নৃিখাঁজ বিমান
বিমানটি লাপাত্তা হওয়ার আগে কোনো বিপদসংকেত দেয়নি
ছিনতাই হলে তা এত সূক্ষ্ম কিভাবে সম্ভব, বোঝা যায়নি
অনুসন্ধানে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ২৬টি দেশ
সর্বশেষ পরিস্থিতি
অস্ট্রেলিয়ার দাবি স্যাটেলাইট চিত্রে তারা দক্ষিণ ভারত মহাসাগর দু’টি বস্তুর সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু দু’দিন ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো আলামত পাওয়া যায়নি
হাইজ্যাকিং না প্যারাজ্যাকিং?
হাইজ্যাকিং অনেক সময় প্যারাজ্যাকিং হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা বিমানের ভেতর ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ ঘটিয়ে প্যারাসুটের মাধ্যমে বিমান থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে
৭ মার্চ। মালয়েশিয়াতে দিন পার হয়ে স্থানীয় সময় রাত ১২ টা ৪১ মিনিট। বোয়িং বি ৭৭৭-২০০ সিরিজের যাত্রীবাহি বিমানটি (এমএইচ ফ্লাইট ৩৭০) কুয়ালালামপুর থেকে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভেতরে বসা ২৩৯ জন যাত্রী। বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বিমানটির অবতরণ করার কথা। যাত্রীদের স্বজনরা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন এই বুঝি তার প্রিয়জন এলেন।
রাত পার হয়ে গেল। কিন্তু বিমানটি আর অবতরণ করেনি। সকালে পাওয়া যায় ভয়ংকর খবর। বিমানটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! নিখোঁজের প্রায় ৪ ঘন্টা পর ভিয়েতনামের এক নৌ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দেশটির তুয়োই ট্রে বার্তা সংস্থা বিমানটি ‘বিধ্বস্ত’ হয়েছে বলে খবর দেয়। পরে জানা যায়, স্থানীয় সময় রাত ২ টা ৪০ মিনিটে বিমানটি নিখোঁজ হয়। অবশ্য এটি লাপাত্তা হওয়ার আগে কোনো বিপদ সংকেত দেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং ৭৭৭ এর ১৯ বছরের ইতিহাসে এমন রহস্যজনক ঘটনা আর ঘটেনি। রাত ২টা ৪০ মিনিটের পর বিমানটির সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি সুবাং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল। এরপর দুই সপ্তাহ হলেও খোঁজ মেলেনি বিমানটির। রহস্য কেবল একটি কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিমান নিখোঁজের পর থেকে মালয়েশিয় কর্তৃপক্ষ অনেক তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু কোনোটিই সত্য হয়নি। তারা অনেক তথ্য শুনেছেনও। কিন্তু কোনোটিই সঠিক হয়নি। আবার কোনোটি নাকচও করেননি। অভিযানে অংশগ্রহনকারী দেশগুলো অনেক সময় অনেক তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বজনরা এবং পুরো বিশ্বের কৌতুহলী মানুষ কেবল নানা তথ্য শোনার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন। রহস্যের কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। নানা তথ্য এসেছে। এর মধ্যে একটা তথ্যেই সবচেয়ে বেশি মনোনিবেশ করছেন তদন্তকারীরা। মালয়েশিয়ার তদন্তকারীরা স্পষ্ট বলেছেন, তারা বিমান ছিনতাই হওয়ার বিষয়টি সবচে আগে বিবেচনায় নিয়েছেন। ছিনতাই যদি হয়ে থাকে তাহলে কিভাবে এত সুক্ষ ছিনতাই সম্ভব হলো তা ভেবে হয়রান বিমান সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা।
দ্য ওয়্যার ম্যাগাজিন জানিয়েছে, ৯/১১ হামলার পর বানিজ্যিক পাইলটদের এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যে, বিমানের যাত্রীদের জীবন যতই হুমকির সম্মুখীর মুখে পড়ুক না কেন, ককপিটের দরজা খোলা যাবে না। যদি দরজা আগে থেকে খোলা থাকে তবে বিপদ বুঝলে পাইলট কিংবা সহকারী পাইলট ছিনতাইয়ের সর্বজনীন কোড ব্যবহার করতে পারেন। নিখোঁজ বিমানটি ছিনতাই হয়ে থাকলে পাইলটরা সেটি কেন করলেন না তা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তাহলে কি তারা নিজেরাই এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন? কেউ বলছেন, হ্যাঁ। কেউ বলছেন, উত্তর দেয়া কঠিন।
