উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপের ৪৩ জেলার ৯১ উপজেলায় আগামীকাল রবিবার ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শেষ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। গত তিনটি ধাপের নির্বাচনে সহিংসতা, জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই, গুলি এবং কেন্দ্র দখলসহ নানা ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচনী সহিংসতা ফিরে আসায় সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনই এখন নির্বাচন কমিশনের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সহিংসতা ঠেকাতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা তবুও সহিংসতার আতংক কাটছে না। ভোটের পূর্বে এখনো অনিয়মের অভিযোগ আসছে কমিশনে।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সহিংসতামুক্ত ভোট অনুষ্ঠিত হবে। যারা সহিংসতায় জড়িত থাকবে তাত্ক্ষণিক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্দলীয় উপজেলা নির্বাচন দলীয় ব্যানারে না হলেও দলীয় প্রভাব রয়েছে সবখানেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের পছন্দমতো প্রার্থী দিয়েছে। দুই দলের অসংখ্য বিদ্রোহী প্রার্থীও মাঠে রয়েছেন। এ ধাপে আওয়ামী লীগের ৩৭ আর বিএনপির ৩৩ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এ দফায় প্রতিদিনই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ৯১টি উপজেলার ৪৯ টিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত একক প্রার্থী রয়েছে। বিএনপির আছে ৫১টি উপজেলায়। বাকি উপজেলাতে উভয় দলেরই একাধিক প্রার্থী আছেন।
আগামীকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে বিরতিহীন ভোট। উপজেলা নির্বাচনে ধারাবাহিক সহিংসতা রোধে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যার কারণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে বেগ পেতে হচ্ছে কমিশনের। প্রথম ধাপে ১৯ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ১১টি, ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে সহিংসতার কারণে নোয়াখালী সদর উপজেলাসহ ১৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে দেয় ইসি। ওইদিন নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে ভোটকেন্দ্রে দু’পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হন। তৃতীয় ধাপে ১৫ মার্চের নির্বাচনে ৩১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়, সহিংসতায় ৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ধাপেও অনেক উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহীর প্রার্থী বহাল থাকায় সহিংসতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চতুর্থ ধাপের এই নির্বাচনে গত তিন ধাপের চেয়েও বেশি সহিংসতা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ পরিস্থিতি রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলেছে ইসিকে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষে কাজ করায় নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন আর সহিংসতা দমনে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে ইসি। ফলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বললেও বস্তুত বা কাজে আসছে না। ধাপে ধাপে নির্বাচন করতে গিয়েই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চতুর্থ ধাপের নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শুরু করেছে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা। রয়েছে পর্যাপ্তসংখ্যক র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তারা সবকিছু করবেন। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় ১জন বিচারিক ও ৪জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। এ ছাড়া প্রতি কেন্দ্রে একজন পুলিশ (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার একজন (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার ১০ জন (নারী-৪, পুরুষ-৬ জন) এবং আনসার একজন (লাঠিসহ) ও গ্রামপুলিশ একজন করে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবেন। তবে এসকল আইন-শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরকার সমর্থিতদের পক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সব মালামাল পাঠানো শেষ করেছে কমিশন। নির্বাচন কমিশন চতুর্থ দফায় ৯৩টি উপজেলার তফসিল ঘোষণা করলেও দুই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতার কারণে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও শেরপুরের সদর উপজেলায় নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। পৃথকভাবে একইদিনে ঢাকার ধামরাই উপজেলাতে নির্বাচন। এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের সহকারী সচিব আশফাকুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশে সীমানা জটিলতায় দু’টি উপজেলা নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। বাকি ৯১ উপজেলায় নির্বাচনের ৩২ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা বন্ধ থাকবে। তা অব্যাহত থাকবে নির্বাচনের পর ৬৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। কেউ আইন ভঙ্গ করলে কারাদণ্ড ও আর্থিক দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এমনকি প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে।
