হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চের আগাম জামিনের ঘটনায় হতাশা ব্যক্ত করেছে খোদ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ সংক্রান্ত হাইকোর্টের দেয়া একটি জামিনের আদেশ বাতিল করে দিয়ে আপিল বিভাগ বলেছে, হাইকোর্ট (সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ) আপিল বিভাগের দেয়া নীতিমালা অনুসরণে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা কেবল এটাই বলছি হাইকোর্ট বিভাগের ওই দ্বৈত বেঞ্চ পরিহাসমূলক (প্যারাডক্সিকাল) আগাম জামিনের আদেশ দিয়েছে।
আপিল বিভাগ এই হতাশা ব্যক্ত করে আগাম জামিনের বিষয়ে ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী হাইকোর্ট এখন থেকে চার সপ্তাহের বেশি আগাম জামিন দিতে পারবে না। হাইকোর্টকে অবশ্যই আগাম জামিনের কারণ উল্লেখ করতে হবে এবং সন্তুষ্টির দিকগুলোও লিখতে হবে। আগাম জামিন প্রার্থিত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় অথবা তার সঙ্গে কারো বিরোধের প্রেক্ষিতে এই মামলার উদ্ভব হয়েছে এ ধরনের দাবি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না। একইসঙ্গে আপিল বিভাগ মনে করে, নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এখন আর সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নন। এ প্রসঙ্গে আপিল বিভাগ বলেছে, নিম্ন আদালত স্বাধীন নয় বা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে এ রকম ধারণাকে সুনির্দ্দিষ্ট ধরে নেয়া যাবে না। দেশে আগাম জামিনের কোন আইন নেই। হাইকোর্ট তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতায় আগাম জামিন প্রদান করে থাকে। অতীতে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেতা-কর্মীদের (রাজনৈতিক কর্মসূচি কেন্দ্রিক ঘটনায় উদ্ভূত মামলায়) জামিনদানের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট উদার মনোভাব দেখিয়েছে। ২০০৬ সালের আগে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা উচ্চ আদালত থেকে একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা পুলিশ রিপোর্ট দাখিলের পূর্ব পর্যন্ত আগাম জামিন পেতেন। কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে চার্জশিট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরেও উচ্চ আদালত আগাম জামিন প্রদান করেছে। এর মধ্যে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তসলিমা নাসরিন, এডভোকেট গাজীউল হক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আগাম জামিন বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে রাষ্ট্র বনাম জাকারিয়া পিন্টু মামলায় তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আগাম জামিন নিরুত্সাহিত করে একটি রায় দেয়। ওই রায়ে বলা হয়েছিলো, জামিনের এখতিয়ার বিচারিক আদালতের। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের এখতিয়ারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আগাম জামিন প্রদান করে নিম্ন আদালতকে পুনরায় জামিন দেয়ার জন্য হাইকোর্ট কোন নির্দেশনা দিতে পারে না। ওই রায়ের পর আগাম জামিন বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট নির্দ্দিষ্ট সময় দিয়ে আসামিকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে আসছে। সম্প্রতি বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আগাম জামিন দেয়। আপিল বিভাগ ওই জামিন আদেশ বাতিল করে দেয়। দিন কয়েক আগে আপিল বিভাগের এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চ আগাম জামিন প্রশ্নে সাত দফা নির্দেশনা দেয়।