ম্যাগাজিনটি জানায়, ‘হাইজ্যাকিং’ অনেক সময় ‘প্যারাজ্যাকিং’ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা বিমানের ভেতর ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ ঘটিয়ে প্যারাসুটের মাধ্যমে বিমান থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বিমানটি ও তার যাত্রীরা ধ্বংস হলেও অপরাধীরা বেঁচে যায়। ছিনতাই করে বিমানটি কোথাও নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও পড়লো না আবার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যও সফল হলো। ৭০ দশকে এরকম একটি অভিনব ঘটনা ঘটিয়েছিল ডি.বি কুপার নামের একজন ছিনতাইকারী। কুপার উত্সাহিত হয়েছিলেন এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান ছিনতাইয়ের পর থেকে।
অনেক পাইলট নিজেরাই কাজটি করে থাকেন। এসব কাজের আগে তারা ভাল সাজেন এবং তথ্য সংগ্রহ করেন। মাঝে মাঝে তারা বিভ্রান্তও হন। এই যেমন রজার হোল্ডার। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি ওয়েস্টিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট-৭০১ এর প্রধান ছিনতাইকারী ছিলেন। তিনি ভিয়েতনামে চার বার ফ্লাইট নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যাত্রীদের সঙ্গে চালাকি করেছিলেন। তিনি যাত্রীদের বলেছিলেন, তার সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাসদানকারী ৪ জন ব্যক্তি আছেন।
মালয়েশিয়ার বিমান ‘ছিনতাইকারীকে’ও বের করতে হয়েছে কিভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যর করা যায়। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে মনে হচ্ছে, বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। এই বিমানটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের আওতায় না থাকলে সেটি সবার জন্য মঙ্গলজনক। কারণ তারা ভবিষ্যতে এটা হামলার জন্য ব্যবহার করতে পারে। ২০০ ফুট পাখাওয়ালা এত বড় বিমানটি কোনো স্থানে লুকিয়ে রাখা সত্যিই কঠিন। অবশ্য এই যুগে ছিনতাইয়ের কাজটি অনেকটাই কঠিন। কারণ বিমানে ওঠার আগে আগের চেয়ে কঠোর তল্লাশি করা হয়।
নতুন তথ্য এবং নাকচ : মালয়েশিয়ার বিমানটি দিয়ে ৯/১১ হামলার মতো ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা ছিল বলে সন্দেহ হচ্ছে। মার্কিন আদালতে আল-কায়েদার একজন সাবেক তথ্যদাতার বক্তব্যে এ তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকাটি এ তথ্য জানিয়েছে। সাজিদ বাদাত নামের ওই তথ্যদাতা জানান, তার সঙ্গে আফগানিস্তানের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৪-৫ জন লোকের সাক্ষাত্ হয়। তাদের একজন ছিলেন পাইলট। তিনি তাদের একটি ‘জুতা বোমা’ দেন। এর মাধ্যমে ককপিটের দরজা বন্ধ থাকলেও দরজা খোলা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, বিমানটি ভারত মহাসাগরের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবতরণ করতে পারে। অর্থাত্ এটি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করতে পারে। এটি ভারত থেকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে বিশাল বন রয়েছে। এখানে যে উপজাতিরা আছে তাদের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ খুব কম। এফবিআই’র সহকারী পরিচালক জেমস কালস্ট্রম বলেন, এটি একটি ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’। এটি একটি জটিল বিষয়। তদন্তকারীদের এই সম্ভাবনাটিকেও খতিয়ে দেখা উচিত। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা এই দাবি প্রত্যাখান করেছেন। তারা বলেছেন, ২শত ফুটের বেশি দৈর্ঘ্যের একটি বিমান এখানে অবতরণ করা সম্ভব নয়। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র হারমিট সিং বলেন, দ্বীপটির রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারে প্লেন এবং হেলিকপ্টার দিয়ে তল্লাশি চালিয়ে কিছুই পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভারতীয় নৌবাহিনীর রাডারেও কিছু ধরা পড়েনি। আন্দামান ক্রনিকেল পত্রিকার সম্পাদক ডেনিস গিলেস বলেন, এখানে এত বড় বিমানের অবতরণের মালয়েশিয়ার নিখোঁজ বিমনটি কোথায় কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে এতদিন নানা কথা শোনা গিয়েছে।
