দেশের অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়নের ফাঁদে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৪, ২১:২১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেছেন, দেশের দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও বৈষম্যের নেপথ্য কারণ হলো এক শ্রেণির রেন্ট সীকার বা দুর্বৃত্ত, পরজীবী শ্রেণি, অনুপার্জিত আয়কারী, লুটেরা, আত্মসাত্কারী ও ফাও খাওয়া শ্রেণি। সরকারের সাথে আঁতাত করে রাজনৈতিক প্রভাবে এই দুর্বৃত্তরা তাদের সম্পদকে আরো বাড়াচ্ছে। ফলে দেশে বৈষম্যের পাশাপাশি দারিদ্র্যের গভীরতা বাড়ছে। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত এক লোকবক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিক্সের পরিচালক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফীন সিদ্দিক। ড. আবুল বারকাত বলেন, সংবিধান দারিদ্র্য দূরীকরণে যা নিশ্চিত করার কথা বলছে আর বাস্তবে দুর্বৃত্তদের সাথে রাজনীতি ও সরকারের সাথে যে সম্পর্ক তা অব্যাহত থাকলে আমাদের দেশের দারিদ্র্য ও অসমতা কখনো দূর হবে না। তিনি বলেন, ১৯৭৫ পরবর্তী অর্থনীতির হরিলুট ও বৈষম্য বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য ও অসমতা বেড়েছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়নের ফাঁদে পড়েছে। এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ- গত ৪০ বছরে সরকারিভাবে যে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ-অনুদান এসেছে তার ৭৫ ভাগ লুণ্ঠন করেছে অর্থনীতি-রাজনীতির দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী। মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণ ভিত্তিতে দারিদ্র্য পরিমাপের সমালোচনা করে ড. আবুল বারকাত বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক চাহিদা বঞ্চিতরা দরিদ্র, সম-সুযোগের অভাব বঞ্চিতরা দরিদ্র, বৈষম্যের শিকার যারা তারাই দরিদ্র, অসমতার শিকার যারা তারাই দরিদ্র, শোসিত মানুষ মাত্রই দরিদ্র, আইনের দৃষ্টিতে যিনি অসমান তিনিই দরিদ্র। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের শতকরা কমপক্ষে ৮৩ ভাগ মানুষই দরিদ্র। শুধু ক্যালরি গ্রহণের ভিত্তিতে দরিদ্র বিবেচনা করা উচিত হবে না। দারিদ্র্য দূরীকরণে ১৩ দফা সুপারিশ করেন আবুল বারকাত। এগুলো হলো- বণ্টন ন্যায্যতা নিশ্চিত করে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, বৈচিত্র্যপূর্ণ উত্পাদনশীল কৃষি, অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত, শিল্পায়ন, কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার, নারীর ক্ষমতায়ন, মধ্যস্বত্বভোগী হ্রাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, মানবসম্পদ সৃষ্টি, শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত, সুসংগঠিত সামাজিক বীমা, রাজনৈতিক ও বিচারিক সংস্কৃতির গণমুখী রূপান্তর এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অনুষ্ঠানে নির্ধারিত আলোচকের বক্তৃতায় কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দারিদ্র্য দূরীকরণে ছোট-বড় সব দুর্নীতি রোধের চেষ্টা করতে হবে। তাছাড়া শহর ও গ্রামের সম্পদের বণ্টনের অন্যায্যতা দূর করতে হবে। কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ধান্দাবাজরা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। তারা রাজনীতিতে প্রভাব রাখছে। এসব ধান্দাবাজদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। এরা সব দলেই ঢুকে পড়ে। আর ধান্দার বিষয়ে এরা সবাই একতাবদ্ধ; কিন্তু দেশের বঞ্চিত সমাজের মধ্যে একতা নেই। এ বিষয়গুলো সরকারকে ভাবতে হবে।