দুদক বনাম মোশাররফ মামলার মূল রায়টি লিখেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী। রায়ে বলা হয়, আগাম জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের বিবেচনা খুবই বিস্তৃত। এটা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতির ভিত্তিতে বিচারিক বিচক্ষণতা বেষ্টিত হবে এবং স্বেচ্ছাচারী বিবেচনার উপর ভর করে হবে না। অবশ্যই এজাহারের খুটিনাটি বিষয়ে বিচারকের চিন্তায় এবং আদেশে তার প্রতিফলন থাকবে। যে তারা ঘটনাটি (ফ্যাক্ট) ও অভিযোগসমূহ সর্বতোভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। রায়ে বলা হয়, কখনো কখনো কোনো আবেদনকারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ধরন গুরুতর হলে গ্রেফতার পূর্ব জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা জরুরি। কারণ আদালত সব সময় এই অন্তর্দর্শন লালন করে যে, শেষ পর্যন্তও যেন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। নইলে সভ্য সমাজের গঠন ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে। বিচারক কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্তের ও সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বার্থের বিষয়ে অচেতন থাকতে পারেন না। অভিযুক্তের জামিনের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন ক্ষেত্রে আগাম জামিন প্রদানের আগে অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
আপিল বিভাগ মনে করে যে, গ্রেফতার পূর্ব জামিন একটি অসাধারণ প্রতিকার এবং অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতিতেই কেবল যথাযথ ও বিচারবুদ্ধিতার বোধগম্য চর্চার মাধ্যমেই আগাম জামিন মঞ্জুর করা যেতে পারে।
মামলা মিথ্যা অথবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে মামলা কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট ও নিম্ন আদালতের বিচারকরা সরকারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন এসব অভিযোগ আগাম জামিনের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে রায়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়, বিচার ব্যবস্থার পূর্ব ধারণায় আগাম জামিনের বিবেচনা হতে পারে এটি আশ্চর্যজনক কোনো ঘটনা।
রায়ে বলা হয়, ইতিপূর্বে রাষ্ট্র বনাম জাকারিয়া পিন্টু মামলা (৬ জুন ২০১০) ও রাষ্ট্র বনাম আব্দুল ওহাব শাহ চৌধুরী (২৫ মে ১৯৯৯) মামলার রায়ে উচ্চ আদালত কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলো।
আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ে বলা হয়েছে, প্রত্যাশিত শ্রম দিয়ে হাইকোর্টকে অবশ্যই এজাহারের ঘটনা খুটিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগের ধরন যদি জঘন্য হয় তবে অবশ্যই আগাম জামিন মঞ্জুর করা যাবে না।
সকল দিক সন্তোষজনক হলে হাইকোর্ট অবশ্যই কোনো ধরনের রুল ইস্যু ছাড়াই আগাম জামিনের আবেদনসমূহ তাত্ক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি করতে পারে। তবে এ ধরনের জামিনের মেয়াদ চার সপ্তাহের বেশি হবে না বলে রায়ে বলা হয়েছে। আবার চার্জশিট প্রদানের পরের ধাপে অবশ্যই আগাম জামিন টিকে থাকবে না। হাইকোর্টের বিচারককে অবশ্যই অভিযুক্তের আগাম জামিন মঞ্জুরের কারণ এবং সন্তুষ্টির দিকগুলোর উল্লেখ করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকদের বিরুদ্ধে যদি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে এবং সন্দেহ থাকলে তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
রায়ে বলা হয়, কারো জন্য বিবেচনার দরজা খুলতে তাদের (বিচারক) এই মর্মে সন্তুষ্ট হতে হবে যে, গড়পড়তা দাবির ওপর বিশ্বাস না করে সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট, যৌক্তিক, বিশ্বাসযোগ্য কারণ এবং যথেষ্ট ব্যাখ্যাসহ সিদ্ধান্তটি নেয়া হচ্ছে।
আপিল বিভাগ বলেছে, ‘হাকিম বা নিম্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে’- এ রকম ধারণাকে ‘সুনির্দিষ্ট’ ধরে নেয়া যাবে না, কেননা হাকিম বা নিম্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এখন আর নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। নির্দেশনার দ্বিতীয় দফায় বলা হয়, আবেদনকারীর রাজনৈতিক পরিচয় অথবা তার সঙ্গে কারো বিরোধের দাবি (যে কারণে মামলা হয়েছে) আবেদন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না।
রায়ে বলা হয়, এজাহারে অপরাধ ‘জামিন অযোগ্য’ হিসাবে উল্লেখ করা থাকলে হাইকোর্ট বিভাগকেই যে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে- এমন কথা নেই। যথাযথ ক্ষেত্রে হাকিম/নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাও এ ধরনের আসামির জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করা হলেও এ ধরনের অপরাধে জামিনের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নেয়া যাবে না।