কউ কেউ মনে করেছিলেন, এটা পানিতে কিংবা স্থলে বিধ্বস্ত হতে পারে। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাভিত্তিক জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা রোধ সংস্থা সিটিবিটিও জানিয়েছে নিখোঁজ বিমানটি কোথাও বিস্ফোরিত হয়নি। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন, বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হলে কিংবা বিধ্বস্ত হলে সেটা সিটিবিটিও জানতে পারবে। কারণ এক্ষেত্রে যে চারটি প্রযুক্তি ব্যবহূত হয় তার মধ্যে তিনটি প্রযুক্তি সিটিবিটিওি’র আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার (আইএমএস) আছে। সংস্থাটি ক্ষুদ্র পরমাণুর বিস্ফোরণও ধরতে পারে। আর একটি বড় বিমান বিধ্বস্ত হলে সেটা ধরা পড়বেই। সংস্থাটির নির্বাহী সচিব ল্যাসিনো জারবো বলেন, তাদের এমন একটি নেটওয়ার্ক আছে যার দ্বারা সারা পৃথিবীতে কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটলে কিংবা ভূমিকম্প হলেও তারা জানতে পারবে। এজন্য ইনফ্রাসাউন্ড এবং ইনফ্রাসোনিক নামের দুটি প্রযুক্তি রয়েছে। গ্রহণযোগ্য প্রযুক্তি ইনফ্রাসাউন্ড।
প্রথমে ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, তাদের উপকূলে কিছু বস্তু ভাসতে দেখা যায়। পরে সেটি কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। বিমানটির গন্তব্য নিয়েও সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না কেউ। মালয়েশিয়ার বিমান বাহিনীর প্রধান রোদজালি দাউদ ৯ মার্চ জানান, বিমানটি তার নির্ধারিত গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে আসতে চেয়েছিল। বিমান কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ওড়ার অন্তত ২ ঘন্টা পরও আকাশে ছিল বিমানটি। তাহলে বিমানটি ভিয়েতনাম পেরিয়ে যাওয়ার কথা। ১১মার্চ মালয়েশিয়ার বিমান বাহিনীর এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় শহর কোটা ভারু এবং ভিয়েতনামের দক্ষিণ প্রান্তের মাঝামাঝি জায়গায় বিমানটি কিছুটা নীচে নেমে আসে। এবং মালাক্কার দিকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, সেনাবাহিনীর রাডারে শনিবার রাত পৌনে ৩টা নাগাদ বিমানটির অবস্থান দেখিয়েছিল মালাক্কা প্রণালীর পুলাও পেরাক দ্বীপের কাছে। কিন্তু ওই কর্মকর্তা যে সময়ের কথা বলছেন, তার প্রায় ১ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানটির যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিউইয়র্ক টাইমস ১৮ মার্চ জানায়, ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে বিমানের ককপিটে ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসারের মধ্যে হাটু বরাবর থাকার একটি কম্পিউটারের ৭-৮ টি বেতাম টিপে বিমানটির গতিপথ বদলে দেয়। অন্যদিকে যে দুইজন ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে বিমানে চলেছিলেন তারা ইরানের বাসিন্দা। তারা কেউ সন্ত্রাসীর গোষ্ঠীর সদস্য নন।
মালয়েশয়ার পরিবহণমন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুশেন গত ১৩ মার্চ জানান, বিমানটিকে কেউ একজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে। এমনকি বিমানের যোগাযোগ ব্যবস্থাও অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করতে বোয়িং ৭৭৭ সম্পর্কে বিশেষায়িত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। মার্কিন কর্মকর্তারা গত ১৪ মার্চ জানান, বিমানের যোগাযোগের দুটি ব্যবস্থা ১৪ মিনিটের ব্যবধানে এক এক করে বন্ধ হয়ে যায়। দৃশ্যত এটি পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার ১ টা ৭ মিনিটে বিমানের ডেটা রিপোর্টিং সিস্টেম এবং ১ টা ২১ মিনিটে বেতার বার্তা পাঠানোর যন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওয়াল স্ট্রিট জানিয়েছে, বোয়িংয়ের বার্তা প্রেরণের ক্ষমতা বন্ধ হওয়ার ৫ ঘন্টা পরও ইঞ্জিন তথ্য সরবরাহ করে।