প্রার্থী ও ভোটার সংখ্যা
চতুর্থ ধাপের ৯৩টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৮৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী ৩৮৯ জন, ভাইস-চেয়ারম্যান প্রার্থী ৪৮৫ জন এবং মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান প্রার্থী ৩১২ জন। এসব এলাকায় মোট ভোটার ১ কোটি ৪৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭১ লাখ ৩৯ হাজার ১০২ জন, নারী ভোটার ৭১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪২ জন।
কেন্দ্র, ভোটকক্ষ ও নির্বাচনী কর্মকর্তা
ভোট কেন্দে র সংখ্যা ৬ হাজার ১০৮টি, ভোটকক্ষ ৩৮ হাজার ৬৪৪টি। প্রিজাইডিং অফিসার প্রতি ভোটকেন্দে একজন করে ৬ হাজার ১০৮ জন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার প্রতি ভোটকক্ষের জন্য এক জন করে মোট ৩৮ হাজার ৬৪৪ জন এবং পোলিং অফিসারের সংখ্যা ৭৭ হাজার ২৮৮ জন।
অনিয়মের অভিযোগ আসছেই
প্রতিদিনই চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আসছে নির্বাচন কমিশনে। প্রার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে নানা বাধা ও হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। অনেক প্রার্থীকে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করছে সরকার দলের সমর্থক প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে কয়েকটি উপজেলায় প্রার্থীরা হামলা ও অপহরণের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছে তারা। যশোর সদর উপজেলার নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য কমিশনে আবেদন করেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাশুক হাসান জয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আমার কর্মী ও সমর্থকগোষ্ঠীর উপর ভাড়াটে সন্ত্রাসী দ্বারা হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যালটে সিল মারতে পারে এমন পুলিশ সদস্যের তালিকা ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোট ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত ভোটার এবং কর্মীদের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। একটি তালিকা অনুযায়ী সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ২১ জন প্রিজাইডিং অফিসারকে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই রকম অর্ধশতাধিক আবেদন জমা পড়ে আছে কমিশনে। তবে এ পর্যন্ত কোন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কমিশন।
৪৩ জেলার ৯১ উপজেলা
চতুর্থ ধাপে যে ৯১টি উপজেলার নির্বাচন হবে তা হলো-ঢাকার ধামরাই, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ ও ফুলবাড়ী, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, বগুড়ার গাবতলী, রাজশাহীর তানোর, পুটিয়া ও বাগমারা, নাটোরের বড়াইগ্রাম, সিরাগঞ্জের চৌহালী, পাবনার ঈশ্বরদী ও ফরিদপুর, নড়াইল সদর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, যশোরের সদর ও কেশবপুর, বাগেরহাটের চিতলমারী ও মোল্লাহাট, খুলনার ফুলতলা, তেরখাদা, রূপসা, বটিয়াঘাটা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার কলারোয়া, বরগুনার বেতাগী, পটুয়াখালীর সদর, গলাচিপা, মির্জাগঞ্জ, বাউফল ও দুমকী, ভোলার তজুমুদ্দিন, মনপুরা ও দৌলতখান, বরিশালের আগৈলঝারা, উজিরপুর ও বানারীপাড়া, ঝালকাঠির সদর, কাঠালিয়া, রাজাপুর ও নলছিটি, পিরোজপুরের সদর, জিয়ানগর, ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়া, টাঙ্গাইলের কালিহাতি, ভুয়াপুর, নাগরপুর ও মধুপুর, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, নেত্রকোনার মদন, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, ইটনা, কটিয়াদি, মিঠামইন ও তাড়াইল, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সুনামগঞ্জের শাল্ল¬া ও ধর্মপাশা, সিলেটের সদর ও কানাইঘাট, মৌলভীবাজারের সদর, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জের সদর, আজমেরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আখাউড়া ও নাসিরনগর, কুমিল্লার মেঘনা ও বরুড়া, চাঁদপুরের শাহরাস্তি, ফেনীর সোনাগাজী ও ফুলগাজী, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, রাউজান, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও সাতকানিয়া, কক্সবাজারের রামু ও কুতুবদিয়া, রাঙ্গামাটির জুড়াছড়ি এবং বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি।
