাইকে।’
ভাগ্যিস হংকংয়ে বোর্হে লিলিয়েনের মতো দুনিয়া কাঁপানো কোনো ধারাভাষ্যকার নেই। তাই এ যাত্রা প্রত্যক্ষ অপমানের হাত থেকে হয়তো বেঁচে গেলে বাংলাদেশের কিংবদন্তীরা। বেঁচে গেলেন দেশের কালজয়ী রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে খেলোয়াড়রা। তবে কেউ মুখ ফুটে বলুক আর নাই বলুক, এটা সত্যি যে, মুশফিকুরদের হারানোর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ ও তাদের মহান পূর্বসুরীদের সবাইকেই আসলে পরাজয়ের এক লজ্জা উপহার দিয়ে গেল হংকং।
হংকংয়ের জন্য এটা নিশ্চয়ই করে তাদের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা ঘটনা। যুগের পর যুগ ধরে তাদের গৌরবগাথার অংশ হয়ে থাকবে এই জয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য? লজ্জা, অপমান, হতাশা; যতো ধরনের নেতিবাচক আবেগের কথা ভাবা যায়, সব জড়িয়ে গেছে এই ম্যাচের সঙ্গে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ; সবাই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—কেন এই লজ্জার পরাজয়?
একটা ক্রিকেটীয় উত্তর হল, এমন হতেই পারে। বাংলাদেশ নিজেও এর আগে অনেক সহযোগী দেশের কাছে বিভিন্ন ফরম্যাটে হেরেছে—আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, কানাডা থেকে শুরু করে আফগানিস্তান; অনেকেই হারিয়েছে বাংলাদেশকে। আবার বাংলাদেশও যখন একেবারেই দুর্বল দল ছিল, তখনও বিশ্বসেরা পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে। ফলে ক্রিকেটে দৈত্যবধ বা ছোটদের কাছে হারটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্নটা খুব তীব্র হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের হারের ভঙ্গির কারণে। দৃশ্যত যে পরিকল্পনা দেখা গেছে, তার বড় বড় ফাঁকের কারণেই সমালোচনাটা এতো তীব্র হয়ে উঠেছে।
প্রথম এবং সর্ববৃহত্ প্রশ্ন হল, এই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভঙ্গি নিয়ে। তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহমান সেট হওয়ার আগেই আউট হয়ে গেছেন; তাদের ভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। সাকিব আল হাসান ও এনামুল হক বিজয় একটু সেট হয়ে রানরেটের চিন্তায় আক্রমণাত্মক খেলে আউট হয়েছেন; এ পর্যন্তও আপনি ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও ফরহাদ রেজা; এরা কী জবাব দেবেন। ১১.৪ ওভারে যখন বাংলাদেশ ৮৯ রান তুলে ফেলেছে; তখন স্লগ শট করে রান বাড়ানোর চেষ্টা করাটা খুব জরুরি ছিল? বিশেষ করে যখন চারটে উইকেট পড়ে গেছে!
মুশফিক ম্যাচ শেষে বলেছেন, পরের ব্যাটসম্যানরা অমন আত্মসমর্পণ করবেন, তিনি কল্পনা করেননি।
প্রথমত অধিনায়ক এমন কথা ভেবে বাজে শটের দায় এড়াতে পারেন না; এটা হঠকারিতা। দ্বিতীয় কথা হল, কাদের ওপর ভরসা করছেন, মুশফিক? রিয়াদ ও ফরহাদ। খুব নির্দয়ভাবে বললে বলতে হয়, দু’জনই বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ দলের জন্য রীতিমতো বিপদের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছেন। না ব্যাটে, না বলে; কোনোভাবেই তাদের থেকে কোনো উপকার পাচ্ছে না দল। বরং এই ম্যাচে অতিসংকটের সময় বল হাতে সমানে হাফভলি ও লেক স্ট্যাম্পের ওপর বল করে ম্যাচটা বের করে দিয়ে এসেছেন সেই ফরহাদ রেজাই।
এটা নিতান্ত শিশুদেরও বোঝার কথা, ১৩ ওভারের মধ্যে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মূল চিন্তাটা হওয়া উচিত ছিল, ২০ ওভার শেষ করে আসা; বিশেষ করে রানরেট ভালো থাকায় সেটা করতে পারলেই ভালো স্কোর আসতে পারতো। কিন্তু নাসির হোসেন একের পর এক বোলারদের স্টাইক প্রান্তে পাঠিয়ে কী প্রমাণ করতে চাইলেন, সেটাও সম্ভবত তিনিই বলতে পারেন! বোলিংয়ে অন্তত শুরুতে মুশফিক যেটা করেছেন, সে জন্য প্রশংসা তার প্রাপ্য। সাকিবকে শেষ দিকের জন্য জমিয়ে না রেখে টানা বল করিয়ে আগে সুপার টেনটা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু তারপর? তারপর কী করলেন মুশফিক! ডেথ ওভারের বোলার আল আমিনকে মিডল ওভারে এনে রানরেট বাড়িয়ে দিলেন। কী এক অদ্ভুত চিন্তা থেকে নাসির, সাব্বিরদের বল দিতেই যেন ভুলে গেলেন। অথচ শিশিরের যুক্তি এদিন আর খাটছিল না। কারণ সাকিব-রিয়াদ ঠিকই বল গ্রিপ করতে পারছিলেন।
শেষ দিকে মুশফিক যে ফিল্ডিং সাজালেন, তা নিয়েও সমালোচনা চলতে পারে। যখন বলে বলে রান দরকার, হংকং মাত্র ৪ উইকেট হাতে নিয়ে খেলছে; তখন মুশফিক ফিল্ডার বাউন্ডারিতে দিয়ে রাখলেন; সহজ সিঙ্গেল বের হতে থাকলো। মুশফিক নিজেও নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন না যে, টি-টোয়েন্টি এতো রক্ষণাত্মক ফিল্ডিংয়ের খেলা!
শেষ পর্যন্ত অনেক সমালোচনা আমরা করতে পারি। কিন্তু আসল সমালোচনাটা মুশফিকদেরই করতে হবে। বাইরের সমালোচনার জবাব দিন আর নাই দিন; নিজেদের সমালোচনার জবাব অন্তত বের করতে না পারলে এই ধাঁধাঁ থেকে বেরও হওয়া কঠিন হবে।