অনেকে দাবি করেছেন, নিখোঁজ বিমানটি রাডার ফাঁকি দিতে ৫ হাজার ফুট কিংবা এর নীচু দিয়ে উড়ছিল। এজন্য বিমানটি দুই পর্বতের মাঝের খাদও ব্যবহার করে। কিন্তু এত বড় বিমানের ক্ষেত্রে সেটি করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সাবেক বিশেষ গোয়েন্দা জেফনি বিট বলেন, এটা সম্ভব। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার সময় মার্কিন বিমান এই কাজটি করেছিল।
অনুসন্ধানে ব্যবহূত যা কিছু :আকাশে স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে চীন এবং ভারত। অনুসন্ধানে চীনের ১০ টি স্যাটেলাইট দক্ষিণ চীন সাগরে মোতায়েন রয়েছে। আধা মিটারের সমান দৈর্ঘ্যের বস্তুও এর আওতায় আসবে। ভারত মহাসাগরের ২ হাজার নটিক্যাল মাইল জুড়ে ভারতের স্যাটেলাইট জিস্যাট-৭ নিয়োজিত আছে।
পর্যবেক্ষণকারী প্লেন মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। পি -৩ প্লেন রাডার পানিতে যদি বাস্কেটবলের মতো কোনো বস্তু ভেসে যায় তাহলে ও ধরতে পারে। হেলিকপ্টারে ইনফ্রারেড ক্যামেরা আছে। এটা রাতে উড়তে পারে এবং প্রতি সাড়ে তিন ঘন্টায় ৬শ’ নটিক্যাল মাইল জুড়ে পর্যবেক্ষন করতে পারে। সিঙ্গাপুরের মনুষবিহীন যান দিয়েও পর্যবেক্ষন করা হচ্ছে। ২৪ ঘন্টাই এটি কাজ করছে।
সমুদ্রে তল্লাশি কাজে যুদ্ধজাহাজ নামিয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর,যুক্তরাষ্ট্র, চীন, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম। সমুদ্রের উপরে কোনো বস্তু বা বিমানের ধ্বংসাবশেষ (যদি বিমানটি বিধ্বস্ত হয়) ভেসে থাকলে এবং বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে কোনো শব্দ এলে সেটি ধরা পড়বে।
অপরদিকে, পানির গভীরে ডুবোজাহাজ ব্যবহার করছে সিঙ্গাপুর। এটি ডিএসআর-৬ এসআরভি। ৫শ’ মিটার গভীরে এটি তল্লাশি চালাতে পারে। এতে উদ্ধার করারও প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে। এজন্য এর সঙ্গে এমভি সুইফট নামের একটি ডুবোজাহাজ আছে।
পাইলটকে নিয়ে নানা গুঞ্জন :মালয়েশিয়ার বিমানের শেষ বার্তাটি ছিল, ‘সব ঠিক আছে, শুভরাত্রি’। এই বার্তাটি কে পাঠিয়েছিল তা নিয়ে চলছে গবেষণা। কেউ মনে করছেন পাইলট কিংবা তার সহকারী। কিন্তু নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই । তাই সন্দেহ দানা বাধছে পাইলটকে ঘিরে। তার বাড়িতে ও অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। পাইলট আত্মহত্যা করতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের উইঘুরদের সন্দেহ :মালয়েশিয় কর্তৃপক্ষ চীনের উইঘুর মুসলমানদেরও সন্দেহ করছে। মালয়েশিয়ার এক কর্মকর্তা গত ১০ মার্চ এই আশঙ্কা নাকচ না করে জানিয়েছেন, জাল পাসপোর্ট বহনের কারণে উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মালয়েশিয়া ২০১১ সালে ১১ জন উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা : নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমেভ কেউ বলছেন, পাইলট আত্মহত্যা করছেন। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। আবার কেউ বলছেন ছিনতাই হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার ছিনতাইয়ের বিষয়টি নাকচ করার পর অনেকে লিখেছে তাহলে কি ভিনগ্রহের কেউ বিমানটিকে নিয়ে গেছে। না কি আবার পাইলট ভিনগ্রহের ছিলেন। একজন লিখেছেন, বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছে। রাজনৈতিক শত্রুতাবশত এটা করা হয়েছে। একজন লিখেছেন, প্রযুক্তিবিদরা ট্র্যাকিং কওে একটি ছোট্ট স্মার্টফোনের খোঁজ জানতে পারেন। অথচ একটি বিমানের খোঁজ জানতে পারেন না! জন গল গ্যাথিয়ারের মতে, বিমানটির গঠন কাঠামো অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। পাইলট আত্মঘাতী হয়েই কাজটি করেছেন। ক্রিসের মতে, ভিন গ্রহের কেউ এসে নিয়ে গেছে বিমানটিকে। তারা সবাই ভিন গ্রহের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। কেউ কেউ আবার ধারণা করছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি বা চালকের ভুলের কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হতে পারে।
অনুসন্ধান : প্রথমে দক্ষিণ চীন সাগরে অনুসন্ধান চালানো হয় । এরপর আওতা বাড়িয়ে মালাক্কা প্রণালী। এরপর ভারত মহাসাগার। এরপর বঙ্গোপসাগরেও। বিমানটিকে খুঁজে বের করতে বিশাল দুটি করিডোরে তল্লাশি চলছে। এর একটি মালয়েশিয়ার উত্তরে লাওস থেকে কাস্পিয়ান সাগর এবং দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ ভাগ পর্যন্ত। বিমানটি দক্ষিণ করিডোরে আছে বলে ধারণা। বিমানটির সম্ভাব্য গতিপথ বিবেচনা করে মালয়েশিয়া সরকার দুটি এলাকা জুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। একটি উত্তরমুখী এবং অন্যটি দক্ষিণমুখী। কাজাকস্তান থেকে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় সম্প্রসারিত হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশগুলোর নেতাদের মালয়েশিয়া সরকার ব্রিফও করেছে। কাজাকস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন মিয়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ড আছে এই তালিকায়।
গত শুক্রবার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভারত মহাসাগরে অভিযান শুরু হয়েছে। ভারত মহাসাগর পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। এর গভীরতা ৩ হাজার ৯শ মিটার। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের কমান্ডার উইলিয়াম মার্কস বলেন, এটি যেন দাবার বোর্ড থেকে ফুটবল মাঠে যাওয়া। বিমানটির ব্ল্যাক বক্স থেকেও কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিমানটি ভেঙ্গে সাগরে পড়লে ফ্লাইট রেকর্ডারটি পানিতে ভাসতে থাকবে। এ থেকে নির্গত সিগন্যাল রাডারে ধরা পড়ার কথা। তিনি বলেন, একটি ফুটবলের মতো বড় কিছু সাগরে ভাসতে থাকলেই রাডারে ধরা পড়বে। স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল গ্লোব জানিয়েছে, নিখোঁজ বিমানের অনুসন্ধানে প্রায় ৩০ লাখ লোক অংশ নিয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য : বিমানিট নিখোঁজের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও খোঁজা হচ্ছে। বিমানের পাইলটের সঙ্গে বিরোধী দল আনোয়ার ইব্রাহিমের সম্পর্ক রয়েছে। পাইলট জাহারি আহমেদ শাহ আনোয়ারের দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং তার দল পিপলস জাস্টিস পার্টির সক্রিয় কর্মী। তবে আনোয়ার ইব্রাহিম এধরনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেনে এবং এর সমালোচনাও করেছেন।
সর্বশেষ : নিখোঁজ বিমানটি কোথায় গেল গোটা বিশ্বের আনাচে কানাচে যখন এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন বৃহস্পতিবার কিছুটা আশার বাণী শোনায় অস্ট্রেলিয়া। দেশটি জানায়, স্যাটেলাইটে তোলা ভারত মহাসাগরের ছবিতে তারা এমন কিছু দেখতে পেয়েছে যা হয়তো মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের নিখোঁজ বিমানটির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। এই অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে পার্লামেন্টে এক বিবৃতি দেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট। তিনি বলেন, এই নতুন পাওয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। তিনি জানান, ভারত মহাসাগরে ভাসমান বস্তু দুটির একটি প্রায় ২৪ মিটার লম্বা।
এরপর অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ এই কথিত ‘ধ্বংসাবশেষের’ পেছনে ছোটে। বিমান ও জাহাজ নিয়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয়। কিন্তু কোনো কিনারা করা যায়নি। গতকাল শুক্রবারও ফের তল্লাশি শুরু হয়। স্যাটেলাইট ইমেজে পাওয়া ভাসমান ছবির ওপর ভিত্তি করে পার্থের দক্ষিণ পশ্চিমে আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের গভীর সমুদ্রে চষে বেড়ায় অনুসন্ধানকারী দল। এতে অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনীর তিনটি পি-৩ অরিয়ন্স, মার্কিন নৌ বাহিনীর একটি পি-৮ পসিডন ও বেসামরিক গ্লোবাল এক্সপ্রেস জেট অংশ নেয়। কিন্তু আগের দিনের মতো গতকালও প্রতিকূল আবহওয়ার কারণে অভিযান স্থগিত করা হয়। জলে অবস্থান করা অনুসন্ধানকারী দল স্থলে অপেক্ষা করা কোটি মানুষকে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেননি। আজ আবারও তারা অনুসন্ধানে নামবেন।
১৪ দিনেও নিখোঁজ বিমানের রহস্যের কিনারা হয়নি। কিনারা আদৌ হবে কিনা সেটা একমাত্র সময়ই বলতে পারে।
